প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র বংশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন। আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতা মাতা প্রসঙ্গে উত্তম ধারণা পোষণ করুন। জেনে রাখুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ ৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন, ২৪ বৎসর ৭ মাস বয়সে তিনি মদীনার খ্যাতনামা ব্যবসায়ী ওহাবের কন্যা আমিনার সাথে দাম্পত্য জীবনে আবদ্ধ হন। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে প্রিয় নবীর পিতা হযরত আবদুল্লাহ (রা.) ইহধাম ত্যাগ করেন। পিতা আবদুল্লাহর ইন্তিকালের ৫ মাস পর সোমবার ১২ রবিউল আউয়াল ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে সুবহে সাদিকের সময় কুরাইশ বংশের হাশেমী গোত্রে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে অবির্ভূত হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৬ বছর বয়সে ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মা আমেনা (রা.) ইন্তিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “আমি হলাম ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দুআ, ঈসা আলাইহিস সালামের সুসংবাদ, আমার আম্মাজানের স্বপ্ন, আমার জন্মের সময় আমার মা স্বপ্ন দেখেছেন তাঁর জন্য একটি নূর বের হলো উক্ত নূরের আলোতে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলো তাঁর জন্য আলোকিত হয়ে গেল। (তাফসীর বগভী ১/১৫১)
পবিত্র কুরআনের আলোকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর
পিতা–মাতার ঈমান প্রসঙ্গ:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম‘র পিতা–মাতা, ও পূর্বপুরুষদের সকলে দ্বীনে হানিফ তথা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কুফর শির্কের কোন প্রকারের অপবিত্রতা তাঁদেরকে কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি, তাঁদের জীবন ছিল নিষ্কলুষ তথা সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। মহান আল্লাহ্ তা‘আলা নবীজির আগমনের বিষয়ে পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, আমি আপনাকে সিজদাকারীদের পৃষ্ঠের মাধ্যমে স্থানান্তরিত করেছি। (সূরা শুরা, আয়াত:২১৯)
বিশ্বখ্যাত তাফসীরকার হযরত আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুযুতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি উপর্যুক্ত আয়াতে করীমার তাফসীর প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম‘র নূর মোবারক এক সিজদাকারী থেকে অন্য সিজদাকারীর দিকে স্থানান্তরিত হয়েছিল। এরই প্রেক্ষিতে এ আয়াত এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম‘র পূর্ব পুরুষদের সকলেই মুসলমান ছিলেন। (আল হাভী লিল ফাতওয়া, খন্ড:২, পৃ: ৪১৩)
উপরোক্ত আয়াতে করীমার ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি উল্লেখ করেন, হযরত মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে, প্রতিটি যুগে পৃথিবীতে এমন সাতজন বা ততোধিক লোক বিদ্যমান থাকেন, যদি তারা না থাকতেন তাহলে পৃথিবী তার বাসিন্দাসহ ধ্বংস হয়ে যেত। (ইমাম আবদুর রায্যাক, আল মুসান্নাফ ৫/৯৫, হাদীস–৯০৯৯)
হযরত ইমাম সুয়ুতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এ কথা প্রমাণ করতে চান যে, সেই যুগে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী মুসলমান ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম‘র পিতা–মাতা। (আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড: ১, পৃ: ৪১৯)
হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেন, হযরত মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এরশাদ করেছেন, হযরত জিবরীল আলায়হিস্ সালাম হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লাম–এর নিকট আরয করলেন, হে মাহবুব! (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাকে সালাম প্রেরণ করেছেন এবং এরশাদ করেছেন, আমি জাহান্নামের আগুন হারাম করেছি সেই পৃষ্ঠদেশের উপর যেথায় আপনি আছেন এবং সেই পেটের উপর যে পেট মুবারক আপনাকে বহন করেছে এবং সে ক্রোড়কে যে কোল মুবারক আপনাকে দোলনার মতো খেলা দিয়েছে। (আল হাভী লিল ফাতওয়া, খন্ড: ১, পৃ: ৪৩২)
আ‘লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খাঁন বেরলভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম‘র সম্মানিত পিতা–মাতার মর্যাদা প্রসঙ্গে হাদীসের উদ্ধৃতির আলোকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আদম আলায়হিস সালাম থেকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত নবীজির পবিত্র সত্তা সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম। রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আমি বংশগত দিক থেকে তোমাদের থেকে সর্বোত্তম এবং পিতার দিক থেকেও তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। (দালায়েলুন নবুওয়াত, খন্ড:১, পৃ: ১৭৬, শুমূলুল ইসলাম, পৃ: ১৮,১৯)
হাদীস শরীফের আলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র
পিতা–মাতার ঈমান প্রসঙ্গ:
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম যখন জান্নাতে ছিলেন তখন আপনি কোথায় ছিলেন? তিনি বললেন, আমি আদম আলায়হিস সালাম‘র পৃষ্ঠদেশে ছিলাম। আর যখন তাঁকে পৃথিবীতে পাঠানো হলো তখনও আমি তাঁর পৃষ্ঠে ছিলাম এবং আমাকে আমার পিতা নূহ আলায়হিস্ সালাম‘র পৃষ্ঠের মাধ্যমে কিশতিতে আরোহণ করানো হয়েছিলো। আমার পিতা ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম‘র পৃষ্ঠের মাধ্যমে আমাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো, আমার পিতা মাতাকে ব্যভিচারের কলংক কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। আমি পবিত্র পৃষ্ঠদেশসমূহ হতে পবিত্র গর্ভাশয় সমূহে নিষ্কলুষ হয়ে স্থানান্তরিত হয়ে আবির্ভূত হয়েছি। (আল ওয়াফা বি আহওয়ালিল মুস্তফা, খন্ড:১)
বর্ণিত হাদীস শরীফে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের পিতা মাতা ও পূর্ব পুরুষদের পবিত্রতা ও প্রশংসা আলোকপাত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে ইসলাম নামধারী কুরআন সুন্নাহর অপব্যাখ্যাকারী এক শ্রেণির লোকেরা ইসলামের সঠিক আক্বিদা বিশ্বাসের বিপরীতে মনগড়া অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সরলপ্রাণ মুসলমানদেরকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করে যাচ্ছে। তারা প্রচার করে যাচ্ছে যে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম‘র পিতা, মাতা, হযরত আব্দুল্লাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও হযরত মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা, তাঁরা নাকি জাহান্নামী। (নাউযুবিল্লাহ) তাঁরা নাকি কুফুরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে।(নাউযুবিল্লাহ)
নবীজির পিতা মাতা প্রসঙ্গে উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু
তা‘আলা আনহার বর্ণনা :
বিশ্ববিখ্যাত হাদীস বিশারদ ও তাফসীরকারদের মধ্যে হাফিয আবু বকর খতীব বাগদাদী, ইমাম কুরতুবী, মুহিব তাবরী, আল্লামা নাছির উদ্দিন ইবনে মুনীর প্রমুখের বর্ণনা মতে নবীজি কর্তৃক আল্লাহর দরবারে নবীজির পিতা মাতাকে কবরে জীবিত করার প্রার্থনার প্রেক্ষিতে নবীজির সম্মানার্থে আল্লাহ্ তা‘আলা নূর নবীজির পিতা–মাতাকে কবরে জীবিত করেছেন। তাঁরা নবীজির উপর ঈমান এনেছেন, আল্লামা সুহাইলী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি “রওযুল উনস”, কিতাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন, উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন, তাঁর পিতা–মাতাকে জীবিত করে দেয়ার জন্য। আল্লাহ তা‘আলা নবীজির সম্মানার্থে তাঁদেরকে জীবিত করে দিলেন। তাঁরা নবীজির উপর ঈমান আনলেন, অতঃপর পুনরায় মৃত্যবরণ করলেন। (যুরকানী আলাল মাওয়াহিব, খণ্ড–১, পৃ. ১৬৮, আল হাভী লিল ফাতাওয়া, খণ্ড–২, পৃ. ৪৪০)
আ‘লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা‘আলা নবীজির পিতা–মাতাকে আসহাবে কাহফের মতো জীবিত করেছেন, তাঁরা যেন নবীজির উপর ঈমান এনে সাহাবীয়তের মর্যাদা লাভে ধন্য হন। (শুমুলুল ইসলাম, পৃ. ২২, আনোয়ারুল বয়ান, খণ্ড–১, পৃ. ৪২১)
যারা নবীজির পিতা মাতার প্রসঙ্গে মন্দ ধারণা করে তারা নবীজিকে কষ্ট দেয়। যারা নবীজিকে কষ্ট দেয়, তারা আল্লাহকে কষ্ট দেয়। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, যারা আল্লাহর রাসুলকে কষ্ট দেয় তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।(সূরা আত তাওবা, আয়াত: ৬১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও রাসূলকে কষ্ট দেয় তাদেরকে মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে অভিসম্পাত করেন এবং মহান আল্লাহ্ তাদের জন্য অপমানজনক শাস্তি তৈরী করে রেখেছেন। (সূরা আল আহযাব। আয়াত–৫৭)
আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী বর্ণনা করেন, নবীজি এরশাদ করেছেন, তোমরা মৃতদেরকে গালি দেয়ার মাধ্যমে জীবিতদেরকে কষ্ট দিওনা। (কানযুল উম্মাল, হাদীস–৩৭৪১৮, ইমাম আহমদ রেযা, শুমুলুল ইসলাম, পৃ. ২৫)
ইমাম কাযী আবু বকর রাহমাতুল্লাহি আলায়হিকে জিজ্ঞেস করা হলো, যে ব্যক্তি নবীজির পিতা–মাতাকে জাহান্নামী বলে তার ব্যাপারে আপনার মত কি? তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে সেই ব্যক্তি লানতপ্রাপ্ত। এর চেয়ে বড় কষ্টদায়ক কথা কি হতে পারে, যে বলবে নবীজির পিতা–মাতা জাহান্নামী। (আল–হাভী লিল ফাতাওয়া, খণ্ড–২, পৃ. ৪৪২)
উপরোক্ত দলীল প্রমাণের আলোকে প্রতীয়মান হলো, নবীজির পিতা–মাতা মুমিন, মুসলমান এবং জান্নাতী।
আল্লাহ তা‘আলা নবীজির পিতামাতার মর্যাদা–শান বুঝার তাওফিক দিন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।
[ইসলাম সম্পর্কিত পাঠকের প্রশ্নাবলি ও নানা জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি। আগ্রহীদের বিভাগের নাম উল্লেখ করে নিচের ইমেলে প্রশ্ন পাঠাতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। Email : azadieditorial@gmail.com]
মুহাম্মদ আনোয়ারুল আজীম
গাছবাড়ীয়া, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে শরয়ী আদব ও শিষ্ঠাচারিতা সম্পর্কে সংক্ষেপে জানালে কৃতার্থ হব।
উত্তর: হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (রহ.) বর্ণনা করেন, কথাবার্তা চার ধরনের। ১. সম্পূর্ণ কথাটাই ক্ষতিকর, ২. একান্ত উপকারী কথাবার্তা, ৩. কিছু ক্ষতির কিছু উপকারী, ৪. না ক্ষতিকর না উপকারী। পুরোটা ক্ষতিকর কথাবার্তা থেকে সর্বদা বিরত থাকা জরুরি, একান্ত উপকারী কথা বলুন। যে কথায় ক্ষতি ও উপকার রয়েছে সেক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। যে কথায় না ক্ষতি না উপকার তা দ্বারা সময় নষ্ট নয়। এ সব ক্ষেত্রে চুপ থাকা উত্তম। (মিরআতুল মানাজীহ, খন্ড:৬, পৃ: ৪৬৪)
মন্দ কথা থেকে সর্বদা বিরত থাকুন, গালমন্দ করা হারাম। (ফতোওয়ায়ে রযভিয়া, খন্ড:২১, পৃ: ১২১)
অশ্লীল কথা হলো লজ্জাজনক বিষয় স্পষ্ট শব্দ দ্বারা আলোচনা করা। (ইহয়াউল উলুম, খন্ড:৩, পৃ: ১৫১)
কথা বলার সময় পর্দার স্থানে হাত স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।











