ধর্ম হৃদয় থেকে উৎসারিত একপ্রকার উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় আলো। মানব জগতে সত্যকে প্রকাশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধারা অব্যাহতভাবে প্রবাহমান। সত্যের ভিত্তি এবং সৌধ নির্মাণের জন্য ধর্মই অনুসৃত সহায়ক। মানুষের হৃদয়ে সত্য, মিথ্যা দুই বসবাস করে। হৃদয়ের অন্তর্নিহিত সত্য প্রকাশের জন্য আমরা ধর্মকেই অবলম্বন করে থাকি। যে যেধর্মই অবলম্বন করি না কেন, তার সীমারেখা কোন সামপ্রদায়িক গণ্ডীর দ্বারা তৈরি হতে পারে না। সারাবিশ্বে হৃদয় থেকে উৎসারিত সত্যের ধারক, বাহক ধর্ম মানব কল্যাণের জন্য প্রবাহমান। তাইতো যেমন দেখি সনাতন ধর্মে বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত গীতা, তেমনই বুদ্ধের আদর্শ, খ্রিষ্টের মানবতা, ইসলাম ধর্ম শান্তির আদর্শে ঐক্যভাবনা, সবই মানব কল্যাণের জন্য যুগে যুগে আলোর স্ফূরণ ঘটিয়েছে। যে ধর্ম পালন করলে মানুষের হৃদয়, আত্মা, মস্তিষ্কের উন্নতি সাধিত হয়, সেই হচ্ছে ধর্ম পালনের সার্থকতা। যিনি ধর্ম পালন করেন তিনি ধার্মিক। একজন ধার্মিকের শারীরিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক বৃত্তিগুলি সৎচিন্তা দ্বারা বিকাশ লাভ করে। মানুষে মানুষে নিবিড় সম্পর্ক সংস্কৃতি, আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, পারস্পরিক সহমর্মিতা, প্রেম ভালোবাসা, সমগ্র দেশ ও জাতির জন্য আদর্শের হওয়া বাঞ্চনীয়।
আধুনিক বিশ্বে জীবন যাপনে বিষয়াশক্তি প্রবল। জীবনকে আধ্যাত্মিক পথে রাখা কঠিন মনে করে অনেকেই। পরিবর্তন হতে হতে আমরা এমন যুগে এসে পড়েছি যেখানে সুখদুখের মাত্রাধিক্য কল্পনা ছাড়িয়ে গেছে। কারোরই যেন সময় নেই, সাধনভজন, ধ্যান ধারণা নিয়ে বসার একটা মিনিটও নেই।
প্রকৃতঅর্থে ধর্ম পালন তো ‘মন’ কে দিয়ে ঘটে। মনই তো বন্ধন দৃঢ় করে, বন্ধন সৃষ্টি করে আবার মন থেকেই তো মুক্তি মেলে। অস্থির মনকে সুস্থির করার প্রয়াস তো করা যায়।
আমরা জগত সংসারে জন্মগ্রহণ করেছি সুখদুঃখ, আনন্দবেদনা, সবই সহ্য করার ক্ষমতা নিয়ে। যে যেমন কর্ম করবে সে তার কর্মের অনুরূপ ফল ভোগ করতে হবে। সুকর্মের ফল সুখকর আর কুকর্মের ফলে দু:খ ভোগ করতে হবে।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বলে দাবী করে কিন্তু ভুলে যায় নৈতিকতা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য সমপ্রীতির কথা। মানুষের মন অতিকিছু পাওয়ার লোভে, লালসায়, অস্থির হয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে উঠে। সেই অতি লোভ লালসা আসক্তি কামুক মনোবৃত্তি পরিত্যাগ করা একান্তই দরকার।
এই প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় “যতো যতো নিশ্চরতি মনশ্চঞ্চলস্থিরম,
ততস্থতো নিয়মৈতদাত্মন্যেব বশং নয়েৎ”।
অর্থাৎ চঞ্চল মনকে নিয়মিত অভ্যাস এবং সাধনা দ্বারা সুস্থির করে সঠিক পথে ব্যবহার কর যায়। মানুষ যখন সুস্থির হয়ে চিন্তা করতে পারে তখন তার মধ্যে মূল্যবোধ জাগ্রত হয়, নৈতিকতা, কর্তব্যবোধ, সুন্দর চরিত্র গঠন সহজ হয়ে উঠে। শত্রুও যদি ক্ষুধার্ত থাকে তাকে খাদ্য দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে পানীয় দেওয়া, অসুস্থকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, যিনি প্রকৃত ধার্মিক মানুষ তিনি করেন। পরের দু:খে দু:খ অনুভব, পরের আনন্দে আনন্দিত হওয়া প্রকৃত ধর্ম। ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে, ক্রোধকে অক্রোধ দ্বারা,অসাধুকে সাধুতা দ্বারা, কার্পণ্যকে দান দ্বারা, মিথ্যাকে সত্য দ্বারা জয় করতে হবে। সকল প্রকার অহংকার, দম্ভকে পরিহার করে দেশ ও সমাজকে কলুষমুক্ত করতে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অভ্যাসগুলি শৈশবকাল থেকেই অনুশীলন প্রয়োজন তাহলেই আমাদের দেশ ও সমাজ আগামীতে কলঙ্কে কালিমালিপ্ত হবে না।
আজ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী তিথিতে প্রার্থনা করি,
“অসত্য হইতে আমাকে সত্যে লইয়া যাও,
অন্ধকার হইতে আমাকে জ্যোতিতে লইয়া যাও,
মৃত্যু হইতে অমৃতে লইয়া যাও,
হে স্বপ্রকাশ, আমার নিকট প্রকাশিত হও।”












