কদিন আগে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলো যে, অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টাগণ কে কত টাকা চিকিৎসা খরচ নিয়েছেন। আরেকটি তথ্য জানলাম, যেদিন বাজেট পাস হয় সেদিন রাষ্ট্রীয় খরচে ভোজের আয়োজন করা হত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই নাকি এই ব্যয় বাতিল করা হয়, যার খরচ আনুমানিক ৫০ লক্ষ টাকা। মাননীয় অর্থমন্ত্রী সংসদে জানান, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বা ম্যুরাল প্রচার নিয়ে কোন সময়ে কত কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এতে স্বভাবতই দেশের মানুষের মনে কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক যে, জনগণের টাকা কোন খাতে কীভাবে কত খরচ হচ্ছে।
গত দুই–তিন দশকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, তা অস্বাভাবিক অথবা বেপরোয়া বলা যেতে পারে। ১৯৮০–এর দশকে সরকার থানাকে উপজেলায় উন্নীত করে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পদ সৃষ্টি করে প্রত্যেক উপজেলায় একজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন তাঁদের কোনো গাড়ি ছিল না। অনেক দিন পর প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে একটি করে জিপ গাড়ি দেওয়া হয়। সেগুলোর পেছনের দিক খোলা ছিল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পরে এই জিপ গাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যানরাও ব্যবহার করা শুরু করে।
জনগণের মুখে কথার শেষ নেই। রাজনৈতিক দল ও আমলারা একে অপরের পরিপূরক। এখন পরিপূরক বলতে কী বোঝায়, তা প্রকাশ করাও কঠিন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। দীর্ঘদিন পর এই জাতীয় নির্বাচন দেশের ভাবমূর্তি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে বিএনপি দুই–তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে। জনাব তারেক রহমান–যার পিতা শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতিপক্ষরাও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি তো দূরের কথা, রাষ্ট্রীয় খরচে বিলাসী জীবনযাপনের অভিযোগও তুলতে পারেনি; তিনি অতীব সাদামাটা জীবনযাপন করে গেছেন। তাঁর পুত্র জনাব তারেক রহমান পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তিনি নিজে এবং তাঁর মন্ত্রিসভার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর ব্যাপারে।
তিনি ইচ্ছা করলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি সেল বা শাখা খুলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় জনসম্মুখে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করতে পারেন। প্রথমে তিনি নিজেকে নিয়েই শুরু করতে পারেন; যেমন তিনি মালয়েশিয়া হয়ে চীন গিয়েছিলেন, তখন তাঁর সাথে কতজন ছিলেন এবং কত লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল, তা প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রকাশ শুরু হোক।
গত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ঘনঘন বিদেশ সফর করেছেন। কোন সফরে কতজন গিয়েছিলেন এবং কত টাকা খরচ হয়েছিল, তা প্রকাশ করা হোক। তারও আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকায় অনেকবার বিদেশ সফর করেছেন। তাঁর কোন সফরে কতজন ছিলেন, তাও প্রকাশ করা হোক।
শুধু তাই নয়; মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিবসহ রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের কার জন্য কত টাকা খরচ হচ্ছে, তা জনগণকে জানানো হোক। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কোন খাতে কত টাকা খরচ হচ্ছে, তাও প্রকাশ করা হোক।
রাজধানী ঢাকার উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় খরচে কতটুকু বিলাসী জীবনযাপন করছেন, তা জনগণ বোঝে। অথচ এই ঢাকা মহানগরীতে শতকরা ৭০–৮০ জন মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এগুলো মন্ত্রী ও আমলাদের ভাবা উচিত। দেশের ১৮ কোটি জনগণের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বাস করছে–অনাহারে কিংবা অর্ধাহারে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যে ‘বাম হাতের‘ অর্থাৎ অসৎ উপায়ের অর্থের জোগান ছাড়া শতকরা কতজন তাঁদের স্ত্রী–সন্তান নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারছেন? বেসরকারি পর্যায়ে যাঁরা দারোয়ান, ড্রাইভার কিংবা গার্মেন্টসে চাকরি করছেন, তাঁদের সর্বোচ্চ বেতন ১৫–২০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়েই তাঁদের বাসা ভাড়া, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা খরচ এবং খাওয়া–দাওয়ার খরচ চালাতে হয়।
জনগণের করের টাকায় এবং প্রবাসীদের আয়ে তথা জনগণের টাকাতেই দেশ চলে। দেশের জনগণ অর্ধাহারে থাকবে আর জনগণের শাসকেরা জনগণের টাকা নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করবে, তা তো হতে পারে না। আমাদের দেশ এখন এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছে, যেখানে শাসকদের জনগণকে ভয় পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এখন উল্টো জনগণই শাসককে ভয় পাচ্ছে।
বাংলাদেশের শতকরা ৬০–৭০ জন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার খরচ চালানোর মতো সক্ষমতা নেই।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় আমাদের প্রতিবেশী বিশাল দেশ ভারতের কথা। তাদের দেশের সব কিছু ভালো–তা বলছি না। তবে যাঁরা রাষ্ট্র চালান, তাঁদের অনেককে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল; তাঁদের জীবনযাত্রা অতীব সাধারণ ও সাদামাটা।
১৯৮০ সালে দিল্লিতে দেখছিলাম, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সংসদ যাচ্ছেন ভারতে নির্মিত অ্যাম্বাসেডর কারে করে। তার সামনে বা পেছনে মাত্র ১টি বা ২টি গাড়ী নিরাপত্তার জন্য অ্যাম্বাসেডর কার।
দিল্লির রাজভবন চত্বরে নরেন্দ্র মোদি যখন দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন, তখন আমাদের দেশ থেকে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও তাঁর স্ত্রী সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদেরকে সামনের সারিতে বসার জন্য ছোট ছোট চেয়ার দেওয়া হয়েছিল। অথচ ঢাকায় যেকোনো বড় অনুষ্ঠানে প্রথম ও দ্বিতীয় সারিতে বিশাল বিলাসী চেয়ার দেয়া হয়; বড় চেয়ার না দিলে যেন ইজ্জত যাবে! চেন্নাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছিল; সেখানে মঞ্চে ৪০–৫০টি ছোট ছোট চেয়ার রাখা ছিল। কলকাতা বিধানসভায় একাধিকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা ব্যানার্জির দপ্তরে বসার জন্য সাধারণ ছোট কাঠের চেয়ার এবং ছোট টেবিল দেখতে পেয়েছিলাম। প্রয়োজনে বিশ্রাম নেয়ার জন্য কোনো দামি খাট নয়, বরং একটি সাধারণ চৌকি পাতা ছিল, যার ওপর চাদর বিছানো এবং একটি বালিশ রাখা ছিল। আমাদের দেশে যেকোনো অফিসে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের চেয়ার ছোট বা সাদামাটা হলে মনে হয় যেন বেমানান লাগবে ইজ্জত যাবে! রাষ্ট্রীয় খরচে জনগণের টাকায় বড় চেয়ার, বড় টেবিল আর শান–শওকত থাকতেই হবে।
প্রতিটি জেলায় প্রায় শতাধিক সরকারি দপ্তর রয়েছে, যেখানে জেলা প্রশাসকের দপ্তরসহ পরিচালক বা উপ–পরিচালকেরা বসেন। রাজধানীতে বহুতল বিশিষ্ট ভবনে শত শত দপ্তর রয়েছে, যেখানে বসেন দপ্তরের পরিচালক বা মহাপরিচালকেরা। আর এর ওপর মন্ত্রী ও সচিবদের সচিবালয় তো আছেই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিনীত অনুরোধ থাকবে, তিনি যেন তাঁর মহান পিতার অনুকরণ ও অনুসরণে দুর্নীতি উচ্ছেদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনে কঠোর হন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ব্যয় জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক। গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, তিনি উপদেষ্টা হিসেবে মাসিক, কি কি মিটিং সিটিং হবে এর থেকে কি কি ভাতা পেতেন এবং বিদেশ গমনাগমন করলে কি কি ভাতা পাওয়া যেত।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, স্পিকার থেকে এরপর মন্ত্রীদেরকে ব্যয় সংকোচন করা হোক। এতে স্বভাবতই সচিব থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তা–কর্মচারী পর্যন্ত ব্যয় সংকোচন করা খুবই সহজ হবে। ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি যে মিটিং সিটিং লাকজারি আহমরি না হওয়া চাই। বড় বড় চেয়ার বিলাসিতার প্রয়োজন কী। যেখানে ৭০–৮০ জন মানুষ দরিদ্র সীমায় বসবাস করছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, গবেষক।












