(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বন্ধুপুত্র ইয়াসকে সাথে নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম। আবাসিক এলাকার মিনিবাসের দুইটি টিকেট ইয়াস সাথে নিয়েছে। মাত্র মিনিট কয়েকের মধ্যেই আমরা রেলস্টেশনে পৌঁছে যাবো। ওখানে টিপু ভাই অপেক্ষা করছেন।
ঘর থেকে বের হয়ে চমৎকার একটি সুইমিং পুলের পাশ দিয়ে আমরা আবাসিক এলাকার মুল সড়কে পৌঁছালাম। বাস দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে প্রতি ১৫ মিনিট পরপর মিনিবাস স্টেশনে যাতায়াত করে। আমরা বাসে চড়ে পাশাপাশি দুইটি সিটে বসলাম। আরো কয়েকজন যাত্রী আছেন। সবাই ছোট্ট এই আবাসিক এলাকার বাসিন্দা, পরস্পরের পরিচিত। ইয়াসের সাথে কথা বললো আগে থেকে বাসে থাকা যাত্রীরা। ইয়াস তাদের সাথে হংকংয়ের ক্যান্টনিজ ভাষায় কথা বলছিল। আমার বুঝার প্রশ্নই ওঠেনা। ট্রেন স্টেশনে পৌঁছলাম। আগেরদিন এখানেই আমি এয়ারপোর্টবাস থেকে নেমেছিলাম। স্টেশনে গিয়ে টিপু ভাইকে পাওয়া গেল। ইউছুপ আলী ভাইয়ের ভায়রা, আমার পুরানো পরিচিত। টিপু ভাই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন। বললেন, পাঁচ মিনিট পর ট্রেন আসবে। চলেন, কফি খাই। আমরা তিনজনই কফি নিলাম।
টিপু ভাই এবং ইয়াসের কাছে পুরো মাসের অক্টোপাস কার্ড আছে। এটা দিয়ে বাস ট্রেন সবই চড়া যায়। টিপু ভাই আমার জন্য একটি কার্ড কিনে নিলেন। এক সপ্তাহ যেখানে খুশী যত খুশী ট্রেন বা বাসে চড়তে পারবো। খুব জোর করেও টিকেটের দাম দিতে পারলাম না। টিপু ভাই বললেন, আপা রাগ করবেন। টিপু ভাইয়ের আপা মানে আমার ভাবী, ইউছুপ ভাইয়ের সহধর্মিণী। বুঝতে পারলাম যে, আমরা বের হওয়ার পরই ভাবী টিপু ভাইকে ফোন করে আমার টিকেট কেনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
ট্রেন এসে গেছে। গেটে দাঁড়াতেই দরোজা খুলে গেল। ভিতরে প্রবেশ করেই ‘আমাদের নেই কেন’ সেই পুরানো অন্তরের হাহাকারটি টের পেলাম। কি সুন্দর ট্রেন, কি সুন্দর সিট, পুরো কামরায় একটি ধুলো আছে বলেও মনে হচ্ছিলো না। যাত্রীরা যে যার মতো বসে আছেন, দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ বই পড়ছেন, কেউ মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঠাই তাকিয়ে আছেন। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছেন না। কোন হৈ চৈ নেই, গোলমাল নেই। হকারের হাকডাক নেই। চারপাশে কেমন যেনো এক মুগ্ধতা। ছোট্ট একটি সংকেত দিয়ে দরোজা বন্ধ হয়ে গেলো। ছুটতে শুরু করলো ট্রেন। টিপু ভাই জানালার পাশের একটি একটি সিটে আমাকে বসিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি বসেন, অনেকক্ষণ লাগবে। ইয়াসও গিয়ে একটি সিটে বসলো। টিপু ভাই আমার সামনে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডেল ধরে রাখলেন।
আগেই বলেছি যে, হংকংয়ের এমআরটি পৃথিবীর সেরা এমআরটি। হংকংয়ের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পৃথিবীর অনেক দেশের কাছে অনুকরণীয়। এখানে প্রচুর যাত্রী ট্রেনে ট্রাভেল করেন। ঘড়ির কাঁটা ধরে চলার কারণে ট্রেনে চড়ে আপনাকে বিপদে পড়তে হবে না। অবশ্য এখানে বাসও সময় ধরে চলে। ঘর থেকে বেরোনোর সময়ই আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন যে, কতক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছাবেন। পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত নগরীতে এমন সময় ধরে চলাচল করার সুযোগ আমাকে বরাবরই বিস্মিত করে।
প্রথমবার হংকংয়ের এখানে ওখানে ব্যাপক চষে বেড়ানোকালেই এই নগরীর ব্যস্ততা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পাহাড়ের গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ ভবন, নিচে ছুটে চলা গাড়ির সারি আর শহরের বুকের ভেতর দিয়ে সাপের মতো ছুটে চলা মেট্রোরেল–সবকিছুই যেন ঘড়ির কাঁটা ধরে এক অদ্ভুত ছন্দ নিয়ে চলাচল করে।
আমরা যাত্রা করেছি কাম সেঙ রোড এমআরটি স্টেশন থেকে, গন্তব্য হংকংয়ে আইল্যান্ডের চাই ওয়ান। ওখান থেকে কেপ কলিনসুন মুসলিম সেমিট্রি। একটি মুসলিম কবরস্থান, যেখানে আমার বন্ধু চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। আমাদের গন্তব্য বেশ দূরে, পথে ট্রেন পাল্টাতে হবে। একটির পর একটি স্টেশন পার হয়ে যাচ্ছিলো আমাদের ট্রেন। প্রতিটি স্টপেজেই নির্দিষ্ট সময় মেনে দাঁড়াচ্ছিলো। যাত্রী নামছিলেন, নতুন যাত্রী ট্রেনে ওঠছিলেন।
ট্রেন যত এগোচ্ছিল, বাইরের দৃশ্যও বদলে যাচ্ছিল। কোথাও পাহাড়, কোথাও আবাসিক ভবনের সারি, কোথাও আবার শহরের ঘন কংক্রিট। দশটি স্টপেজ পার হলাম আমরা। এরপর ট্রেন বদলাতে হবে। আমরা ট্রেন থেকে নামলাম, এখান থেকে আমাদেরকে অন্য ট্রেনে চড়তে হবে।
এই স্টেশনেও চরম ব্যস্ততা চোখে পড়লো। ভেতরের চলন্ত সিঁড়ি, দিকনির্দেশনার বোর্ড আর মানুষের দ্রুত পায়ে হাঁটার দৃশ্য স্টেশনটির গুরুত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছিলো। ইয়াস এবং টিপু ভাইকে অনুসরণ করে নতুন একটি প্ল্যাটফরমে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখান থেকে ছাড়বে আমাদের পরবর্তী ট্রেন। যে ট্রেন আমাদেরকে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। টিপু ভাই বললেন, দুই মিনিটের মধ্যে ট্রেন আসছে।
আমাদের ট্রেন দ্রুত ছুটছিলো। জানালার কাচে নিজের মুখের প্রতিবিম্ব দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, এত মানুষের এই শহরে প্রত্যেকেরই হয়তো আলাদা কোনো গন্তব্য আছে। কেউ যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে, কেউ ভালোবাসার মানুষের কাছে, কেউ বাড়ি ফিরছে। আর আমি যাচ্ছি একজন প্রিয় মানুষের কবরের কাছে। একটি কবরের খোঁজেই আমার এই যাত্রা।
শেষ পর্যন্ত ট্রেন থামল চাই ওয়ান স্টেশনে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে মনে হলো গ্রামের কোন স্টেশনে পৌঁছেছি। অদূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছিলো। মনভোলানো প্রকৃতি। চারদিকে কেমন শান্ত, তবে পুরো এলাকাটি চকচক করছে। ইয়াস একটি উবার কল করেছে। অল্পক্ষনের মধ্যেই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো একটি টেসলা। চমৎকার গাড়িটিতে চড়ে বসলাম। গাড়ির ছাদ কাচের, আকাশ দেখার পাশাপাশি চারপাশের মুগ্ধ করা প্রকৃতিও দেখা যাচ্ছিলো।
কেপ কলিসুন রোডের দিকে যতই এগোচ্ছি ততই চারপাশের দৃশ্য বদলে যাচ্ছিল। উঁচু ভবনের বদলে পাহাড়। শহুরে শব্দের বদলে পাখীর ডাক, বাতাসের ঝিরঝির শব্দ। রাস্তার দুপাশে সবুজ। মনে হলো, কয়েক ঘণ্টা আগেও যে শহরকে কংক্রিটের জঙ্গল মনে হচ্ছিল, সেই হংকংয়ের বুকেই এমন নির্জন, শান্ত একটি জনপদ লুকিয়ে রয়েছে। অবশেষে আমাদের গাড়ি এসে থামলো চাই ওয়ানের পাহাড়ঘেরা একটি স্থানে, যেখানে একটি চমৎকার মসজিদে মুসল্লীদের আনাগোনা চলছিল।
টিপু ভাই বললেন, মসজিদটি পাকিস্তান, আফগানিস্তাসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের হংকংয়ে বসবাসকারী প্রবাসীরা গড়ে তোলেছেন। ভাগ্যক্রমে দিনটি শুক্রবার। আমরা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করবো। মসজিদের পাশেই অজুর ব্যবস্থা, চমৎকার আয়োজন। এই পাহাড়ের উপর এতো সুন্দর করে পানির সংস্থান করা হয়েছে যে মন ভালো হয়ে গেলো।
জুমার নামাজে খতিব সাহেব বয়ান দিচ্ছিলেন। নামাজের সময় ঘনিয়ে আসছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আগে জুমার নামাজ আদায় করবো, তারপর কবর জেয়ারত। মসজিদে ঢুকে একপাশে আমরা তিনজনই বসে পড়লাম। বহু মুসল্লী, তবে অধিকাংশই পাকিস্তানের নাগরিক বলে মনে হলো। খতিব সাহেব বয়ানও দিচ্ছিলেন উর্দুতে। তিনিও পাকিস্তানের লোক বলে মনে হলো।
নামাজ শেষে নতুন একটি জিনিস দেখতে পেলাম। সকলকেই দুপুরের খাওয়ার খাওয়ানো হচ্ছিলো, বিরানী। খতিব সাহেবসহ কয়েকজন নেতা গোছের মানুষ চেয়ার টেবিল নিয়ে বসে আছেন, মুসল্লিদের মধ্যে কয়েকজন সবাইকে বিরানীর প্লেট দিচ্ছিলেন। কেউ চেয়ারে বসে, কেউবা বেঞ্চে বসে বিরানী খাচ্ছিলেন। টিপু ভাই এবং ইয়াসের সাথে খতিব সাহেবসহ স্থানীয় কিছু মানুষের পরিচয় আছে। হয়তো ইউছুপ আলী ভাইয়ের কবরে আসা যাওয়া করতে করতে এই পরিচয়। খতিব সাহেব টিপু ভাইকে ডেকে কথা বললেন। ইয়াসের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমি বন্ধুর কবর জেয়ারত করতে বাংলাদেশ থেকে গেছি শুনে তারা আমার সাথেও কথাবার্তা বললেন। খতিব সাহেব কোন একসময় চট্টগ্রাম সফরে এসেছিলেন বলেও জানালেন। আমাদের বিরানী খাওয়ার জন্য খুবই জোর করা হলো। আমরা যতই না না করি, ততই তারা জোর করতে লাগলেন। আমাদের জন্য তিনটি চেয়ার দিয়ে টেবিলে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। বাধ্য হয়ে আমরা বসলাম। দারুণ স্বাদের বিরানী। আসলে অনেক লোকের রিজিক একইসাথে যে ডেকে রান্না হয় সেই খাবারের স্বাদই অন্যরকম হয়ে যায়।
খাওয়া শেষ করে আমরা কবরস্থানের দিকে যেতে লাগলাম। মসজিদের লাগোয়া কবরস্থান। সবুজ পাহাড়ের ঢালে সারি সারি কবর। কী সুন্দর এবং গোছানো একটি কবরস্থান! প্রথম দেখাতেই আমার মন ভালো হয়ে গেলো। ১৯৬৩ সালে এই কবরস্থানটি গড়ে তোলা হয়। আমার খুব আশংকা ছিল এবং আমি মনে মনে ভাবতাম যে, করোনাকালে আমার বন্ধুকে বাধ্য হয়ে হংকংয়ে কবর দেয়া হয়েছে। হয়তো কোন একটি পাহাড়ি জঙ্গলে আমার বন্ধু একা একা শুয়ে আছে। কিন্তু এখানে সাজানো গোছানো এবং সুবিন্যস্থ কবরস্থান দেখে আমার মনে এতোদিন যে কুভাবনাটা ছিল সেটি মুহুর্তেই উবে গেল। কবরস্থানও এতো সুন্দর হয়! পাহাড়ের বুকে এবং ঢালুতে সারি সারি কবর এতো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা যায়!
আমার বন্ধুর কবরটি খুবই সুন্দর একটি জায়গায়। মসজিদের কাছে, রাস্তার সাথে লাগোয়া। চারদিকে ইটের ছোট্ট গাঁথুনী, মাঝে একটি কয়েকটি ফুল পাতাবাহারের গাছ। কবরের উপর সাদা নুড়ি পাথর, ফাঁকে ফাঁকে সবুঝ ঘাষ। পায়ের দিকে সাদা পাথরের ফলক। ফলকে আমার বন্ধুর নাম এবং মৃত্যুর তারিখ ইংরেজিতে লেখা। অনেকক্ষন দোয়া দরুদ পড়লাম, মোনাজাত করলাম। বন্ধুর মাথার পাশে দিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। আহা, কত কথা বললাম! কিন্তু একটি কথারও সাড়া পেলাম না! (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।











