মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে

মো. দিদারুল আলম | শনিবার , ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:২৮ পূর্বাহ্ণ

কোচিং সেন্টার বন্ধ করলেই কি শিক্ষার মান বাড়বে? শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না করে কোচিং সেন্টার বন্ধ করা একটি অপরিকল্পিত ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ কমিয়ে দেবে। কার্যকর বিকল্প হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা, শিক্ষকদের জবাবদিহিতা এবং ইনহাউজ কোচিং বা এক্সট্রা কেয়ারচালু করা প্রয়োজন। এছাড়া কোচিং সেন্টার বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষকদের চিহ্নিত করতে হবে কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে দুর্বল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের ক্লাসরুমের বর্তমান ছাত্রশিক্ষক অনুপাতে কি তা বাস্তবে সম্ভব? যেখানে এক একজন শিক্ষককে ৫০৬০ জন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে হয়, সেখানে ব্যক্তিগত যত্ন দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোচিং সেন্টার মূলত এই শূন্যস্থানটিই পূরণ করে আসছিল। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো মুখস্থনির্ভর এবং জিপিএকেন্দ্রিক। যতক্ষণ পর্যন্ত ভালো রেজাল্ট = ভালো ক্যারিয়ারএই সমীকরণ থাকবে, ততক্ষণ শিক্ষার্থীরা বিকল্প পথ খুঁজবে।

কোচিং সেন্টার বন্ধ করা কেবল লক্ষণ নিরাময় করবে, রোগ নয়। আধুনিক ও আনন্দদায়ক শিক্ষাক্রম, শ্রেণিকক্ষেই শতভাগ পাঠদান নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং শ্রেণিকক্ষকে কোচিং সেন্টারের চেয়ে বেশি কার্যকর এবং আকর্ষণীয় করে তুললেই শিক্ষার প্রকৃত মান নিশ্চিত হবে। একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সর্বজনীন করে তুলতে হলে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান অপরিহার্য। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে সাশ্রয়ী, যাতে সর্বস্তরের মানুষ প্রবেশাধিকার পায়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করতে না পারলে অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হন। অনেক সময় ভালো ফলাফলের আশায়ও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কোচিং সেন্টারে পাঠান। স্বাভাবিকভাবে কোচিং সেন্টারে সন্তানকে পাঠানোর অর্থ হলো ওই পরিবারে শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়া।

দেশে বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান সেটি মূলত বৈষম্যমূলক। সংবিধান অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু এ রাষ্ট্র প্রাথমিকসহ অন্য স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মোটেও সর্বজনীন ও মানসম্মত করতে পারেনি। এতে দিন দিন শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষত কোচিং সেন্টারনির্ভর। ফলে কোচিংয়ের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৪এর তথ্য জানাচ্ছে, দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টারের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৮৭। এর মধ্যে একাডেমিক ৬ হাজার ৩১২টি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি বা চাকরিসংক্রান্ত কোচিং সেন্টার রয়েছে আরো ২৭৫টি। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, নিবন্ধনহীন কোচিং সেন্টারের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ এবং এসব কোচিং সেন্টার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট হলেও নিবন্ধন বা অনুমোদন দেয়া হচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। যে কারণে কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তদারকির বাইরে থেকে যাচ্ছে। এমনকি এগুলো পরিচালনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালাও নেই।

অতিরিক্ত কোচিংয়ের সংখ্যা মূলত এ বার্তা দিচ্ছে যে দেশে কোচিংয়ের চাহিদা আছে। এ চাহিদা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণই হলো শে্রিণকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। এগুলোয় শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের কোনো তদারকি হয় না। ফলে প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা, বরং বাড়তি আর্থিক চাপ বহন করতে হচ্ছে অভিভাবকদের। মাসিক ফি, ভর্তি ফি ও অন্যান্য খরচের কারণে পড়াশোনার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়ছে চরম আর্থিক চাপে। অভিভাবকদের উদ্বেগ, কোচিং সেন্টার বন্ধ বা এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও এগুলোর পরিচালনা সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় আনা প্রয়োজন।

শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক গভীর বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠছে যা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। সমাজের বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা যখন ঘরে বসে প্রতিটি বিষয়ের জন্য অভিজ্ঞ ও আলাদা শিক্ষকের নিবিড় সান্নিধ্য পাচ্ছে, তখন সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য কোচিং বা প্রাইভেট সেন্টারগুলোই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু এখন যদি সেই স্বল্পমূল্যের বা গণমুখী বিকল্পটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে বিশাল এক শিক্ষার্থী গোষ্ঠী চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। তার মানে যাদের সামর্থ্য আছে তারাই টিকে থাকবে।

এখন যদি বিকল্প এই শিক্ষার পথটি কোনো সুপরিকল্পিত একাডেমিক সমাধান ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে শিক্ষা কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির একচেটিয়া সম্পদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে সাধারণ ঘরের মেধাবী শিক্ষার্থীরা কেবল অর্থের অভাবে পিছিয়ে পড়বে। কোচিং বা প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সমাধানের নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোচিং বন্ধের সিদ্ধান্তটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল সংকটই বয়ে আনবে।

যদি সমতা আনতে হয়, তবে কেবল সুবিধা বন্ধ করা নয় বরং সরকারি ও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যেখানে আলাদা কোনো সাহায্যের প্রয়োজন পড়বে না। অন্যথায়, কোচিং বন্ধের এই পদক্ষেপে ধনীদের কোনো ক্ষতি হবে না, তারা ভিন্ন উপায়ে পড়াশোনা ঠিকই চালিয়ে যাবে। কিন্তু চরম সংকটে পড়বে সেই অগণিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবক, যারা একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় নিজেদের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠিয়ে শিক্ষার আলোটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। শিক্ষার অধিকার যেখানে সবার সমান হওয়ার কথা, সেখানে ব্যবস্থার এই ফাঁদে পড়ে সাধারণের স্বপ্নের অকাল মৃত্যু ঘটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীদের আর কত গিনিপিগ বানানো হবে
পরবর্তী নিবন্ধকৃতজ্ঞতা মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি