সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তিতে বাজেটের যুগান্তকারী পদক্ষেপ

শহীদুল ইসলাম সাজ্জাদ | সোমবার , ২৭ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ

সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার এবং টেকসই উন্নয়নের মূলধারায় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করার যে রূপকল্প, নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তার স্পষ্ট ও ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক সামর্থ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও অধিকার সুরক্ষায় সরকার কতটা আন্তরিক।

বাজেটে সমাজকল্যাণ ও সুরক্ষার নবদিগন্ত : সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সমপ্রসারণে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বাজেট প্রস্তাবে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৮ লাখে উন্নীত করা হয়েছে এবং ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ১,০০০ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির ধারা ত্বরান্বিত করতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এই উপবৃত্তি প্রতিবন্ধী শিশু ও যুবদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

বিশেষ করে অটিজম ও অন্যান্য জটিল প্রতিবন্ধিতা থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা সরকারের একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও মানবতাবাদী চিন্তা। ব্যবসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক কর ছাড়: বর্তমান সরকারের ঘোষিত রাজস্ব নীতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গ ও তাঁদের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার এক অভূতপূর্ব প্রচেষ্টা দেখা যায়।

ব্যক্তিগত করমুক্ত সীমা: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা সাধারণ করদাতাদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

অভিভাবকদের জন্য স্বস্তি: প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবামা বা অভিভাবকদের জন্য সন্তানপ্রতি অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকার কর ছাড়ের বিধান রাখা হয়েছে, যা পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ অনেকটাই কমাবে।

উদ্যোক্তা বান্ধব নীতি: সাধারণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টার্নওভার ছাড়ের সীমা ৫০ লাখ টাকা হলেও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য তা করা হয়েছে ৭০ লাখ টাকা। এটি তাঁদের আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করবে।

দাতব্য সংস্থায় অর্থায়ন সহজীকরণ: প্রতিবন্ধী সেবা ও অটিজম খাতকে করছাড়যোগ্য ক্যাটাগরিতে আনার ফলে বেসরকারি খাত ও দানশীল ব্যক্তিরা এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে আরও বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন ও আগামী দিনের রূপরেখা : বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ভাতা কাঠামো প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেভাবে সামাজিক সুরক্ষা খাতের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে, তা অত্যন্ত আশা ব্যঞ্জক। আগামীতে এই ধারাকে আরও বেগবান এবং আন্তর্জাতিক সনদের (সিআরপিডি) সাথে পুরোপুরি মানানসই করতে কিছু সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর আলোকপাত করা যেতে পারে:

. তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে বিন্যাস: সামাজিক নিরাপত্তার সুফল আরও বৈষম্যহীন করতে প্রতিবন্ধিতার ধরণ (মৃদু, মাঝারি ও তীব্র) অনুযায়ী একটি স্তরভিত্তিক বা ‘গ্রেডেড‘’ সুবিধা প্রবর্তন করা যেতে পারে, যেন সর্বোচ্চ সহায়তার প্রয়োজন যাঁদের, তাঁরা বেশি উপকৃত হন।

. প্রবেশগম্যতা ও অবকাঠামো উন্নয়ন: গণপরিবহন ও সরকারি ভবনগুলোতে ‘অ্যাক্সেসিবিলিটি’বা প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে বিশেষ বরাদ্দ বাড়ালে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সহজ হবে।

. আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়: জলবায়ু বা জেন্ডার বাজেটের মতো একটি সমন্বিত ‘প্রতিবন্ধী বাজেট’ (ডিজএ্যাবিলিটি বাজেট) কাঠামো গ্রহণ করা হলে সকল মন্ত্রণালয়ের সেবাসমূহ এক সূত্রে গেঁথে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা আরও সহজ হবে।

অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট কেবল একটি বার্ষিক আয়ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির পথে একটি সুস্পষ্ট মাইলফলক। সরকারের এই জনকল্যাণমুখী সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি আধুনিক, প্রবেশগম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে আরও উঁচুতে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, ডিজএ্যাবল্ড ডেভেলপমেন্ট এন্ড রিসার্চ সেন্টারডিডিআরসি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভেষজ চিকিৎসা ও ঔষধি গাছ
পরবর্তী নিবন্ধহে নবীন, এ লেখাটি তোমাদের জন্য