‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর / মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর! / রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়,/ আত্মগ্লানির নরক–অনলে তখনি পুড়িতে হয়।’… এই শাশ্বত সুন্দর কথাগুলো ছন্দ মাত্রায় সাজিয়ে ১৩২১ বঙ্গাব্দে লিখেছিলেন শ্রদ্ধেয় কবি ফজলুল করিম। আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে এসে বাস্তব কারণেই তাঁকে স্মরণ করছি। সুর ও অসুরের মাঝ থেকে সুর যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে অসুর! রিপুর তাড়না বেড়ে হয়েছে বহুগুণ, সেই তুলনায় আত্নগ্লানিবোধ নেই বললেই চলে। মানুষ কেবলই ছুটে চলেছে কোন এক অধরাকে কুক্ষিগত করতে। সেই ছুটে চলার পথে সে যে কোথায় কাকে পায়ের নিচে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই। দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে ছুটছে আর ছুটছে। চোখে যেন তার দৃষ্টি নেই আর না আছে সুষ্ঠু দৃষ্টিভঙ্গি! জৌলুসের প্রতি সে যেন একচোখা!
শুনেছি যখন প্রথম প্রথম চায়ের প্রচলন হলো তখন নাকি রাস্তার মোড়ে মোড়ে ফ্রি চা খাওয়ানো হতো। কিন্তু বাঙালির মুখে কি আর রঙ চা নামের রঙিন পানি রোচে? ফ্রি দিয়েও বাঙালিকে খাওয়ানো যাচ্ছে না এতো বড় লজ্জার কথা হলো। কর্তৃপক্ষ নির্দেশ জারি করলো বাঙালি কী খায় সেটা খুঁজে বের করো। পাওয়া গেলো বাঙালি খায় গাভীর দুধ। ফের নির্দেশ–তাহলে দুধের সাথে চা মিলাও। সেই থেকে দুধ এলো দুধ–চা। ফ্রির প্রলোভনে পড়ে চা খেতে শুরু করলো বাঙালি। যখন বাঙালি চায়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়লো তখন বন্ধ করে দেয়া হলো ফ্রি চা খাওয়ানো। চা খেতে হলে টাকা দিয়ে কিনে খেতে হবে। বাঙালির ততদিনে চায়ের নেশা ধরে গেছে। অগত্যা টাকা দিয়ে কিনে খেতে শুরু করলো। সেই নেশা আজও চলে আসছে। নগরায়নের সুবিধাগুলো কিছুটা সেরকম। শহরের ‘এই সুবিধা, সেই সুবিধা’র প্রলোভনে পড়ে মানুষ যখন শহরমুখী তখন সবকিছু ঠিকই ছিলো। জেলা শহর থেকে বিভাগীয় শহর, সেখান থেকে রাজধানী উন্নত থেকে উন্নততর। চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা ব্যবস্থা,আইন–আদালত, বিনিয়োগ ব্যবস্থা্ কর্মসংস্থান সবই অন্যরকম এক উচ্চতায়। তারপর যখন মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়লো তখন থেকেই বিপর্যয়ের শুরু।‘এই সুবিধা, সেই সুবিধা’গুলো ধীরে ধীরে ‘এই অসুবিধা সেই অসুবিধা’য় রূপ নিতে শুরু করলো। শহরে এখন মানুষের ভীড়, রাজধানীতে আরও বেশি – ভিড়ে একেবারে গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি অবস্থা। তবু নগরের সুবিধার কাছে হার মেনে যায় সব ধরণের ত্রুটি বিচ্যূতি। ক্রমে ক্রমে আজ এমন একটা জায়গায় এসে আমরা দাঁড়িয়েছি যেখানে বাঁচার মতো করে বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। প্রতিটি সুবিধার বিপরীতেই যেন গাদা গাদা সমঝোতা আর বিসর্জন। ভালো চিকিৎসার জন্য, ভালো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য, সর্বোপরি কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ হাজারো ত্যাগ স্বীকার করে টিকে থাকে রাজধানীতে। অতিরিক্ত জনগণের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে হাল–বেহাল এই নগরীর। অতিরিক্ত জনসাধারণের ভারসাম্য বজায় রাখতে রাজধানী হয়ে উঠছে তিলোত্তমা। তাতেও কি রক্ষে আছে? প্রয়োজনীয় পয়ো–নিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই, আলো বাতাসের জন্য প্রপার ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই, প্রতিষ্ঠান আছে উপযুক্ত শিক্ষা নেই, শিক্ষিতদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান নেই, আইন আছে প্রয়োগ নেই ।
এছাড়াও প্রতিদিন এখানে নিত্য নতুন ঝক্কি – রান্নার সময় গ্যাস নেই, প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট সংযোগ আছে গতি নেই! এ যেন এক নেই রাজ্যের অঙ্গসংগঠন! সবচেয়ে যোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষের বসবাসস্থল হওয়া সত্ত্বেও তিলোত্তমা এখন দূষণের শহর। বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ, নৈতিকতা দূষণ, চরিত্র দূষণ, দাম্পত্য দূষণ, যোগাযোগ মাধ্যম দূষণ আরও যে কত রকমের দূষণ এখানে। এতো রকম দূষণের ভিড়ে মানুষ এখন হাঁসফাঁস করে। ফিরে যাওয়ারও পথ খোলা নেই। গ্রামগুলো এখন প্রায় শহর হয়ে উঠেছে। শহুরে পণ্য আর আদব কায়দার মতো দূষণও ছড়িয়ে পরেছে দূর দূরান্তের লোকালয়ে। তাই জরুরি হয়ে পড়েছে সংস্কার। সর্বক্ষেত্রে সর্বস্তরে সংস্কার চাই। নদী–খাল–বিল সংস্কারের মতো সংস্কার করতে হবে নিজেদেরও। নিজেদের মন মানসিকতাকে দূষণমুক্ত করতে পারলেই কেবল সম্ভব অন্যান্য দূষণ থেকে বেরিয়ে আসা। সর্বস্তরে এই প্রচেষ্টা ছড়িয়ে দিতে হবে এবং শুরু করতে হবে আমাদের নিজ থেকে। মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে হবে তবেই সম্ভব একটি সুন্দর সমাজ তথা সুন্দর একটি দেশ গড়ে তোলা। ভালো মানুষ তবেই ভালো দেশ, আমাদের স্বপ্নের স্বর্গভূমি বাংলাদেশ।












