আজ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ধরা হয়েছে–আসুন হেপাটাইটিস রুখে দিই। লিভারের যেকোনো ধরনের প্রদাহকে হেপাটাইটিস বলে। এই প্রদাহ যদি নির্দিষ্ট ভাইরাসজনিত কারণে হয় তবে তাকে বলা হয় ভাইরাল হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই–এই পাঁচটি ভাইরাসই মূলত ভাইরাল হেপাটাইটিসের জন্য দায়ী। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতি ১০ জন আক্রান্তের মধ্যে ৯ জনই জানে না, তাদের শরীরে এই ভাইরাস আছে। আশার কথা, এই দুই নীরব প্রাণঘাতী ভাইরাস প্রতিরোধযোগ্য।
আমাদের দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ এই দুই ভাইরাসে আক্রান্ত। এছাড়া প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। তাদের হেপাটাইটিস বি ও সি সম্বন্ধে ধারণা নেই বললেই চলে। তৃণমূলের বিশাল জনগোষ্ঠীকে রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার আওতার বাইরে রেখে কোনো রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সফল হবে না। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস বি ও সি চিকিৎসা শহরকেন্দ্রিক, বিশেষায়িত চিকিৎসা কয়েকটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ। অনেক সময় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের প্রায় ২৯ কোটিরও বেশি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় ১৩ লাখ মানুষ হেপাটাইটিসজনিত জটিলতায় মারা যান। বিশ্বে লিভার ক্যান্সারের প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি বা সি সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের দেশের শতকরা প্রায় ৫ ভাগ মানুষ হেপাটাইটিস–বি ভাইরাসের বাহক। এ দেশের প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ গর্ভবতী মায়েরা হেপাটাইটিস–বি ভাইরাসে আক্রান্ত। এই ভাইরাস তাদের নবজাতকের শরীরে সংক্রামিত হতে পারে। বাংলাদেশের শতকরা ১ ভাগ লোক হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বাহক। যাদের অধিকাংশই জানেন না তারা এই রোগে ভুগছেন। প্রশ্ন হলো–আপনিও কি হেপাটাইটিসে আক্রান্ত? এর উত্তর জানার একমাত্র উপায় হলো একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা।
তবে হেপাটাইটিস ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে কিছু নিয়ম কানুন মানতে হবে। বিশেষ করে নিরাপদ ইনজেকশন ও পরীক্ষিত রক্ত গ্রহণ করতে হবে। নিরাপদ যৌন আচরণ অনুসরণ করতে হবে। চিকিৎসা, দাঁতের চিকিৎসা, ট্যাটু বা নাক–কান ফোঁড়ানোর সময় জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করাতে হবে। হেপাটাইটিস বি–এর টিকা গ্রহণ করতে হবে এবং অ্যালকোহল ও মাদক পরিহার করতে হবে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও লিভার কেয়ার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ আজাদীকে বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধযোগ্য, নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য একটি রোগ। হেপাটাইটিস নির্মূলে ভয় নয়, সচেতনতা জরুরি। প্রয়োজন শুধু একটি সহজ রক্ত পরীক্ষা, সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনে যথাযথ চিকিৎসা। হেপাটাইটিস–বি ও সি ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিসে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তদান, অস্ত্রোপচারের পূর্ববর্তী পরীক্ষা বা বিদেশ গমনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় রোগটি প্রথম ধরা পড়ে।
তিনি আরো বলেন, কারো কারো ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো হলো–অবসাদ, ক্ষুধামন্দা, জ্বরজ্বর ভাব, শরীর শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। সঠিক ও সময়মত চিকিৎসা না করা হলে দীর্ঘদিন রোগভোগের কোনো এক পর্যায়ে হেপাটাইটিস–বি ও সি রোগীদের সিরোসিস, পেটে বা পায়ে পানি আসা, রক্তবমি এমনকি প্রাণঘাতী লিভার ক্যান্সারের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। হেপাটাইটিস–বি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের কারো কারো শরীরে এটি দীর্ঘদিন নীরব/নিষ্ক্রিয় থাকে এবং তাদের কোনো ওষুধের প্রয়োজন হয় না, তবে নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকতে হবে। যাদের শরীরে ভাইরাস সক্রিয় থাকে এবং লিভারের ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। হেপাটাইটিস সি বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ৮–১২ সপ্তাহের ওষুধ সেবনে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। হেপাটাইটিস বি ও সি রোগের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মানসম্মত সবগুলো ওষুধই এখন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।
এদিকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে লিভার কেয়ার সোসাইটির উদ্যোগে নগরীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিটিউটে আলোচনা সভা ও র্যালির আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এছাড়া বিশেষ থাকবেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন চমেক হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও লিভার কেয়ার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।











