মানবতা : স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতার অন্তর্নিহিত তাত্ত্বিক ও চিন্তাগত ভিত্তি

ড. উজ্জ্বল কুমার দেব | শুক্রবার , ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ

১৮৯৩ সালে ১১ ই সেপ্টেম্বর আমেরিকার শিকাগো শহরে বিশ্ব ধর্ম মহাসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক ত্রিশ বছরের যুবক সন্ন্যাসী মাত্র দুটি শব্দে পুরো কলম্বাস হলঘর কাঁপিয়ে দিলেন। সিস্টার্স এন্ড ব্রাদার্স অফ আমেরিকা” –এই সম্বোধনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর সমগ্র দর্শনের সার কথা। সেই সার কথাটি হলো মানবতা। পাশাপাশি উল্লেখ করতে হয় উনি ব্রাদার্স এন্ড সিস্টার্স বলেন নাই কিন্তু; বরং বলেছেন সিস্টার্স এন্ড ব্রাদার্স , যা মা জাতির উপর তাঁর সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। স্বামীজীর শিকাগো বক্তৃতা কোনো ধর্মীয় প্রচারপত্র ছিল না। এটি ছিল একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর জন্য লেখা মানবতার ইশতেহার। এই বক্তৃতার দার্শনিক ভিত্তিতে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল বেদান্ত, শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা এবং স্বামীজির নিজস্ব জীবনঅভিজ্ঞতার পর্যবেক্ষণ। কিন্তু সেই সব কিছুর কেন্দ্রে ছিল একটিই ধারণা – “মানুষই দেবতা

তাঁর বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেছেন সব আত্মাই এক। স্বামীজির মানবতাবাদের প্রথম এবং প্রধান দার্শনিক ভিত্তি হলো এই অদ্বৈত বেদান্ত। উপনিষদের ঘোষণা তত্ত্বমসি“-তুমিই সেই ব্রহ্ম। শঙ্করাচার্য যে অদ্বৈতবাদ প্রচার করেছিলেন, স্বামীজি তাকে মন্দির থেকে নামিয়ে মানুষের কাতারে নিয়ে এলেন সেবার মাধ্যমে। অনেকে আবার এও বলেন, বনের বেদান্তকে লোকালয়ে নিয়ে এসেছেন তিনি। আগে সাধুরা নিজের মুক্তির জন্য বনে গিয়ে ধ্যানমগ্ন থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতো । এখনকার চিন্তা মানুষের সেবার মধ্যে দিয়ে মুক্তির উপায়। তাঁর মতে, প্রতিটি মানুষের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় ঈশ্বর বাস করেন। প্রতিটি আত্মাই সম্ভাব্য দেবতা। যদি প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর থাকেন, তাহলে একজন মানুষকে ঘৃণা করা মানে ঈশ্বরকেই ঘৃণা করা। একজন মানুষকে সাহায্য করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা। এই কারণেই তিনি শিকাগোতে বলতে পারলেন, “আমি গর্বিত যে আমি এমন একটি ধর্মের অন্তর্ভুক্ত, যা জগৎকে সহনশীলতা ও সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার শিক্ষা দিয়েছে। এখানে সহনশীলতাশব্দটির অর্থ শুধু সহ্য করা নয়। এর অর্থ হলো অন্যের ধর্ম, মত, পথকে নিজের পথের মতোই সত্য বলে স্বীকার করা। কারণ উৎস এক। যখন আমরা সবাই একই ব্রহ্মের অংশ, তখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দেশের ভেদাভেদ অর্থহীন। এই একত্ববোধই হলো মানবতার আসল ভিত্তি। স্বামীজি এই দর্শনকে শুধু মুখে বলেননি। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের সামনে দাঁড়িয়ে কালো মানুষদের ভাইবলে সম্বোধন করার সাহস তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের গুরু শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁকে শিখিয়েছিলেন সমন্বয়ের শিক্ষা। ঠাকুর বলতেন, “একটি পুকুরে অনেক ঘাট। হিন্দু এক ঘাটে জল খায়, মুসলমান আরেক ঘাটে, খ্রিস্টান আরেক ঘাটে। কিন্তু পুকুরে সেই একই জল। শিকাগো বক্তৃতায় স্বামীজি এই কথাটিকেই কাব্যিক ভাষায় বললেন, যেমন বিভিন্ন ঝর্ণা বিভিন্ন স্থান থেকে উৎপন্ন হয়ে সাগরে মিলিত হয়, তেমনি মানুষেরা নিজেদের রুচির বৈচিত্র্যের জন্য সরল ও জটিল নানা পথ ধরে চলে, কিন্তু দিনশেষে সবাই অনন্ত ঈশ্বরাভিমুখী। এটি ধর্মীয় বহুত্ববাদের এক অপূর্ব ঘোষণা। পাশ্চাত্য তখন আমার ধর্মই একমাত্র সত্য” – এই ফ্যানাটিসিজমে ভুগছিল। স্বামীজি এসে বললেন, সত্য একাধিক পথে আসতে পারে। মতের বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তার জন্য হত্যা, বিদ্বেষ, যুদ্ধ নয়। তিনি স্পষ্ট বললেন, “ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি এবং তার ভয়ংকর ফল, হস্তধৃত তরবারিই এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুবার রক্তে স্নাত করেছে। মানবতার প্রথম শর্ত হলো অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা। এই শিক্ষা তিনি তাঁর গুরুর কাছ থেকে পেয়েছিলেন এবং গোটা পৃথিবীকে তা প্রচার করার মাধ্যমে উপহার দিলেন।

বেদান্ত যদি শুধু জঙ্গলে বসে ধ্যান করার জন্য হতো, তাহলে স্বামীজি তা কখনোই প্রচার করতেন না। তিনি বেদান্তকে করলেন প্রায়োগিক। তাঁর বিখ্যাত সখার প্রতিকবিতার সেই উক্তিটি হলো – “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। শিকাগোতে তিনি পাশ্চাত্যকে দুই হাত তুলে অভিনন্দন জানালেন তাদের বৈজ্ঞানিক উন্নতির জন্য। কিন্তু একই সাথে বললেন, তোমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান আছে, আমাদের আধ্যাত্মিকতা আছে। দুটো মিললেই মানুষ হবে পূর্ণ। তাঁর মানবতা শুধু কথার কথা ছিল না। তিনি বললেন, ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও, অশিক্ষিতকে শিক্ষা দাও। যে দেশে মানুষ তিনবেলা খেতে পায় না, সেখানে মন্দির বানিয়ে লাভ নেই। আগে মানুষ বাঁচাও, তারপর ঈশ্বরের কথা বলো। এই দরিদ্র নারায়ণের সেবা” – এই ধারণাটিই পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ মিশনের হাসপাতাল, স্কুল, ত্রাণকার্য্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। স্বামীজির কাছে মানবসেবা আর ঈশ্বরসেবা আলাদা কিছু ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন মানবসেবার মাধ্যমেই আমাদের মুক্তি হবে।

১৮৯৩ সাল ছিল সাম্রাজ্যবাদের যুগ। গোটা পৃথিবী ভাগ হয়ে গিয়েছিল আমরাআর ওরা“-তে। স্বামীজি এই বিভাজন ভেঙে দিলেন। তিনি নিজেকে একজন হিন্দু সন্ন্যাসীহিসেবে পরিচয় দিয়েও বললেন, “আমি কোনো জাতির, কোনো দেশের নই। আমি মানবতার। আমি দিতে এসেছি নিতে নয়। তিনি বললেন, পশ্চিম দেবে বস্তু, পূর্ব দেবে ভাব। পশ্চিম দেবে বাহুবল, পূর্ব দেবে আত্মবল। এই দুইয়ের মিলনেই ভবিষ্যতের সভ্যতা গড়ে উঠবে। এখানে কোনো জাতি বড় না, কোনো জাতি ছোট না। সবাই পরস্পরের পরিপূরক। স্বামীজির মানবতার আরেকটি দিক হলো দুর্বলকে শক্তি দেওয়া। তিনি জানতেন, যে নিজেকে দুর্বল ভাবে সে কখনো অন্যকে ভালোবাসতে পারে না। তাই তিনি বললেন, “উঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না। প্রথমে নিজেকে দেবতা বলে জানো, তারপর অন্যকে দেবতা বলে সেবা করো। আত্মবিশ্বাসহীন মানবতা ভিক্ষার মতো, আর আত্মবিশ্বাসী মানবতাই দানের মতো।

২৭ সেপ্টেম্বর সমাপনীয় ভাষণে স্বামীজি বলছিলেন, বিবদমান ধর্মীয় কোন্দলকে মিটিয়ে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক মসৃণ করার চেষ্টায় আমাদের নিয়োজিত থাকা উচিত। এ ধর্মসম্মেলন আমাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্যের মধ্যেও সাধারণ সমপ্রীতির যে আবহ তৈরি করেছে তাঁর জন্য আয়োজন কমিটি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। ধর্মীয় ঐক্যের সাধারণ ক্ষেত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলা হয়ে থাকে। তবে এখানে যদি কেউ আশা করে যে, এই ঐক্যটি যেকোনও একটি ধর্মের বিজয় এবং অন্যের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে আসবে, আমি তাকে বলি, “ভাই, আপনার পক্ষে এটি একটি অসম্ভব আশা।খ্রিস্টানকে হিন্দু বা বৌদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন নেই; তবে প্রত্যেককে অবশ্যই অন্যের ধর্ম বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে হবে এবং তার স্বতন্ত্রতা রক্ষা করতে হবে। যদি কেউ নিজের ধর্মের একচেটিয়া বেঁচে থাকার এবং অন্যের ধ্বংসের স্বপ্ন দেখে তবে তাকে বলি, শীঘ্রই প্রতিটি ধর্মে ও পতাকায় শত প্রতিরোধ সত্ত্বেও লিখিত হোক “বিবাদ নয়; সহায়তা, বিনাশ নয়; পরস্পরের ভাবগ্রহণ, মতবিরোধ নয়; সমন্বয় ও শান্তি”। মানবজাতিকে রক্ষায় এর চেয়ে ভাল আহবান আর হতে পারে না।

এখন চলছে ২০২৬ সাল, শিকাগো বক্তৃতার প্রায় ১৩২ বছর পেরিয়ে এসেছি। যুদ্ধ, সন্ত্রাস, ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ পৃথিবী আজও একই সমস্যায় ভুগছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে স্বামীজির শিকাগো বক্তৃতা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোতে কোনো নতুন ধর্ম দেননি। তিনি মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তার নিজের গৌরবের কথা। যতদিন মানুষ নিজেকে দেবতা বলে জানবে না, ততদিন সে অন্যকে মানুষ বলে মানবে না। আর যতদিন আমরা অন্যকে মানুষ বলে মানব না, ততদিন শান্তি আসবে না।

লেখক : অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, চুয়েট; বিভাগীয় সম্পাদক (চট্টগ্রাম), বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ, বাংলাদেশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্মরণে আবু তাহের চৌধুরী : যিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান