নতুন প্রজন্মের এই বিপথগামিতার দায় কার?

সেবপ্রিয় বড়ুয়া সিদ্ধার্থ | রবিবার , ২৬ জুলাই, ২০২৬ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ

একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার নতুন প্রজন্ম। তাদের হওয়ার কথা ছিল পরিশীলিত, মুক্তচিন্তার অধিকারী, জ্ঞান ও তথ্যনির্ভর, দেশপ্রেমিক এবং ইতিহাসসচেতন। তাদের হাত ধরেই নির্মিত হওয়ার কথা ছিল একটি মানবিক, অসামপ্রদায়িক ও প্রগতিশীল সমাজ। কিন্তু আমাদের একাংশের তরুণতরুণী কেন আজ উগ্রতা, ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার পথে? এই বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ৩৬% শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। এ যেন স্রোতের ভয়াবহ উল্টো ধারা। তবে কেন? এখানে আমার প্রশ্নটি হচ্ছেযে প্রজন্মের হাতে বই থাকার কথা, তাদের কারও কারও হাতে কেন ঘৃণার পতাকা? যে কণ্ঠ থেকে যুক্তির ভাষা শোনা যাওয়ার কথা, সেখানে কেন বিদ্বেষের স্লোগান? শিক্ষককে অপমান, নারী নিপীড়ন, ভিন্নমত দমন, সামপ্রদায়িক বিদ্বেষ, রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতা, মাদকাসক্ত, মোবাইল আসক্ত, সর্বোপরি মবএসব কি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে?

প্রশ্নটি কেবল তরুণদের নয়; প্রশ্নটি আমাদের সবার। পরিবার কি সন্তানকে মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে ব্যর্থ হয়েছে? রাজনীতি কি তরুণদের আদর্শের বদলে বিভাজনের পাঠ দিয়েছে? ধর্মের নামে ব্যবসায়ীরা কি বিশ্বাসকে বিদ্বেষে রূপান্তর করেছে? শিক্ষা কি মুখস্থ বিদ্যার বাইরে চিন্তা, যুক্তি ও মানবিকতা গড়ে তুলতে পারেনি? সুশীল সমাজ কি নীরব থেকেছে? রাষ্ট্র কি সময়মতো দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার?

সত্য হলোএই ব্যর্থতার বোঝা একা কারও নয়। প্রত্যেকেরই অংশ আছে। যখন ঘৃণার বীজ বপন করা হয়েছিল, আমরা অনেকেই নীরব ছিলাম। যখন মিথ্যা ইতিহাস, অপপ্রচার ও বিভাজনের রাজনীতি সমাজে ছড়িয়েছে, তখনও অনেকেই ভাবলাম– ‘আমার তো কিছু হচ্ছে না।’ অথচ আগুন কখনো শুধু প্রতিবেশীর ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; একদিন তা নিজের দরজাতেও এসে পৌঁছায়। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি হলো– ‘কথা নয় কাজ।’ অতঃপর আত্মসমালোচনা। নতুন প্রজন্মকে দোষারোপ করলেই দায় শেষ হয় না। তাদের সামনে আমরা কেমন সমাজ, কেমন ভাষা, কেমন রাজনীতি, কেমন শিক্ষা, কেমন সংস্কৃতি এবং কেমন মূল্যবোধ তুলে ধরেছিসেই প্রশ্নের উত্তরও আমাদের দিতে হবে।

হতাশা হলে চলবে না। এখনও উত্তরণের পথ আছে। পরিবারে মানবিক শিক্ষা ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠ চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মকে বিভাজনের নয়, নৈতিকতা ও সহমর্মিতার শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনীতিকে তরুণদের ঘৃণার নয়, সেবার আদর্শ শেখাতে হবে। আর নাগরিক হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব না থেকে যুক্তি, সত্য ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। আজ সময় এসেছে জাতির বিবেককে জাগিয়ে তোলার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকিশোর অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক
পরবর্তী নিবন্ধআত্মহত্যা প্রবণতা রোধে কার্যকরী পন্থা