সমকালের দর্পণ

ইরান যুদ্ধ: বিশ্লেষক এবং পণ্ডিতজনদের মূল্যায়ন

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ

আমার এক বিদেশী বন্ধু যিনি তার দেশের বাংলাদেশস্থ দূতাবাসে কর্মরত। এই সূত্রে তিনি বাংলা বুঝেন এবং পড়তেও পারেন। আমার সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি আমার লেখা পড়েন জানিয়ে প্রশংসা সূচক কিছু স্ত্তুতিও করেন। কথায় কথায় ইরান নিয়ে বেশি লেখালেখির কথা তোলেন। এ প্রসঙ্গে আমি উনাকে যে উত্তর দিয়েছিলাম তা এখানে পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি।

প্রথমত ইরান যুদ্ধ, আমেরিকা ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে এক অন্যায় অমানবিক যুদ্ধ।

দ্বিতীয়ত এ যুদ্ধ কোন নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে হাজারো নিরপরাধ মানুষের মুত্যু ডেকে আনছে।

তৃতীয়ত এ যুদ্ধ প্রতিষ্ঠিত সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন কানুন, রীতিনীতির উলঙ্গ লংগন।

চতুর্থত এ যুদ্ধ প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন সমূহসহ জনমানুষের জীবন দুর্বিষহ করতে বেসামরিক স্থাপনা সমূহের উপর নির্বিচার বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর এক বিভীষিকা।

পঞ্চমত এ যুদ্ধ পৃথিবীর নিম্ন আয়ের দেশগুলির মানুষের জন্য এক অবর্ণনীয় দুর্দশা, ক্ষুধা, দারিদ্র বয়ে আনার শঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

ষষ্ঠত এ যুদ্ধ ইতিমধ্যে জ্বালানী তেলের বাজারে এক অস্বাভাবিকতা এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে পৃথিবীর দেশে দেশে কৃষি, শিল্প সহ যাবতীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে হুমকি এবং বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে।

সপ্তমত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে বাংলাদেশী লক্ষ লক্ষ ডাক্তার, প্রকৌশলী, শ্রমিক কর্মরত। এসব দেশগুলিতে রয়েছে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি। পরিস্থিতির কারণে এ সমস্ত ঘাঁটি ইরানের আক্রমণের লক্ষ্যবস্ত্তুতে পরিনত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে একদিকে এসব মানুষের জীবন যেমন বিপন্ন হওয়ার একটি বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে তেমনি একের পর এক কলকারখানা, পানিতেল শোধনাগার বন্ধ হওয়ার কারণে তাদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়েছে।

এখন প্রশ্ন আসছে কেন এই যুদ্ধ? মানুষের জন্য এ অমানবিক, এ দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী যুদ্ধের পিছনের কারণ তথা আমেরিকার ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে জড়ানোর কাহিনি ৮ এপ্রিল ২০২৬ নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার দুই প্রতিবেদক জোনাথান সোয়ান এবং ম্যাগি হাবাম্যান তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অত্যন্ত সংগোপনে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তার সাঙ্গপাঙ্গসহ হোয়াইট হাউজের সিসুয়েশান রুমে হাজিন হন। এখানে নেতানিয়াহু আমেরিকান নীতি নির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত গোপনীয় এক ভিডিও প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এই প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর বক্তব্য ছিল আমেরিকার ইরান আক্রমণের এখনই সুবর্ণ সময়। এই আক্রমণে চারটি স্তর এবং চারটি স্তরে চারটি লক্ষ্য অর্জনের চিত্র নেতানিয়াহু তুলে ধরেন।

প্রথম আক্রমণে ইরানের র্স্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনীসহ সম্মুখ সারির নেতাদের হত্যা।

দ্বিতীয় স্তরে ইরানের মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করা। যাতে ইরানী সামরিক বাহিনী তথা আই আর জি সি (ইরানী রেভ্যুলুশনারী গার্ড কমান্ড) তাদের প্রতি আক্রমণ ক্ষমতা হারাবে। তৃতীয় স্তরে কুর্দিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়াবে। চতুর্থ স্তরে সাধারণ প্রতিবাদী মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামবে। আর এভাবেই ইরানে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটবে। এ অবস্থায় ইসরাইলের একটি সুনির্দ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হবে। দুর্বল ইরান। তখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের জন্য কোন ধরনের হুমকি বা ইসরাইলী লক্ষ্য পূরণে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্ত্তু আমেরিকার কি লক্ষ্য অর্জিত হবে তা অনুল্লেখ্য থাকে।

নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রতিবেদকদ্বয়ের ভাষ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং উপস্থিত সবাই মোটামুটি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনায় সায় দেন শুধু ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ব্যতীত।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেতানিয়াহুর খপ্পরে পড়েন এবং ওয়াশিংটনের জোরালো ইহুদি লবীর প্রভাবে অবশেষে ইরান যুদ্ধে আমেরিকাকে জড়িয়ে ফেলেন। এ জড়ানোর পিছনে যত না আমেরিকার কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কাজ করেছে তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত শোম্যানশীপ অভিলাষ। ইতিপূর্বের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যাকান্ড এবং সাম্প্রতিকের ভেনেজুয়েলার আদিমতার আচরণে ঘেরা জঘন্য কর্মকাণ্ড প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হয়ত আরো বেপরোয়া হয়ে ইরান আক্রমণে উৎসাহ যুগিয়েছে।

সেই উৎসাহের আতিশয্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইসরাইলের নেতৃত্বে আমেরিকা ইরান আক্রমণ করে। যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকা ইসরাইলের বেপরোয়া আক্রমণে বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে পড়ে। বিশ্বকে আরো হতভম্ব এবং স্তব্ধ করে দিয়ে ইরান ইসরাইল আমেরিকার আক্রমণের প্রথম ধাক্কা সামলিয়ে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সামরিক স্থাপনা এবং সরাসরি ইসরাইলের উপর একের পর এক পাল্টা আঘাত হানা শুরু করে। এই সামরিক চমকের পাশাপাশি ইরান কার্যকরভাবে হুরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ঠুটি চেপে ধরে। বিশ্ব অর্থনীতি শ্বাস কষ্টে পড়ে হাঁসফাঁস করা শুরু করে। যুদ্ধ যতই গড়াতে থাকে আমেরিকা ততই বিপদ আঁচ করতে থাকে। ইপ্সিত কোন লক্ষ্যই আমেরিকা অর্জন করতে ব্যর্থ হয় একমাত্র ইরানী সামরিক বেসামরিক নেতাদের হত্যা করা ছাড়া। এটিও বুমেরাং হয় ইরানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরো কট্টরদের অধিষ্ঠানে।

এ প্রেক্ষাপটে আমেরিকায় পাকিস্তানের দুই দুই বারের রাষ্ট্রদূত স্বনামধন্য কূটনীতিক মালিহা লোধী তার “ব্লুমবার্গ উইক এন্ড” পডকাস্টে মিশাল হাসানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন “যুদ্ধ শুরু হলে ইরান যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে আর নেতাদের হত্যা করলে শাসনব্যবস্থার কোন পরিবর্তন বা ভেঙে পড়বে না এ বিষয়টি অনুধাবনে আমেরিকা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, আমেরিকা জাতীয়তাবাদের শক্তি অনুধাবনেও ঐতিহাসিকভাবে ব্যর্থ। ভিয়েৎনাম, আফগানিস্তান, ইরাক এবং শেষ পর্যন্ত ইরানেও একই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তারা এটা বুঝতে পারে না যে আমেরিকানরা যেমন নিজ দেশকে ভালোবাসে অন্য দেশের মানুষেরা তাদের দেশকে একইভাবে ভালোবাসে”।

এমন ত্রাহি অবস্থায় আমেরিকা মিত্রদের কাছে হাত পাতে। কেউ হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেনি, না ন্যাটো, না বৃটেন না ফ্রান্স না জার্মানী না ইটালী না কোরিয়া জাপান। ব্যর্থ বেপরোয়া বেসামাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৫ এপ্রিল ২০২৬ ঘোষণা করে বসেন Tuesday will be Power Plant Day, and Bridge Day, all wrapped up in one, in Iran. There will be nothing like it!!! Open the Fucin’ Strait, you crazy bastards, or you will be living in Hell. মঙ্গলবার তথা ৭ এপ্রিল ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সেতু সমূহ ধ্বংসের দিন, ঐ দিন সব কিছু ধ্বংস করে একাকার করে দেওয়া হবে। হরমুজ প্রণালী খুলে দাও অজাতরা না হলে, অন্যথায় তোমাদের বসবাস হবে দোজখে।

ট্রাম্পের এই হুমকিতে কাজ হয়নি। ইরানীরা হরমুজ প্রণালী খোলেনি। এদিকে উপায়ন্তর না পেয়ে আমেরিকা পাকিস্তানের দ্বারস্থ হয়। পাকিস্তানের উদ্যোগে মিশর, সৌদি আরব, তুরস্ক ইসলামাবাদে বৈঠকে বসে। এ বৈঠক থেকে কূটনীতির কিছুটা দ্বার খোলে।

১১ এপ্রিল ২০২৬ পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছার লক্ষ্যে বৈঠকে বসে। বৈঠকে আমেরিকার পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে সেদেশের পার্লামেন্টের স্পীকার নেতৃত্ব দেয়। দীর্ঘ একুশ ঘন্টা আলোচনার পরও কোন চুক্তি স্বাক্ষর ব্যতীত আলোচনা শেষ হয়। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধী’র আলোচনা সফল করতে করণীয় সম্পর্কে বলা আরো একটি বক্তব্য উল্লেখ করতে চাই You are to accommodate other’s concerned by not pussing your agendas only তোমাকে নিজের স্বার্থের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের স্বার্থকেও বিবেচনায় নিতে হবে শুধু নিজেরটা দেখলে আলোচনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হয়। আমেরিকা ইসলামাবাদে এরকম কোন বিষয় মাথায় না রেখে হয়ত কেবল ইসরাইলী এজেন্ডাই বাস্তবায়নে মনোযোগী ছিল। আমেরিকার এ মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকে এবার ইরান যুদ্ধকালীন তাদের মাঝে এমন ধারণার বিস্তার ঘটিয়েছে যে আমেরিকার কাছে ইসরাইলের নিরাপত্তা প্রথম এবং সর্বাগ্রে। এ মনোভাব যুদ্ধ পরর্বতী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকে নিশ্চিতভাবে ভাবাবে।

আমেরিকার জন্য আরো ভাবার বিষয়, সিকাগো বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপে তার এক সাক্ষৎকারে উল্লেখ করেছেন Iran war has given Iran a tremendous confidence. At the moment Iran is having amount of enrich uranium with which Iran can make upto 16 nuclear bomb. এই যুদ্ধ ইরানকে প্রচণ্ড আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে। ইরানের হাতে বর্তমানে যে পরিমান ইউরেনিয়াম রয়েছে তা দিয়ে অনায়াসে ১৬ টির মত পারমাণবিক বোমা তৈরী করতে পারবে।

এদিকে সংঘাত অবসানের আলামত না দেখে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। জ্বালানী তেলের দামে লাগাম টানতে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলতে মিত্রদের সাহায্য কামনা করে। এবারও ট্রাম্প ব্যর্থ। এর মাঝে যুদ্ধ নয় কূটনীতি এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলাতে পোপের উপর ট্রাম্প প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে তার প্রতি অশোভন শব্দ প্রয়োগ করে অপমান করেন। এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেকে যিশু চিত্রিত করে তার নিজস্ব পেইজবুক হ্যান্ডেলে পোস্ট দেন। এতে খ্রীস্টান সম্প্রদায় সমালোচনায় মেতে উঠলে ট্রাম্প তার ঐ পোস্ট মুছে দেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সংবাদ মাধ্যমে এসে বলেন “প্রেসিডেন্ট ওয়াজ মেকিং এ ফান”। এতে খ্রীস্টানরা আরো ক্ষেপে যান যিশুকে নিয়ে মজা! ইতালীর প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে ক্ষমা চাইতে বলেন। সব দেখে শুনে জোকটির কথা মনে পড়ল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নাকি ইরানী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মাথার দাম ১০ মিলিয়ন ডলার ঘোষণা করেছেন, জবাবে ইরানীরা বলছে আমরা ট্রাম্পের মাথার কোন মূল্য নির্ধারণ করব না কারণ ঐ মাথার কোন মূল্য নাই।

আমেরিকার হরমুজ প্রণালী অবরোধ এবং ইরানের এ প্রণালী খোলার অস্বীকৃতির মাঝে আবারও ইসলামাবাদে আমেরিকা ইরান দ্বিতীয় সমঝোতা প্রচেষ্টার বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। বিশ্ববাসীর নজর এখন সেদিকে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে