বাস্তবতায় পিষ্ট মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবন

শিউলী নাথ | সোমবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৬ at ৮:০২ পূর্বাহ্ণ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সংসার চালাতে গিয়ে যারা প্রতিদিন নিজের ছোট ছোট ইচ্ছে গুলোকে বিসর্জন দেয়, তারাই হলো মধ্যবিত্ত পরিবারের আসল স্তম্ভ’। এ সংসারে মধ্যবিত্ত শব্দটাই যেন মহামারী আকার ধারণ করেছে। জীবনের সকল চাওয়া পাওয়া, ইচ্ছে, আনন্দ যেন মধ্যবিত্তের দুয়ারে এসে থমকে গেছে। নিত্যদিনের হিসাবের খাতা ক্রমশ বেহিসাবি হয়ে উঠেছে। মূলত দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং চাহিদার অতিরিক্ত বৃদ্ধি জীবনযাপনকে কঠিন ও দুর্বিষহ করে তুলেছে। অ্যাডাম স্মিথের মতে, “পৃথিবীর সমস্ত অর্থনৈতিক ঝড় সবচেয়ে বেশি আঘাত করে মধ্যবিত্তের দেয়ালে। তবুও তারা বুক চিতিয়ে পরিবারকে আগলে রাখে।” করোনা মহামারী মোকাবেলায় সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। এর প্রভাবে মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। দীর্ঘদিন মহামারীর সাথে যুদ্ধ করে পরিবারগুলো আবার আশা নিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছে। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, ‘মধ্যবিত্ত জীবন হল এক অন্তহীন অপেক্ষার নাম। কখনো মাসের শেষে বেতনের জন্য, কখনো বা একটু ভালো দিন আসার আশায়।’

মধ্যবিত্তের আশার প্রহর যেন কুয়াশাচ্ছন্ন। আলোর রেখা তাতে বিন্দুমাত্র দেখা যায় না। মাস শেষে হিসাব মেলানো দূরের কথা, মাসের কুড়ি দিন পার হতেই পরিবারগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। নিত্যদিনের বাজারযেমন খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল, সবজি, মাছ, মাংস যেখানেই হাত দিতে যাবে সেখানেই আগুন দাম। যা মধ্যবিত্তের বাজেটের বাইরে। বলা বাহুল্য বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, যাতায়াত ভাড়ার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। মধ্যবিত্তরা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে। চাকরির নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যেই বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়ালেখার খরচ, নিত্য বাজার ও সামাজিকতা সবই ঠিক রেখে তাদের সংসার চালাতে হয়। জেন অস্টিন বলেছেন, ‘মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম নেওয়া মানেই হলো অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকার এক অদ্ভুত শিল্প আয়ত্ত করা’। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একজন কর্মজীবী তার কর্মস্থলে সঠিক সময় পৌঁছাতে পারবেন কিনা সেই চিন্তা দূরের কথা। তিনি ভাবেন রাস্তায় নেমে নির্দিষ্ট গন্তব্যের জন্য যানবাহন পাবেন কিনা! পরিবারের সকলের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ঘরের প্রধান মানুষটিকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হয়। কারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলো মুখ ফুটে সব বলতে পারেন না। জর্জ বার্নাড শ সব বলেছেন, “মধ্যবিত্ত হওয়া একটি অভিশাপ। এরা না পারে দরিদ্রের মতো সাহায্য চাইতে না পারে বিলাসিতা করতে”।

এইতো সেদিন এক টেক্সিচালক বললেন, ‘আমরা গ্যাস পাই না। সারারাত লাইন ধরে ভোরে একটু পেয়েছি। এখন ভাড়া তো বেশি দিতেই হবে।’ টেক্সি চালকের কথা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু যাত্রীর মাস ফুরোবার আগে পরিবারের মুখগুলো চোখে ভাসতে থাকে। যতই আমরা বলি সব মানুষ এক। তবুও যারা নিম্ন আয়ের মানুষ, শ্রমজীবী বা দিনমজুর তারা যেভাবে চলে সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ সেভাবে চলতে পারে না। লোক লজ্জার ভয়ে তারা নীরবে সব সহ্য করে। পরিশেষে বলবো, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রা মানের দিক থেকে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তেমন ভালো নেই। তবুও ওই পরিবারের মানুষগুলো শত কষ্টের মাঝেও তাদের অবস্থান বুঝতে দেন না। তারা আশায় থাকেন, একদিন বেহিসাবি জীবনের হিসাব ঠিক মিলে যাবে। পরিবারের মুখেও হাসি ফুটবে। চার্লস ডিকেন্সের কথা দিয়ে শেষ করি,‘উচ্চবিত্তরা বাঁচে তাদের অহংকার নিয়ে, নিম্নবিত্তরা বাঁচে অভাবের সাথে লড়াই করে, আর মধ্যবিত্তরা বাঁচে তাদের লোক লজ্জা আর আত্মসম্মান টুকু বাঁচাতে গিয়ে’।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশুধু আজকের জন্য বাঁচো
পরবর্তী নিবন্ধযত্রতত্র দেয়াল লিখন ও পোস্টার : আইন থাকলেও নেই প্রয়োগ