জুম’আর খুতবা

হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম’র দ্বীনি দাওয়াত

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ১২ জুন, ২০২৬ at ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় ইসলামী ভইয়েরা!

আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, সকাল সন্ধ্যা তাঁকে স্মরণ করুন। একমাত্র তাঁরই ইবাদত করুন। পৃথিবীতে পথ প্রদর্শক হিসেবে প্রেরিত তাঁর সম্মানিত নবী রাসূলদের জীবনকর্মের শিক্ষা ও আদর্শ গ্রহণ করুন। জেনে রাখুন, হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম আল্লাহর মনোনীত নবী রাসূলগণের অন্যতম।

হযরত যাকারিয়া (.)’র পরিচিতি: হযরত যাকারিয়া (.) ছিলেন সুলায়মান ইবন দাউদ (.)’র বংশধর। তিনি বনী ইসলাঈলের নবী ছিলেন। বোখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুলবারী ও তাফসীরে ইবনে কাসীর এর বর্ণনা মতে হযরত যাকারিয়া (.)’র পিতার নাম সমন্ধে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়, ঐতিহাসিক ইবনে আসাকির নিম্নরূপ বর্ণনা করেন যাকারিয়া ইবনে “ঊন” বা ইবনে শাবওয়া বা ইবনে লাদুন বা ইবনে বরখিয়া ইবনে মুসলিম। (ফাতহুল বারী, /৩৭)

হযরত যাকারিয়া (.)’র স্ত্রীর নাম ছিল “ইশা বিনতে ফাকুদ” (তাফসীরে সাবী, খন্ড:, পৃ: ৩১)

তাঁর পুত্র হযরত ইয়াহইয়া (.) তিনিও নবী ছিলেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের অধিবাসী ছিলেন। তিনি হযরত ইসা (.)’র জননী হযরত মারইয়াম (.) এর লালন পালনকারী অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল, ১ম খন্ড, পৃ: ১৩৫)

হযরত যাকারিয়া (.) ও ইয়াহহিয়া (.) এর জীবন কর্ম ও দ্বীনি দাওয়াতের বর্ণনা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের চারটি সূরা, সূরা আলে ইমরান, সূরা আল আন’আম, সূরা মারইয়াম ও সূরা আম্বিয়া এর ২২টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আল কুরআনে ৭ জায়গায় তাঁর বরকতময় নাম উল্লেখ হয়েছে।

হযরত যাকারিয়া (.) উপার্জিত রোজগার দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। যেমনটি করতেন হযরত দাউদ (.)। নবীগণ আলাইহিমুস সালাম কখনো আপন নবুওয়তকে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম করেন না। তাঁরা আপন উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজে আহার করতেন অন্যান্যদেরকে আহার করাতেন। (হাকীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী, কৃত: তাফসীর নূরুল ইরফান, সূরা: আন’আম, আয়াত: ৯০ সংশ্লিষ্ট তাফসীর, পৃ: ৩৬০)

আল কুরআনের আলোকে হযরত যাকারিয়া (.)’র মর্যাদা:

নবীগণ আলাইহিমুস সালাম আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব পালন করেন আল্লাহ তাঁদেরকে ইহকাল পরকালে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “আর যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা, ইলিয়াস এরা সকলেই নেককারদের অন্তভূক্ত, ছিলেন। (সূরা: আন’আম, আয়াত: ৮৫)

আল্লাহ তা’আলা যাকারিয়া (.) কে মারইয়ামের লালন পালনের দায়িত্বভার অর্পণ করেন:

যাঁরা বায়তুল মুকাদ্দাসের খিদমতের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, এক বর্ণনায় তাঁদের সংখ্যা ২৭ জন। তাঁদের সরদার ছিলেন হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম। হযরত মরিয়ম (.) এর পিতার নাম ইমরান এবং মাতার নাম হান্না। (তাফসীর সাবী, খন্ড:, পৃ: ১৬)

হযরত যাকারিয়া (.) মারইয়ামের খালু ছিলেন। ইমরানের স্ত্রী মান্নত করেছিলেন আমার যদি একজন পুত্র সন্তান হয় আমি তাকে আল্লাহর ঘর বায়তুল মুকাদ্দাসের খিদমতের জন্য উৎসর্গ করব। কিন্তু পুত্রের স্থলে কন্যা হযরত মারইয়াম (.) জন্ম গ্রহণ করলেন। মান্নত অনুযায়ী তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের খিদমতের জন্য উৎসর্গ করতে হবে, কিন্তু প্রশ্ন হলো সেখানে তাঁর অভিভাবক কে হবে? সম্ভবত: ঐ সময় মরইয়ামের পিতা ইমরান (.) জীবিত ছিলেন না। বংশের প্রত্যেকেই মারইয়ামের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী। অবশেষে লটারীর ব্যবস্থা করা হলো, লটারী প্রতিযোগিতায় বংশের প্রত্যেকে নিজেদের কলম গুলো সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে যার কলম পানিতে ভেসে চলে যাবে না তিনিই মারইয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেবেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, যখন তারা তাদের কলমগুলো দ্বারা লটারী টানছিলো (এ বিষয়ে) যে মারইয়াম কার লালন পালনের দায়িত্বে থাকবে। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৪৪)

লটারীর মধ্যে মারইয়াম (.) এর লালন পালন তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (.)’র উপর অর্পিত হলো। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, অত:পর আল্লাহ মারইয়ামকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে অর্পণ করলেন, যখনই যাকারিয়া (.) তাঁর নিকট হুজরায় (মেহরাবে) প্রবেশ করতেন তখনই তাঁর নিকট খাদ্য সামগ্রী দেখতে পেতেন সে বলত হে মারইয়াম এটা তোমার নিকট কোথা হতে এসেছে? মারইয়াম বললেন সেটা আল্লাহর নিকট থেকে, নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত রিযিক দান করে থাকেন। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৩৭)

আয়াত সংশ্লিষ্ট তাফসীর:

হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রহ.) “প্রণীত তাফসীর নূরুল ইরফানে” বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, মারইয়াম (.) আল্লাহর ওলী ছিলেন। ওলীর কারামত সত্য। মারইয়াম (.) মসজিদ সংলগ্ন মেহরাবে থাকতেন, যাকারিয়া (.) তাঁকে দেখাশুনা করতেন। হযরত মারইয়াম ছিলেন হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম’র মা বায়তুল মুকাদ্দাসের খিদমতগার, গুনাহ থেকে পবিত্র। মহান আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে নিয়োজিত থাকতেন।

নারী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের খিদমতের জন্য মনোনীত করেছেন, হযরত যাকারিয়া (.) কে তাঁর অভিভাবক করেছেন, জান্নাতী তরুতাজা ফল ফলাদি, খাদ্য সামগ্রী দিয়ে তাঁকে লালন পালন করেছেন, হযরত মারইয়াম এর হুজরায় বেমৌসুমী ফলমূল প্রদত্ত হওয়া তাঁর কারামত ছিল।

হযরত মারইয়াম (.) মাতৃগর্ভের ওলী ছিলেন, শিশুকাল থেকেই ওলী ছিলেন। তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর লালন পালন জান্নাতী ফলমূল দ্বারা হয়েছে, মায়ের দুধে নয়, দুনিয়ার কোনো খাদ্য সামগ্রী দ্বারাও নয়। (খাযাইনুল ইরফান, তাফসীর নূরুল ইরফান, পৃ: ১৩৯)

হযরত যাকারিয়া (.) এর পত্নী ঈশা (আল ইয়াশা) এবং হযরত মারইয়াম (.) এর মাতা হান্না উভয়ে পরস্পর সহোদর ভগ্নি ছিলেন। (ফাতহুল বারী) খালা মাতার তুল্য। মারইয়াম (.) যখন বোধমতী হলেন তখন হযরত যাকারিয়া (.) তাঁর জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি হুজরা (নির্জন কামরা) নির্দ্দিষ্ট করে দিলেন। হযরত মারইয়াম সারাদিন আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে অতিবাহিত করতেন এবং রাতে তাঁর খালার নিকট চলে যেতেন। [আল বিদায় ওয়ান নিহায়া, কৃত: আল্লামা হাফেয ইবনে কাসীর (রহ.)]

হযরত যাকারিয়া (.) এর প্রার্থনা কবুল করলেন, বার্ধক্য অবস্থায়

আল্লাহ তা’আলা তাঁকে সন্তান দান করলেন:

হযরত যাকারিয়া (.) এর কোন সন্তান ছিলনা। তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা, সন্তান হওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু তাঁর অন্তর জগতে চিন্তার উদয় হলো যে মহান আল্লাহ হযরত মারইয়ামের নিকট বেমৌসুমী খাদ্য সামগ্রী দান করতে পারেন, তিনি কি আমাকে নৈরাশ্যপূর্ণ অবস্থায় একটি পুত্র সন্তান দান করতে পারেন না? নিশ্চয় তিনি সক্ষম। ইবনে কাসীর (রহ.) বর্ণনা অনুযায়ী তখন তাঁর বয়স ৭৭ বছর, তাফসীরকার ছালাবীর মতে ৯০ বছর, মতান্তরে ৯২ বছর, তাফসীরে নূরুল ইরফানের বর্ণনা মতে ১২০ বছর। তাঁর স্ত্রীর বয়স ৯৮ বছর, তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! আমার পরে বনি ইসরাইলদের হিদায়াত ও তাঁদের প্রতি দ্বীনি দাওয়াতের মাধ্যমে তাদেরকে সৎ পথে পরিচালিত করার জন্য আপনি আপনার তরফ থেকে আমাকে একজন যোগ্য উত্তরাধিকারী দান করুন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, আর স্মরণ করুন, যাকারিয়ার কথা যখন তিনি তাঁর প্রভুকে ডেকে বলেছিলেন হে আমার রব! আমাকে নিঃ সন্তান অবস্থায় রাখবেন না। আর আপনি তো সর্বোত্তম ওয়ারিশ। (সূরা: আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯)

আল্লাহ তা’আলা আরো এরশাদ করেছেন, এখানে প্রার্থনা করলো যাকারিয়া আপন রবের নিকট আরজ করলো হে আমার রব! আমাকে তোমার নিকট থেকে দান করো পবিত্র সন্তান নিশ্চয়ই তুমিই প্রার্থনা শ্রবণকারী। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৩৮)

আল্লাহ তাঁর নবীর দুআ কবুল করলেন, সুসংবাদ দেয়া হলো, আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, হে যাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি তার নাম হবে ইয়াহইয়া, ইতোপূর্বে আমি এ নামে কারো নামকরণ করিনি। (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ০৭)

পার্থিব স্বার্থের জন্য নয় মহান আল্লাহর দ্বীনের খিদমতের জন্য পুত্র সন্তান লাভের দুআ করা নবীগণের সুন্নাত, যেন তাঁরা দ্বীনদার ও সৎকর্ম পরায়ণ হয়।

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে নবী রাসূল আলাইহিমুস সালামদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

 

[ইসলাম সম্পর্কিত পাঠকের প্রশ্নাবলি ও নানা জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি। আগ্রহীদের বিভাগের নাম উল্লেখ করে নিচের ইমেলে প্রশ্ন পাঠাতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। Email : azadieditorial@gmail.com]

 

মুহাম্মদ আবদুল করিম

গরীব উল্লাহ শাহ হাউজিং সোসাইটি, খুলশী, চট্টগ্রাম

প্রশ্ন: ১৮ জিলহজ্ব তারিখে ঈদে ‘গদীরে খুম’ নামক উৎসব পালন শরীয়ত সম্মত কিনা? জানালে কৃতার্থ হব।

উত্তর: ইসলামে ঈদে “গদীরে খুম” নামে কোন উৎসব স্বীকৃত নয়। শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারীরা “গদীরে খুম” সংক্রান্ত হাদীসের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে হযরত মাওলা আলী (রা.)’র প্রতি ভালোবাসার নামে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্গন করে ১৮ জিলহজ্ব ঈদে গদীরে খুম নামক তথাকথিত ঈদ উৎসব পালন করে থাকে। এটা মুসলমানদের উৎসব নয়, এটা শিয়াদের উৎসব। সর্বপ্রথম ৩৫২ হিজরিতে শিয়া শাসক মুইজ্জুদ্দৌলা ১৮ জিলহজ্ব ঈদে গদীরে খুম পালনের নির্দেশ দেয়, তখন থেকে ইরানে শিয়া সম্প্রদায় এ উৎসব পালন করে আসছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা মতে খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফার খিলাফত সত্য, এটার উপর সর্বসম্মত ইজমা প্রতিষ্ঠিত। শিয়ারা হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.) ও হযরত ওসমান (রা.) এর খিলাফত কে অস্বীকার করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর হযরত মওলা আলী (রা.) কেই সরাসরি খলিফা মনে করে থাকে। এটা শিয়া রাফেজীদের ভ্রান্ত আকিদা। আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো যারা হযরত মওলা আলী (রা.) কে “হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)” এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করবে তারা বিদয়াতি। (রদ্দুল মুখতার, খন্ড: , পৃ: ৩৬৩)

জমহুর ফোকাহাদের মতে হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)’র খিলাফত অস্বীকারকারী কাফির, এটাই বিশুদ্ধ মত। (ফতোওয়ায়ে রিজভীয়া, খন্ড: ১৪, পৃ: ২৫১, “ঈদে গদীর কী হাকিকত”, পৃ: ৭৭,৭৮)

পূর্ববর্তী নিবন্ধনিতাই সেনের ‘স্মৃতির সম্ভার’ : পাঠমুগ্ধতার সিম্ফনী
পরবর্তী নিবন্ধদেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত