জ্বালানি সংকটে শিল্পে ধস, বাড়ছে বেকারত্ব

মুহাম্মদ এনামুল হক মিঠু | শনিবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ

একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শিল্প। শিল্পকারখানা শুধু পণ্য উৎপাদন করে না, এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যবসাবাণিজ্য, রপ্তানি ও রাজস্ব আয়। তাই শিল্পে সংকট মানেই অর্থনীতিতে সংকট। বাংলাদেশের শিল্পখাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ অন্যতম বড় সমস্যা। জ্বালানি সংকটে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন সময় কমছে, কোথাও শিফট কমানো হচ্ছে, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতেও বাধ্য হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর। কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের সুদ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, কাঁচামাল ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় চলতেই থাকে। ফলে উৎপাদন কমলেও ব্যয় কমে না, বরং পণ্যের দাম বাড়ে এবং উদ্যোক্তার লোকসানের ঝুঁকি বাড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে কর্মসংস্থান। উৎপাদন কমলে প্রথমে ওভারটাইম ও নতুন নিয়োগ কমে, এরপর শিফট কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। এর প্রভাব শুধু কারখানার শ্রমিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবহন, সরবরাহ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, খাবারের দোকানসহ সংশ্লিষ্ট অসংখ্য খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে জ্বালানি সংকট আরও ভয়াবহ। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতার আস্থা নষ্ট হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। সেখানে উৎপাদন ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা আমাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো নতুন বিনিয়োগের আস্থা। একজন উদ্যোক্তা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কারখানা স্থাপন করবেন, অথচ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিশ্চিত পাবেন না, এমন পরিস্থিতি নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবেই। ফলে বর্তমান শিল্প যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাবে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য স্বল্পমেয়াদে শিল্পাঞ্চলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন শিল্পে কতটুকু জ্বালানি প্রয়োজন, কোথায় কী ধরনের সংকট রয়েছে এবং কীভাবে উৎপাদন সচল রাখা যায়, এসব বিষয়ে নিয়মিত কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে, একটি কারখানার চাকা থেমে যাওয়া মানে শুধু উৎপাদন বন্ধ হওয়া নয়; এর সঙ্গে থেমে যায় বহু পরিবারের আয়ের পথ। শিল্প সচল থাকলে কর্মসংস্থান বাড়বে, রপ্তানি শক্তিশালী হবে, রাজস্ব আয় বাড়বে এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরবে। তাই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহকে শুধু জ্বালানি খাতের বিষয় হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জ্বালানি সচল থাকলেই শিল্প সচল থাকবে; শিল্প সচল থাকলেই কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির চাকা ঘুরবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধফুটপাত দখল মুক্ত করা হোক