এক জীবনে কত কী পেলাম! ঘন সবুজ পাহাড়ে ঝুম বৃষ্টি নামতে দেখা আর রাতের সমূদ্রের বুকে একা পূর্ণিমার চাঁদ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো কয়েকবার। আমার দ্বীপের মায়াময় সময়গুলোও হৃদয়ে খুব যতনে তুলে রেখেছি এখনো।
মনে পড়ে শৈশবের সেই সৈকতের কথা যেখানে ভেজা বালিতে ছোট ছোট হাতেগড়া বালিঘর বানাতাম। জোয়ার এসে সেই ঘর ভেঙে নিয়ে যেত। তখন জানতাম না, সেই বালির ঘরগুলোর মতোই একদিন জীবনের কত আপন পৃথিবী ভেঙে যাবে, আর আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকব তার ধ্বংসাবশেষের পাশে। প্রিয় দ্বীপের সেই বাতিঘর ছিলো দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্জন অতিকায় প্রহরীর মতো। তার আলো কত রাতের অন্ধকার পেরিয়ে কত পথসন্ধানী জলতরীকে পথ দেখিয়েছে। সৈকতের বুকে ছুটে বেড়ানো সেই লাল কাঁকড়ার দল, আমাদের পায়ের শব্দে যারা মুহূর্তেই গর্তে লুকিয়ে পড়ত। কত ছোট ছোট দৃশ্য যে দেখেছি! কত মুহূর্ত যে না জেনেই জীবনের শেষ প্রান্তের জন্য তুলে রেখেছি আবার ছুঁবো বলে।
অথচ আজকাল, মাঝে মাঝে নির্জন ঘরের দেয়ালে লেপ্টে থাকা টিকটিকির শব্দ কিংবা সিলিং ফ্যানের একটানা চি–চি শব্দও কেমন যেন কানে লাগে। মনে হয়, এই নিরবতার ভেতরেই দীর্ঘ জীবনের কত কথা জমে আছে! চোখের সামনে ভেসে ওঠে কত মুখ কেউ আর ফিরে আসে না। তাঁদের মসৃণ হাতে সময়ের রেখা পড়তে দেখেছি, কালো চুলে ধীরে ধীরে পাক ধরতে দেখেছি, যাদের পাশে বসে ভেবেছিলাম তাঁরা বুঝি এমনই থাকবে চিরটা কাল। তারপর একদিন তারাও চলে গেল। জীবন বোধহয় এমনই। কিছু মানুষ আসে, কিছু ঋতু আসে, কিছু বিকেল এসে হৃদয়ে চিরদিনের মতো থেকে যায়; শুধু মানুষগুলো আর থাকে না। তবু কিছু দৃশ্য থেকে যায় ভর দুপুরের কড়া রোদ, পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলো, বৃষ্টিভেজা ধোঁয়া ওঠা পাহাড়, জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া সমূদ্র, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাতিঘর, শৈশবে বালিতে গড়া সেই ছোট্ট ঘর, আর লাল কাঁকড়ার মতো ছুটে যাওয়া কিছু দিন। নিভৃত সন্ধ্যার সেই ক্ষণে, হঠাৎ মনে পড়ে যায় রবিঠাকুরের সেই কবিতার কথাই–
‘বেলা যে পড়ে এলো, জলকে চল।’ শুধু আমরা বুঝতে পারি যে সময়কে ভেবেছিলাম অসীম, তারও একদিন বেলা পড়ে আসে।












