লামিন ইয়ামাল বিশ্ব-ফুটবলের বিস্ময় এক যুবকের নাম। ২০২৬ বিশ্ব ফুটবল তথা ফিফা (ফেডারেশন অব ইন্টারন্যশনাল ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন) আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলে মাত্র ১৯ বছর বয়সে অংশ গ্রহণ এবং বিশ্বকাপ জয়ে ইয়ামালের ভূমিকা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। বিশ্ব আরো বিস্মিত আর চমকে উঠেছে লামিন ইয়ামালের বিবেক জাগ্রত প্রতিবাদের নীরব অথচ প্রবল অবস্থান দেখে।
বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিলের পাশাপাশি আরেক শৈল্পিক ফুটবলের দেশ স্পেন ওয়ার্ল্ডকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মাদ্রিদে বাঁধ ভাঙা প্লাবনের মত বিজয় র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এই বিজয় র্যালির সম্মুখ ভাগে লামিন ইয়ামাল সবকিছুকে ছাড়িয়ে, সব উচ্ছ্বাস, উদ্বেলতা আর উল্লাসকে ছাড়িয়ে বেদনার বঞ্চনার, নিপীড়নের, হত্যার, হারানোর, পরাধীনতার বিরুদ্ধে দারুণ দ্রোহের এক পতাকা সব কিছুর উপর তুলে ধরেন। সে পতাকা বিশ্বের কোটি মানুষের সামনে আবারো পৃথিবীর বুকে সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডের বহমান এক জনপদ ফিলিস্তিনের কথা মনে করিয়ে দেয়, মনে করিয়ে দেয় গাজার মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা, মনে করিয়ে দেয় যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নিপীড়ন নির্যাতন আর বঞ্চনার কথা।
সে পতাকা মনে করিয়ে দেয় ১৯৪৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নাকাবা তথা দুর্দশার দিনের কথা। যে দিন লক্ষ ফিলিস্তিনিকে উদ্বাস্তু করা হয়, যেদিন ফিলিস্তিনের ৫০০এর ও বেশি গ্রাম ধ্বংস করা হয় সেদিনের কথা।
লামিনের হাতে তুলে ধরা ফিলিস্তিনের পতাকা গাজার সাম্প্রতিকের নিহত ৭৫০০০ (পঁচাত্তর হাজার) এর ও বেশি নিরীহ মানুষের আত্মার প্রতিবাদ যেন। সে পতাকা খাদ্যের জন্য সারিবদ্ধ দাঁড়ানো শিশুদের গুলি করে মারার বিরুদ্ধে উদ্ধত প্রতিবাদের প্রতীক, সে প্রতিবাদ ফিলিস্তিনে চলমান ওয়ার অব ইকনোমির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সে পতাকা যেন প্রথম আর দ্বিতীয় ইন্তেফাদার সম্মিলিত উচ্চারণ।
ইয়ামালের হাতে তুলে ধরা ফিলিস্তিনের পতাকা যেন আমেরিকার ইসরাইলকে ফিলিস্তিনে গণহত্যায় ক্রমাগত মদদ দানের বিরুদ্ধে উড্ডীন মুষ্টিবদ্ধ শপথ।
ইয়ামালের নীরব এই প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ ইসরাইলী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই বলে, “He is inciting hatred against Israel” ইয়ামাল তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। অথচ আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট যখন বলেন ফিফা থেকে আর্জেন্টাইনের আয় ইসরাইলের শিশুদের জন্য ব্যয় করা হবে, তখন ইসরাইলীদের দ্বারা ফিলিস্তিনি লক্ষ শিশুর হত্যাকাণ্ডের কথা তার মনে থাকে না। আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট বা ইসরাইলী প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর মনে থাকে না ঔষধের, পথ্যের, খাদ্যের, চিকিৎসার অভাবে গাজায়, পশ্চিম তীরে, নাবলুসে, জেরুজালেমে হাজারো ফিলিস্তিনী শিশু অনাদরে অকাতরে অকালে মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নিয়েছে।
বলাবাহুল্য অভাব বলতে এখানে টাকা পয়সার অভাবে বা ঔষধ, পথ্য, খাদ্যের বা চিকিৎসার দুষ্প্রাপ্যতার জন্য ফিলিস্তিনি শিশুরা মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে তা নয় বরং এগুলো পর্যাপ্ত বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলী প্রতিবন্ধকতাই এ অভাব সৃষ্টি এবং মৃত্যুর কারণ ঘটিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে আমেরিকার মদদ দানের পিছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করে প্রথমটি ইসরাইলের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে সস্তায় মধ্যপ্রচ্যের জ্বালানী লুণ্ঠন নিশ্চিত করা অন্যদিকে তাবেদার রাষ্ট্রগুলিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি এবং বাজার অবারিত রাখা।
অন্য কথায় আমেরিকান ওয়ার ইন্ডাস্ট্রিজকে সচল রেখে ওয়াশিংটনে ক্ষমতাসীনদের অর্থের যোগানদাতাদের মদদ দান। ইয়ামালের ফিলিস্তিনের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা এসবের বিরুদ্ধেও এক সন্নিবেশিত প্রতিবাদ।
আমেরিকার গাজা গণহত্যায় ইসরাইলকে মদদ দানে ক্ষুব্ধ বুশনেলের কথা আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। বুশনেল গাজায় চরম অন্যায় যুদ্ধে ইসরাইলকে সমর্থন দানের প্রতিবাদে নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুনে নিজেকে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।
বুশনেলদের আত্মত্যাগের মহিমাও লামিন ইয়ামালের উড়ানো পতাকায় যেন জানান দিয়ে গেছে। ইতিহাসে ‘বুশনেল’ এর কথাও লেখা থাকবে। বুশনেল আমেরিকান এয়ারর্ফোসের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার দেশ এবং ইসরাইলের বর্বরতার প্রতিবাদে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তার আত্মাহুতির ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বুশনেল তার ফোনে রেকর্ড করেন “আই এম এ্যাবাউট টু এনগেইজ ইন এন এক্সট্রিম এ্যাক্ট অব প্রটেস্ট, বাট কমপেয়ার টু হোয়াট পিপল হ্যাভবিন এক্সপিরিয়েন্সিং ইন প্যালেস্টাইন এ্যাট দি হ্যান্ডস অব দেয়ার কলোনাইজার, ইট ইজ নট এক্সট্রিম এ্যাট অল। দিস ইজ হোয়াট আওয়ার রুলিং ক্লাশ হ্যাজ ডিসাইডেট উইল বি নরমাল”। বুশনেলের এ বক্তব্য বাংলা করলে দাঁড়ায় “আমি চরম এক প্রতিবাদ জানাতে যাচ্ছি, আমার এই প্রতিবাদকে ফিলিস্তিনি জনগণের তাদের দখলদারদের হাতে প্রতিদিনের যে সহিংসতার অভিজ্ঞতা তার সাথে তুলনা করলে কিছুই না। আমাদের শাসকরা মানুষের এই চরম পরিণতিকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছেন”।
রুওয়াইদা আমির, ফিলিস্তিনি শিক্ষক মেয়েটির ভয় তাড়িত আকুতি আলজাজিরা’ থেকে অনুবাদ করে ৮ এপ্রিল ২০২৫ দৈনিক প্রথম আলো ছাপিয়েছে তাদের প্রথম পৃষ্ঠায়, রুওয়াইদা’র আকুতি সে কোন সংখ্যা হয়ে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চায় না। রুওয়াইদা’র আশঙ্কা আর আকুতি “মৃতদের অজ্ঞাত ব্যক্তি হিসাবে উল্লেখ করা বা গণকবরে শুইয়ে দিতে দেখার পর আমার মাথায় বিষয়টি গেঁথে আছে। এর মধ্যে কিছু অঙ্গ প্রত্যঙ্গও আছে, যা শনাক্ত করা যায়নি। এটা কি সম্ভব যে আমার কাফনের ওপর শুধু কালো/নীল ব্লাউজ পরা তরুণী লেখা থাকবে? আমি কি অজ্ঞাত হিসাবে মারা যাব? শুধুই একটি সংখ্যা হিসাবে?”। এই সব জীবন দানকারী মানুষদের কথা ইয়ামালের মাধ্যমে আবারো সামনে এল।
লামিন ইয়ামাল এর ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরার বিষয়টিকে ইসরাইলী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী যেমন ঘৃণা ছড়ানোর বলে অভিযোগ তুলেছেন, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবাপন্ন অনেকেই সমালোচনায় মুখর হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ, ইয়ামাল এর পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। পেড্রো সানচেজ তার এক্স হ্যান্ডেলে এক মন্তব্যে উল্লেখ করেন Who consider waving the flag of a state to be inciting hatred either lost their judgment or been blinded by their own ignominy অর্থাৎ যারা মনে করেন ইয়ামালের একটি স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে তাদের বিচার বুদ্ধি লোপ পেয়েছে অথবা তারা তাদের অর্জিত অসম্মান আর গভীর লজ্জায় নিমজ্জিত হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। তিনি আরো উল্লেখ করেন “Yamal expressing the solidarity with Palestinians felt by millions of Spaniards and that the act was another reason to be proud of him ” ইয়ামাল লক্ষ স্প্যানিয়দের প্যালেস্টাইনের প্রতি একতা আর অনুভূতিকে প্রকাশ করেছেন, যার কারণে তাকে নিয়ে আমি আরো বেশি গৌরব বোধ করি। বৃটিশ বিখ্যাত ফুটবল কোচ গার্ডিওলা প্রকাশ্যে ইয়ামালকে সমর্থন জানিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন।
লামিনের পরিচয় আর উত্থান। লামিন ইয়ামেলের দাদী ফাতেমা ১৯৯০ সালে মরোক্কোর এক দারিদ্রপীড়িত অঞ্চল থেকে অভাবের অভিঘাত থেকে নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি না পাসর্পোট না ভিসা কোন কিছু ছাড়াই স্পেনগামী বাসে উঠে বসেন। পিছনে পরিবার পরিজন আর ৩ (তিন) বছরের সন্তান মুনির নাসরাউই। দিনরাত ক্লান্তিহীন ফাতেমা কাজ করে যান সন্তানকে পরিবারকে কাছে নিয়ে যাওয়ার সংস্থান করতে। একসময় সন্তান মুনির নাসরাউইকে ফাতেমা স্পেন নিয়ে আসেন। মুনির নাসরাউই যৌবনে পা রাখতেই ইকোটরিয়াল গিনি’র আরেক অভিবাসী সেলা ইভানা’কে বিয়ে করেন। বিয়ের পরপর মুনির আর ইভানা প্রচণ্ড অর্থ কষ্টের মুখোমুখি হন। মুনির সংসার নির্বাহে হেন কাজ নেই যা করেননি। নিদারুন এই অর্থ কষ্টে দুজন দয়াশীল মানুষ ‘লামিন’ আর ‘ইয়ামাল’ মুনির-ইভানা’র সাহায্যে হাত বাড়ান। দিন যেতে ১৩ জুলাই ২০০৭ সালে মুনির আর ইভানার ঘরে সন্তানের জন্ম হয়। কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতি ঐ দুই দয়াবান ব্যক্তির নাম মিলিয়ে মুনির-ইভানা তাদের সন্তানের নাম রাখেন লামিন ইয়ামাল। এ দুটি আরবী শব্দ। আল আমিন হয়েছে লামিন অর্থ বিশ্বাসী আর ইয়ামাল সুন্দর কমনীয়। এভাবেই বিশ্ব ফুটবলের বিস্ময় লামিন ইয়ামালের জন্ম।
অবিশ্বাস্য অনেকটা অলৌকিকও বটে ২০০৭ সালে ইউনিসেফের এক চ্যারিটি ফটো শটে ২০ (বিশ) বছরের বিশ্ব ফুটবলের ম্যাজিক লিওনেল মেসি এক বাথ টাবে লামিন ইয়ামালকে গোসল করান। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে দুজন মুখোমুখি হন। হারার বেদনায় কান্নারত মেসি’কে বিজয়ী লামিন ইয়ামালকে দেখা যায় সান্ত্বনা দিতে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। তবে বিবেকের, মানবতার মাপকাঠিতেও লামিন ইয়ামাল সার্বিক অর্থে বিজয়ী। মেসিরা বিশ্বব্যাপী তুমুল খ্যাতিমান হয়েও মানুষের পক্ষে মানবতার পক্ষে একটি শব্দও কখনো উচ্চারণ করেননি। সেখানে লামিন ইয়ামাল ১৯ বছরের এক উঠতি তারকা ফুটবলার বিশ্বকে জানান দিয়ে নির্দ্বিধায় অসংকোচে নির্যাতিতের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে নির্বিঘ্নে তুলে ধরেছেন ফিলিস্তিনের পতাকা।
লামিন ইয়ামাল তুমি শুধু বিশ্ব ফুটবলের নয় মানবতার পক্ষেরও এক নন্দিত তারকা হয়ে থাকবে, তোমাকে অভিবাদন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












