চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়া গ্রাম। গ্রামের একটি বিখ্যাত পরিবার ‘দত্তবাড়ি’। আঠারো শতকের শেষভাগে রসিক দত্ত ও মুক্তকেশী দম্পতির ঘরে জন্ম নিয়েছিলো ১১ জন ছেলে। সে ১১ জনের প্রত্যেকেই নিজেদের প্রচেষ্টায় ও মেধা বলে হয়ে উঠেছিলেন একেকটা রত্ন। একই মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া ১১ জন সন্তানের এমন কীর্তিগাথা পুরো উপমহাদেশে বিরল ঘটনা। মুক্তকেশীর বড়ছেলের নাম ছিলো রেবতীরমণ দত্ত। তিনি ছিলেন বৃটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।
১৯২৮ সালে রেবতীরমণ দত্ত তাঁর মায়ের নামে বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় প্রথমবারের মতো মেয়েদের জন্য উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এক ভাই ছিলেন ড. বিভূতি ভূষণ দত্ত, যার নামে তিনি একটা বালক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ১৯৩৯ সালে পণ্ডিত স্যার আশুতোষ মুখার্জির নামানুসারে বৃটিশ বাংলার পল্লী অঞ্চলের প্রথম কলেজ ‘স্যার আশুতোষ কলেজ‘ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ সালে এই কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়! এছাড়াও ক্লাব, পাঠাগারসহ গড়েছেন নানান সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এই দত্ত বাড়ির আর এক সন্তান সুবিমল দত্ত, যিনি ভারতের ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশ এ ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি এই রত্নগর্ভার ১১ সন্তানের মধ্যে এক সন্তান। শিক্ষা বিস্তারে ও গুণী ব্যক্তিকে নিয়ে কালের সাক্ষী ও ইতিহাসের স্মৃতিবিরজিত এই দত্তবাড়ি।
সংরক্ষণের অভাবে চট্টগ্রামের হাজারো ইতিহাস–ঐতিহ্যের মতো এটাও বিলীন হওয়ার পথে। ১১ রত্নের জন্মভিটাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আলোকিত কীর্তি হিসেবে উপস্থাপন করা গেলে এটা হতে পারে সকল প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার অন্যতম নিদর্শন। কিন্তু বোয়ালখালীর ঐতিহাসিক দত্তবাড়িকে স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত বোয়ালখালী কেবল একটি উপজেলা নয়, এটি বাংলা ও বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার এক উর্বর ভূমি। যুগ যুগ ধরে এই মাটি জন্ম দিয়েছে এমন সব কালজয়ী মানুষদের, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়।












