দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান

রবিবার , ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
10

পাড়ার রেস্টুরেন্টের বিশ্বজয়

মেন্যুর দিকে ফের একটু মনোযোগ দিতেই বুঝলাম যে, যেহেতু অর্ডার দেয়ার সময় বলেছি প্যান কেকের ব্রেকফাস্ট মেন্যু দিতে, তাতেই ওতে কফির অর্ডার ঢুকে গেছে নিজেরই অজান্তে। শুধু প্যান কেক নিতে চাইলে বলতে হতো, প্যান কেক অনলি আর তাতে দামও কম পড়তো। যেহেতু তা বলিনি তাই এরা গোটা ব্র্যাকফার্স্ট প্যাকেজটিরই অর্ডার নিয়েছে, ফলে কফির দামও মিটিয়ে দিয়েছি নিজেরই অজান্তে। বুঝলাম এখন আর উপায় নাই, নিজের ভুলের মাশুল নিজেকেই দিতে হবে অখাদ্য এই কফি গিলে, টেবিলে খাবার নিয়ে ফিরতে ফিরতে এ ভাবতেই মনটা দমে গেল।
যা ভেবেছিলাম ঘটলও ঠিক তাই। টেবিলে ফিরে নিজের ট্রে নামাতে নামাতে দীপ্র বললো “মা আমি এই কফি খাবো না, তুমি খেয়ে নাও এটা”
একই সাথে হেলেনের সামনে ওর ট্রে টা রাখতেই, সে ও বলে উঠলো “দাদা আমিও কফি খাবো না, এটা তুই খেয়ে নে’
“আমাদের তো স্টার বাঙ কফি খাওয়ার কথা, তাই না? এখানে এটার অর্ডার করলে কেন? “ জিজ্ঞাসা লাজুর -আমারও তো ইচ্ছা ছিল স্টার বাঙের কফি খাওয়ার , যদিও জানি না এখনো ওটার আউটলেট আছে কি না এখানে। তবে খুঁজে দেখবো ভেবেছিলাম। আর এ কফির অর্ডার তো করিনি, আসলে এটা ব্রেকফাস্ট মেন্যুর অংশ হিসাবে দিয়ে দিয়েছে এরা; বললাম। অহেতুক জটিলতা এড়ানোর জন্য ইচ্ছা করেই বললাম না আর যে, অর্ডার দেয়ার সময় যদি বলতাম “ প্যান কেক ম্যাপল সিরাপ অনলি” তাহলে আর তারা কফির দাম ও নিতো না, কফিও দিতো না।
এসব কথাবার্তার ফাঁকে, ততক্ষণে টেবিলে খাওয়া দাওয়ার ঝড় উঠে গেছে। তবে ঝড়টা বেশী অভ্রর দিকটাতেই। হেলেন নিজে একটা প্যান কেক হাতে নিয়ে ট্রে টা লাজুর দিকে ঠেলে দিয়ে বললো “ভাবি তুমিও টেস্ট করে দেখো প্যান ক্যাক”
ততোক্ষণে ম্যাপেল সিরাপে প্যান কেকের এক প্রান্ত চুবিয়ে মুখে পুরে বলে উঠলো হেলেন, “আরে দূর কোথায় আমাদের চিতই পিঠা, আর কোথায় এই প্যান কেক”
এরকমটা আমিও ভেবেছিলাম মনে, প্রথম যেদিন চেখেছিলাম এই আম্রিকান চিতই। আসলে লাকড়ির চুলার গনগনে আগুনের উপর, গরম মাটির খোলায় পানিতে গোলানো দুধ সাদা ঘন চালের গুড়ার ঢেলে দিলে পর, পদার্থ বিদ্যার নিয়ম মেনে, উপরের দিকটায় অসংখ্য ফুটো তৈরি করে, নিজের ভেতরে পানি বাস্প করে উড়িয়ে দিয়ে, আর অন্যদিকটায় আগুনের তাপে মুড়মুড়ে শক্ত হওয়ার সাথে, পিঠা তৈরি করেন যিনি তার মমতার মিশেলে চিতই পিঠা নামের যে অমৃত তৈরি হয়; আমাদের গ্রামের রান্না ঘরের চুলায় চুলায় আর হাটে মাঠে ঘাটে, তা যে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত ম্যাকের আউটলেটের ঝটপটে স্মার্ট তরুণ তরুণীরা বানাতে পারে না, আমার সে ভাবনাটিকে পোক্ত করে , ততক্ষণে লাজুও করে দিয়েছে একই ঘোষণা।
এদিকে দীপ্রর এগিয়ে দেয়া কফির গ্লাসটি টেবিলে রেখে, চেয়ার ছেড়ে উঠে আশপাশে নজর ফেলতে লাগলাম আমি স্টার বাক্সের খোঁজে। নাহ দেখতে পেলাম না এদিক টায় স্টার বাঙের নাম নিশানা। বুঝলাম দিতে হবে চক্কর গোটা বহির্গমন লাউঞ্জেই। স্টার বাঙ না হলেও, ঐ জাতীয় স্পেশালাইজড কফি শপ, না থেকেই পারে না এখানে। লাজুকে যখন বলেছিই যে খাবো আমরা স্টার বাঙের কফি, তখন “স্টার বাঙ” না হোক “টি লিফ কফি বিন”এর আউটলেট পেলেও চলবে। অতএব পেছনে থাকা হালকা চেয়ার টিকে, পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে পেছনে সরিয়ে টেবিলের সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে পড়তে, লাজু আর হেলেনকে ফের আমাদের বোচকা বুচকি বোঝাই ট্রলির দিকে নজর রাখতে বলে , বাড়ালাম পা ম্যাক চত্বর থেকে বেরুবার জন্য।
“কোথায় যাচ্ছো আবার ?”
লাজুর কণ্ঠস্বর পিছু ডাকতেই, ঘাড় ফিরিয়ে বললাম স্টার বাঙের কফি কিনতে যাচ্ছি
“এগুলোর কি হবে তবে” জিজ্ঞাসা লাজুর -ওরা যদি খায় খাবে, না হয় থাকুক ওগুলো, এ জবাব দিতেই -না না আবারো কফি কিনে পয়সা নষ্ট করার কোনই মানে নাই। স্টার বাঙের কফির অনেক দাম। আর ম্যাকের কফিই কি কম দাম নাকি? ওসব আনার দরকার নাই-ম্যাকের কফির দাম স্টার বাঙের তুলনায় অর্ধেক হলেও স্বাদ এক্কেবারে যাচ্ছে তাই। এই ঠাণ্ডায় স্টার বাঙের এক কাপ এস্প্রেসো হলে চমৎকার হবে । বলেই ফের পা বাড়াতেই,
“তা হলে শুধু তোমার জন্যেই নিও। আমি এখানকার কফিই খাবো “ লাজু এ কথা বলতেই, দীপ্রও সাথে সাথে বললো, “ঠিক আছে বাবা আমি খেয়ে নেবো, এই কফিটা”
নাহ , পয়সা নষ্ট না করার মা পুত্রের এই যুগল প্রয়াস; উপেক্ষা করা তো ঠিক হবে না। বিশেষ করে দীপ্র অভ্র কে যখন প্রতিনিয়তই সবক দেয়ার চেষ্টা করি, খাবার দাবার নষ্ট না করার।এ গ্রহের অসংখ্য লোকের ক্ষুধার্ত লোকের দুর্ভাগ্যকে স্মরণ করিয়ে দেই যখন ওদের অহরহ, তখন এই মুহূর্তে এখানকার কফি না খেয়ে ফেলে দেবার উদাহরণটি অত্যন্ত একটি বাজে উদাহরণ হবে। বাচ্চার কথা থেকে যতো না শেখে, তার চেয়ে ঢের বেশী শেখে আমাদের তৈরি করা উদাহরণ থেকে ।
অতএব ফিরে এসে দীপ্রর পাশে বসে, নিজের দিকে টেনে নিলাম একটু আগে পিছু ফেলে যাওয়া কফিভর্তি কাগুজে ম্যাকগ্লাস।
কফির মগের উপর লাগানো ঢাকনাটি খুলে, ওতে প্রয়োজনীয় চিনি মিশিয়ে মনে হলো আরে , চিনি গুলানোর জন্য যে ডিসপোজেবল কাঠি আনার দরকার ছিল, কাউন্টারের পাশে রাখা সেলফ থেকে তা তো আনি নি। অতএব উঠে গেলাম সেদিকে
দুটো ডিসপোসেবল কাঠি নিয়ে ফিরে এসে, একটা লাজুর সামনে রেখে আরেকটা আমার কাপে ডুবিয়ে নাড়াতে নাড়াতে চেয়ারে বসতেই “বাবা তুমি একটা প্যান কেক নাও আমার এখান থেকে”, বলতে বলতে ট্রে টা ঠেলে দিল দীপ্র আমার দিকে।
না আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না এখন। শুধু কফিই খাবো এখন। তা তোমার কাছে কেমন লাগে প্যানক্যাক বাবা, জিজ্ঞেস করলাম -জোশ” বলেই ম্যাপল সিরাপে চুবানো প্যান কেকের অংশ টি মুখে পুরে দিলো দীপ্র।
ভাবলাম, এভাবেই ছোট ছোট নানান বিষয়ে যে আসলে তৈরি হয় জেনারেশন গ্যাপ; এটি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ! হেলেন, লাজু আর আমার কাছে যেখানে খেজুরের ঝোলা গুড়ের সুবাস আর স্বাদের ধারে কাছেও দাঁড়াতে পারে না, ম্যাপল সিরাপ; আর প্যান কেক তো পড়ে থাকে চিতই পিঠার পায়ের কাছে, সেখানে আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম একই টেবিলে বসে, প্যানক্যাক কে জোশ বলে খাচ্ছে তা মহা তৃপ্তিতে! তার মানে খাবার দাবার নিয়েও প্রজন্মে প্রজন্মে ঘটে চলেছে রুচিগত জেনারেশন গ্যাপ! আর ঘটছে তা একদিকে যেমন যোগাযোগের উন্নতির কারণে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে।
এক সময় তো এক এলাকার মানুষ অন্য এলাকার খাবারের খোঁজই জানতো না, আর জানলেও খেতে পারতো না। আর এখন তো এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তের হেঁশেল, বসছে গিয়ে অন্য প্রান্তে। ফল বদলে যাচ্ছে মানুষ খাদ্য সংস্কৃতি! অবশ্য এ ব্যাপারেও মনে হচ্ছে চায়নাই অগ্রগামি বেশী। গত দু তিন দশক ধরে আমেরিকান খাবার দেশে দেশে মাল্টিন্যাশানাল চেইন হয়ে ঢুকলেও, চায়নিজরা কিন্তু বহু আগে থেকেই পৃথিবীর নানান শহরে নিজেরাই সশরীরে গিয়ে স্থাপন করেছিল চায়নিজ হোটেল। অনেক আগেই ব্যাপারটা লক্ষ করেছি যে, আজ পর্যন্ত এমন একটি শহরও দেখিনি যেখানে কমপক্ষে একটি চায়নিজ হোটেল নাই। এমন কি সেই পঞ্চাশের দশকের ঢাকাতেও ছিল খোদ চায়নিজ পরিচালিত চায়নিজ হোটেল। আর এ দৌড়ে চায়নার ঠিক পেছনেই আছে দাঁড়িয়ে সম্ভবত ভারতীয় খাবার।
অথচ না চায়নিজরা না ভারতীয়রা, তৈরি করেছে তাদের রেস্টুরেন্টের কোন গ্লোবাল চেইন , যা করেছে অনেক পরে এসে আমেরিকানরা। ফলে বিশ্বব্যাপী নিজ খাদ্য সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে পারেনি তেমন তারা, পেরেছে যেমন আমেরিকানরা। আজ আমেরিকা গ্লোবাল ফুড চেইনগুলো, টাকার গন্ধ খুঁজে খুঁজে প্রতিদিনই পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর নানান কোণে কোণে। আর এজন্য চায়নিজ বা ভারতীয় মালিকদের মতো, বাবুর্চি নিয়ে নিজেদের গিয়ে হাজির হতে হচ্ছে না তাদের ভিন দেশে। টেকনোলজির সুবাদে পুজির ঘাড়ে ভর করে, তারা পাঠাচ্ছে তাদের হেঁসেল, আর রেসিপি শুধু দেশে দেশে। বাবুর্চি থেকে কর্মী সবই নিচ্ছে স্থানীয়দের মধ্য থেকেই। তারপর নিজ দেশেই বসে চমৎকার নিয়ে যাচ্ছে মুনাফা। অথচ এগুলোর প্রতিটিই একদিন শুরু হয়েছিল আমেরিকা কোন না কোন শহরে পাড়ার মোড়ের রেস্টুরেন্ট হিসাবেই। শুধু কি রেস্টুরেন্ট, তারা তো দেশে দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে তাদের পাড়ার এক সময়ের চায়ের দোকান ও, যার অন্যতম হলো এই যে একটু আগে খুঁজতে বেরুতে চেয়েছিলাম যা , সেই স্টার বাক্স! আগে সাম্রাজ্যবাদি শক্তি, সৈন্য পাঠিয়ে দখল করতো দেশ, আর আজকাল অর্থনীতির মারপ্যাঁচে কি চমৎকার পাড়ার দোকান পাঠিয়েও দখল করে নিচ্ছে আম্রিকা নানা দেশের খাদ্যের বাজার। আর এভাবেই কি একসময় তবে পৃথিবীর নানান দেশের খাদ্য সংষ্কৃতি, ওগুলোর নিজ নিজ বিশেষত্ব হারিয়ে, গড়ে উঠবে নতুন কোন গ্লোবাল খাদ্য সংস্কৃতি?
উহু এত্তো গরম! এক্কেবারে মুখ পুড়ে গেল! ইয়াক, চিনি দেয়নি না কি, একদম তিতা; এ বলে অনেকটা ককিয়ে উঠলো টেবিলের ওপাশে লাজু।
আসলে আগেই সতর্ক করা উচিৎ ছিল আমার লাজুকে। কারণএসব দোকানের এরকম ফুটো ওলা ঢাকনি লাগানো কাপ থেকে, ঢাকনি না খুলে ফুটো দিয়ে কফি টেনে খেতে গেলে এমন হয় আমারও। মানে ঢক করে বেশী কফি মুখে ঢুকে পড়ে এক্কেবারে জ্বালিয়ে দেয় মুখ। সাধারণত যতই গরম আর ঠাণ্ডা হোক, চা কফি তো আমরা মুখে নেই, খোলা মুখের কাপ থেকে, যা দেখে তাপমাত্রার উপর নির্ভর আমরা আন্দাজ করেই কতোটা নেবো মুখে। এরকম ঢাকনার ফুটোতে মুখ রেখে তো সেই আন্দাজ অন্য কেউ করতে পারলেও আমি পারি না, তাই মুখ পুড়ে না গেলেও বেশ কয়েকবারই লেগেছে গরম কফির ছ্যাকা, সেই থেকে ঐ ঢাকনা খুলেই কফিতে চুমুক দেই। লাজুর দেখছি সেই একই ঘটনা ঘটেছে, মানে আন্দাজ করতে পারেনি কতোটুকু গরম কফি ঢুকে পড়ছে মুখে, যার কারণে তার ইন্দ্রিয় প্রস্তুতও ছিল না, ঐ গরমের ছ্যাকাটির জন্য। যাক এখন মনের ভেতরে তৈরি হওয়া এই, বৈজ্ঞানিক হাইপোথেসিস ঝারতে গেলে, উল্টো খেতে পারি ঝাড়ি, তাই ঐদিকের পথ না মাড়ালাম না। লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

x