সিআরবি–র ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্য, পাহাড়ি বাঁক এবং রেলওয়ের ইতিহাস চট্টগ্রামের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ। এটিকে ‘হেরিটেজ পার্ক’ ঘোষণা করলে এটি কেবল একটি বিনোদন কেন্দ্র নয়, বরং একটি জীবন্ত জাদুঘর হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাবে। সিআরবি এলাকাটি চট্টগ্রামের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একমাত্র প্রাকৃতিক অক্সিজেন হাব। এখানকার শতবর্ষী রেইনট্রি ও বিচিত্র বৃক্ষরাজি শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। ইট–পাথরের অট্টালিকা নির্মাণের মাধ্যমে এই ফুসফুস ধ্বংস করা মানে চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলা।
একটি মেগাসিটির জন্য নাগরিকদের উন্মুক্ত স্থান অপরিহার্য। প্রতিদিন ভোরে ও সন্ধ্যায় হাজার হাজার মানুষ এখানে বুক ভরে শ্বাস নিতে এবং শরীর চর্চা করতে আসেন। এই জায়গাটিতে হাসপাতাল হলে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়বে এবং অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ও যানজটে এলাকার শান্ত পরিবেশ নষ্ট হবে। হাসপাতাল বা বাণিজ্যিক স্থাপনার বর্জ্য ও ভিড় এই মানসিক প্রশান্তির জায়গাটি চিরতরে কেড়ে নেবে।
চট্টগ্রামের বায়েজিদ লিংক রোড এলাকাটি একটি আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি হাসপাতাল স্থাপনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। পাহাড় ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পাহাড় এবং সমতলের সংমিশ্রণে প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ এবং চমৎকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এই প্রকল্পটিকে অনন্য করে তুলতে পারে, যা বিদ্যমান কোনো প্রাকৃতিক ফুসফুসকে ধ্বংস করবে না। বায়েজিদ লিংক রোড বর্তমানে চট্টগ্রামের একটি ‘লাইফলাইন’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হাসপাতাল স্থাপনের ক্ষেত্রে এর ভৌগোলিক সুবিধাগুলো হলো, আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগ এটি ফৌজদারহাট (ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক) এবং বায়েজিদ বোস্তামীকে সরাসরি যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে ঢাকা এবং উত্তর চট্টগ্রাম থেকে আসা রোগীরা যানজট এড়িয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবে। পার্বত্য জেলা সংযোগ, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে আসা রোগীদের জন্য শহর না ঢুকে সরাসরি এই রুটে চিকিৎসা সেবা নেয়া সহজ হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার থেকে আসা রোগীরা যানজট এড়িয়ে শাহা আমানত সেতু হয়ে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার অথবা নতুন মেরিন ড্রাইভ বা আউটার রিং রোডের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব।
চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান উচ্চ–মধ্যবিত্ত পরিবার এবং শিল্প এলাকাগুলোতে (যেমন: চট্টগ্রাম ইপিজেড কোরিয়ান ইপিজেড, মিরসরাই অর্থনেতিক অঞ্চল, সীতাকুণ্ড, শিল্প এলাকা) কর্মরত দেশি–বিদেশি কর্মকর্তারা স্ব্যাস্থ্য সেবা পাবে। চট্টগ্রামে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হাসপাতালের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বায়েজিদ এলাকায় সমতল ও টিলা ভূমির সমন্বয়ে প্রাকৃতিক আলো–বাতাস এবং গ্রিন আর্কিটেকচার আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। বায়েজিদ লিংক রোড এলাকাটি বর্তমানে ‘হেলথ ট্যুরিজম’ বা স্বাস্থ্য সেবার একটি কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার সব যোগ্যতা রাখে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ হাসপাতালটির বাণিজ্যিক ও সেবামূলক সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে। মহাসড়কের সাথে সরাসরি সংযোগ থাকায় একটি শক্তিশালী ২৪/ঘণ্টা ইমার্জেন্সি ইউনিট তৈরির প্রবল সুযোগ রয়েছে। দাবি আমাদের স্পষ্ট–প্রকৃতি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়েই হোক টেকসই উন্নয়ন। লেখক : প্রাবন্ধিক, সমাজব্রতী













