শিক্ষার্থীদের আর কত গিনিপিগ বানানো হবে

আবু তালেব বেলাল | শনিবার , ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ

দেশের শিক্ষা গবেষক ও সচেতন মহলে এই প্রশ্নটি বার বার ঘুরপাক খেতে দেখা যাচ্ছে। এটি কেবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং একটি বাস্তবতা ও দীর্ঘদিনের হতাশার প্রতিচ্ছবি। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীরা এমন এক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শিক্ষা নীতিমালা, কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতিসবকিছুই বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের ফলাফল কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে অনেক সময় পরীক্ষামূলক একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই অনুভব করে, যেখানে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

প্রথমত, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন। একটি ব্যাচ যখন একটি নির্দিষ্ট সিলেবাস ও পদ্ধতিতে পড়াশোনা শুরু করে, তখন তারা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু মাঝপথে যদি সেই পদ্ধতি বদলে যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। নতুন কারিকুলামের লক্ষ্য হয়তো ভালোযেমন সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়নকিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তারা বুঝে উঠতে পারে না, কোন পদ্ধতিতে নিজেদের প্রস্তুত করবে, কিংবা কোন জ্ঞান বা দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব একটি বড় সমস্যা। নতুন কারিকুলাম চালু করা হলেও, অনেক শিক্ষক সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পান না। ফলে তারা পুরোনো পদ্ধতিতেই পড়াতে থাকেন, কিন্তু মূল্যায়ন হয় নতুন পদ্ধতিতে। এতে শিক্ষার্থীরা দ্বৈত সমস্যার সম্মুখীন হয়একদিকে তারা ঠিকভাবে নতুন বিষয়বস্তু আয়ত্ত করতে পারে না, অন্যদিকে পরীক্ষায় তাদের কাছ থেকে ভিন্ন ধরনের উত্তর প্রত্যাশা করা হয়। এই অসামঞ্জস্য শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।

তৃতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতির অসঙ্গতি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। স্কুলকলেজে বলা হয়, মুখস্থবিদ্যা কমিয়ে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলো এখনো অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর। ফলে শিক্ষার্থীরা দ্বিধায় পড়েতারা কি সৃজনশীলভাবে শিখবে, নাকি পরীক্ষায় ভালো করার জন্য মুখস্থ করবে? এই দ্বন্দ্ব তাদের শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের মতামতের গুরুত্ব খুবই কম। যেসব পরিবর্তন সরাসরি তাদের উপর প্রভাব ফেলে, সেই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা বা মতামত খুব কমই বিবেচনায় নেওয়া হয়। অথচ শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে ভালোভাবে বলতে পারে, কোন পদ্ধতি তাদের জন্য কার্যকর এবং কোনটি নয়। তাদের এই অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা হলে, নীতিনির্ধারণে একটি বড় ঘাটতি থেকে যায়।

এছাড়া, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও একটি বড় বাধা। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। নতুন কারিকুলাম অনেক সময় প্রযুক্তিনির্ভর বা কার্যক্রমভিত্তিক হয়, কিন্তু সব স্কুলে সেই সুযোগসুবিধা নেই। ফলে একদল শিক্ষার্থী এগিয়ে যায়, আরেকদল পিছিয়ে পড়েযা শিক্ষার সমতা নষ্ট করে।

তবে এটাও সত্য যে, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন। সময়ের সাথে সাথে নতুন দক্ষতা, নতুন জ্ঞান ও নতুন চাহিদা তৈরি হয়। সেই অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থাকে হালনাগাদ করা জরুরি। কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে পরিকল্পিত, ধীরগতির এবং পরীক্ষিত। হঠাৎ করে বড় পরিবর্তন এনে পুরো একটি প্রজন্মকে তার প্রভাবের মধ্যে ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সমাধানের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, কোনো নতুন কারিকুলাম চালুর আগে তা ছোট পরিসরে পরীক্ষা করা উচিত, যাতে এর কার্যকারিতা যাচাই করা যায়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও ভর্তি পরীক্ষার মধ্যে সমন্বয় আনা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা দ্বৈত চাপে না পড়ে। চতুর্থত, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নীতিমালা তৈরি করা যায় এবং সর্বোপরি, একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে না হয়।

সবশেষে বলা যায়, শিক্ষার্থীরা কোনো পরীক্ষার বস্তু নয়; তারা একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের নিয়ে বারবার পরীক্ষানিরীক্ষা করার আগে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত চিন্তা, বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ এবং দায়িত্বশীলতা। যদি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সত্যিই উন্নত করতে হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের “গিনিপিগ” বানানো বন্ধ করে তাদেরকে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই একটি কার্যকর, মানবিক ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: শিক্ষক ও কলাম লেখক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রকৃতি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়েই হোক টেকসই উন্নয়ন
পরবর্তী নিবন্ধমানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে