রিয়াদ এয়ারপোর্টে ফ্লাইটে বোর্ডিং করার ঘোষণা হতেই মনে হয়েছিল, আচ্ছা জেদ্দা নেমে ইহরাম পরে নিলেই হবে কী? সবাই না হলেও অনেককেই তো দেখছি ইহরাম পরেই যাচ্ছেন। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত পেতে ফোন করেছিলাম হাশিশকে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, মিক্কাত পয়েন্টটা কি জেদ্দা বিমানবন্দরের আগে না পরে? জেদ্দায় নেমে ইহরাম পরলে চলবে কী?
উত্তরে কপিপেস্ট প্রোডাক্ট ম্যানেজার হাশিশ নিজ স্বভাবমাফিক প্রশ্ন দুটোর সারসরি কোন উত্তর না দিয়ে বলেছিল
“আমি তো ঘর থেকেই পরে বেড়িয়েছি। তুমি না হয় রিয়াদ এয়ারপোর্টেই পরে নাও”
“কেন” প্রশ্নের ব্যাপারে তিলার্ধ সময় ব্যয় না করে, “কী” এর ব্যাখ্যায়, বর্ণনায় সর্বক্ষণ ব্যস্ত হাশিশকে বেহুদা ঘাটাইনি আর। বরং তাকেই কপি পেস্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। জগতের আর সব ব্যাপারেই ইনোভেশনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও, এ ব্যাপারে ট্র্যাডিশনকে মানাই নিরাপদ। সমস্যা হল সেই ট্র্যাডিশন নিয়েও আছে নানান বিরোধ, ফেরকা। সে যাক, হোক হাশিশ শাফেয়ি, হানাফি বা হাম্বলি। সুন্নি তো। অবশ্য তারচেয়েও তো বড় হল এ অধমের উদ্দেশ্য। ফলে, প্লেনে উঠার জন্য রওয়ানা দিয়ে ঢুকেছিলাম পথিমধ্যে এয়ারপোর্টের অজুখানায়।
শুধু আমিই না, দেখলাম আরো অনেকেই কাপড় বদলে ইহরাম পরছেন ওখানে। মোটামুটি দীর্ঘ অপেক্ষার লাইনে থাকতে হয়েছিল। ফলাফল? শেষ মুহুর্তে,মানে বেশ কয়েকবার অধমের নাম এয়ারপোর্টের মাইক্রোফোনে সুউচ্চ স্বরে রাষ্ট্র হবার পর, দৌড়ে, হাঁফাতে হাঁফাতে ফ্লাইটে উঠেছিলাম। মুখোমুখি হয়েছিলাম তখনই ঐ অগ্নিদৃষ্টির।
নাহ আমার পুণ্য ইচ্ছাটি মোটেও গুরুত্ব পায়নি নাস এয়ার লাইন্সের কেবিনক্রুদের কাছে। আবার সবার শেষে প্লেনে উঠে, পেছনের দিকে বরাদ্দ হওয়া নিজে সিটের দিকে যেতেও যেতেও মুখোমুখি হয়েছিলাম বেশ কিছু যাত্রীও অগ্নিদৃষ্টির, বিরক্তিদৃষ্টির। ইহরাম পরা থাকাতেই সম্ভবত তাই, ছাই ভস্ম হয়ে যাইনি।
এই প্রথম এলাম জেদ্দায়। রিয়াদ বিমানবন্দরের চেয়ে এই বিমানবন্দরটি আকারে কতো বড়, বা আদৌ বড় কি না বুঝতে পারছি না। তবে ব্যস্ততা যে এর ঢের ঢের বেশী, তা তো দেখতেই পাচ্ছি। নানান আকারের চলমান ভিড়ে লোকজনের অস্থির দৌড় ঝাঁপ, ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসা মাইকের ঘোষণা, সব মিলিয়ে হৈ হৈ রৈ রৈ অবস্থা। কেমন যেন একটু অগোছালোও মনে হচ্ছে সবকিছু।
এটা একটা কথা হল? জেদ্দা হল পবিত্র কাবা বা মক্কার প্রবেশদ্বার! প্রতি বছর সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান এ এয়ারপোর্ট দিয়েই আসা যাওয়া করে। সে হিসাবে এটি হওয়ার দরকার ছিল সৌদির না শুধু মধ্যপ্রাচ্যেরই বৃহত্তম বিমানবন্দর। আরে বাবা, এটি তো তোদের বিলিয়ন ডলার ব্যাবসার ব্যাপারও তো! দেখে শুনে যা ভেবেছিলাম, হয়েছিলও তাই। বিশৃঙ্খল ও ভজঘটের মধ্যে, ব্যাগেজ কনকোর্সে গিয়ে ব্যাগটি পেতেও লাগলো সময় বেশী। তবে সুখের বিষয়, এরাইভাল লাউঞ্জের গেইটে এসেই পেলাম মজুদ, জেদ্দার রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার শিহাব এলদিন আব্দেল রহমানকে।
“আসসালামু আলাইকুম ড. সেলিম। এভ্রিথিং ফাইন? হাউ আর ইউ বস?” বলতে বলতে শিহাব এরই মধ্যে যাবতীয় নিষেধ উপেক্ষা করে হাত থেকে দখল নিয়ে নিয়েছে ছোট্ট ট্রলি সুটকেসটির। সালামের উত্তর দিয়ে পার্কিং লটের দিকে তার পিছু পিছু এগুতে এগুতে পাল্টা বলি– হোপ এভ্রিথিং ফাইন উইথ ইউ। হাও আর ইউ। তা কতোক্ষণ হল অপেক্ষা করছো? খুবই দুঃখিত যে ব্যাগটা খুঁজে পেতে কিছুটা দেরী হল। আসলে ওটা সাথে রাখলেই হতো।
“না না, খুব দেরী হয়নি। আসলে এই রোজার সময়ে প্রচুর লোক ওমরাহ করতে আসে তো, তাই এরকম হয়।”
যাই হোক। সে রকম ব্যবস্থাও তো থাকা উচিৎ এখানে। “এই যে, এখানে। এটাই আমার গাড়ী।” বলতে বলতে একদম কাছেই পার্ক করা তার নিশান এক্স ট্রেইলের দরজা খুলে ধরলো শিহাব ধন্যবাদের সাথে উঠতে উঠতে বললাম, এতো ভজঘটের মধ্যে এতো কাছে গাড়ী পার্ক করার জায়গা বের করলে কিভাবে? “অভিজ্ঞতা। এ হল অভিজ্ঞতার ফল। আছি তো এখানে আট বছরের উপর হল। আচ্ছা সুটকেসটা এখন পেছনে রেখে আসি তো।”
“সর্বমোট কয় বছর হল সৌদিতে? তার মধ্যে জেদ্দায় কতো বছর?” সুটকেস রেখে ড্রাইভিং সিটে ফিরতেই জিজ্ঞেস করলাম– “ঐ আট বছরই জেদ্দায়। ছয় বছর তো রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে জেদ্দায় কাজ করলাম। তারপর দুই বছর আগে প্রমোশন পাওয়ার পর, মক্কা মদিনাও এখন আমার।” গাড়ী স্টার্ট দিতে দিতে এলো উত্তর– আচ্ছা, এখান থেকে মক্কায় যেতে লাগবে কতোক্ষণ? আমরা কি জেদ্দা পোর্ট হয়ে যাবো? “জ্যাম না থাকলে, খুব জোর দেড়ঘণ্টা লাগবে। তবে পোর্টে গেলে সময় বেশী লাগবে। ওখানে জ্যাম বেশী তো। জায়গায় জায়গায় চেকপয়েন্টও আছে? রিয়াদে প্রিন্স মোহাম্মেদ বিন নাইফের উপর বোমা হামলা হওয়াতে, সিকিউরিটি এখন বেশ কড়া। যাবো নাকি ঐদিকে?
না না মোটেও দরকার নাই, তাহলে। ভাবছিলাম পথেই যদি পড়ে, দেখে যাবো। দেড়হাজার বছর আগে হজরত ওসমানের আমলে চালু হওয়া ঐ বন্দরটাই তো, একসময়ের পৃথিবীর নানান জায়গার হাজীদের মক্কায় যাওয়ার একমাত্র না হলেও অন্যতম মুখ। আমার সেই দেড় কি দুই বছর বয়সে আমারই এক দাদা, এই বন্দরে নেমেছিলেন একদিন হজের উদ্দেশ্যে। তারপর বাকী যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা তো প্লেনেই এসেছিলেন। ভাবছিলাম সে কথাই আর কী?
“তাহলে পোর্টেই যাই। পোর্ট থেকে চলে যাবো আমাদের অফিসে। ওখানে ইফতার করে রওয়ানা করবো মক্কার উদ্দেশ্যে।” না, না তা মোটেও ঠিক হবে না। জেদ্দায় তো আসতেই হবে পরে যে কতবার আমার। সে সময় দেখে নেবো বন্দর। এখন চল সোজা মক্কা। আচ্ছা জেদ্দা থেকে কতজন ডাক্তার যাচ্ছেন মক্কার সাইন্টেফিক মিটিংয়ে। “নাহ কেউ তো যাচ্ছে না এখান থেকে। এটা তো রিয়াদ আর দাম্মামের ডাক্তারদের মিটিং জানি।” তার মানে কী? মক্কা বা মদিনারও কোন ডাক্তারও আসবেন না নাকি মিটিংয়ে? “না, মানে আমি তো জানি না। ডঃ হাসিশ তো কিছু বলেনি।”
অস্বস্তিতে পড়েছে শিহাব। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে জিজ্ঞেস করলাম তাই, তা এ পর্যন্ত তোমার ব্যবসার অবস্থা কী?
“আলহামদুলিল্লাহ।” টিমের সবাই কি টার্গেট করতে পারছে? “আলহামদুলিল্লাহ। না মানে, গুড। ওকে।”
বুঝেছি পড়েছি এবার মিশরী আলহামদুলিল্লাহর ফেরে; যার মানে কখন যে কী, বুঝে উঠতে পারিনি যা এখনো। এরইমধ্যে জেদ্দা শহর পিছনে ফেলে মক্কা হাইওয়েতে উঠে অনেকটাই এগিয়েছি।
উইন্ডশিল্ডের বাইরে বিশাল এক অজগরের মতো লম্বমান হয়ে আছে সামনে, চমৎকার মসৃণ হাইওয়ে। আচ্ছা এ পাশে ওপাশে ৩টা ৩টা নাকি ৪টা ৪টা আটটা লেন? শহরের এলাকা পেরিয়ে আসায়, কোন কিছুতেই চোখ আটকাচ্ছে না। যাচ্ছে চলে দৃষ্টি তাই সোজা দিগন্তে। গিয়ে, ঐ দূরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ছাই আর কালচে রঙের পাথুরে পাহাড়গুলোতে খাচ্ছে ধাক্কা। বিকেল হলেও রোদের তেজ কমেনি তেমন। চকচকে রোদের বিভ্রমে ক্ষণে ক্ষণেই মনে হচ্ছে, কাঁধে কাঁধে রেখে সটান দাঁড়িয়ে ওখানে, আরব্য উপন্যাসের বিশালদেহী কাফ্রি পাহারাদারেরা। কঠোর নজর তাদের, পবিত্রতম নগরীর পবিত্রতা রক্ষার ওপর। এদিককার মরুভূমি দেখছি রিয়াদ বা দাম্মামের তুলনায় অনেক বেশী কঠিন আর রুক্ষ। বাদামি বা লালচে বালির বদলে, খোলা প্রান্তরে ছাই আর কালচে রঙ্গয়ের নানান আকারের পাথরেরই ছড়াছড়ি। বাহ! এরকম খটখটে জায়গারও যে সৌন্দর্য থাকতে পারে, ভাবিনি তো তা আগে! আচ্ছা, মক্কার ব্যাপারে একটু বলো তো? একটু আগের আলোচনার জেরে অস্বস্তিতে পরে চুপ হয়ে যাওয়া শিহাবের মুখ ফোটানোর চেষ্টা করলাম। “গুড মার্কেট। কিন্তু এখন যে কাজ করছে তাকে মনে হয় বদলাতেই হবে।” শোন, শোন ওসব না। মক্কা বিষয়ে তোমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইছি। মানে এই যেমন ধরো ওখানকার লোকজন কেমন? পবিত্র নগরী তো। ওখানে কী করা যাবে; কী করা যাবে না। এইসব আর কী?
“এই হাইওয়েতেই আছে বাহ–ওওয়াবাত মেক্কাহ বা কোরান গেইট। ওখান থেকেই হারাম পয়েন্ট শুরু। কোন কাফেরের ঐ গেইট পেরিয়ে যাওয়া নিষেধ।” হারাম পয়েন্ট মানে কী? অমুসলিমদের ঐ পয়েন্টের ওপাশে যাওয়া নিষেধ বলেই কি হারাম পয়েন্ট ওটা? “তা তো অবশ্যই। তবে আমাদেরও কিছু নিয়ম মানতে হবে। যেমন ঐ পয়েন্টের ভেতরে কোন জীবজন্তু মারা যাবে না। গাছ পালা নষ্ট করা বা কাঁটা যাবে না। কোনরকম ঝগড়া ফ্যাসাদ করা যাবে না।”
কোন ধরনের জীবজন্তু মারা যাবে না শুনে মনে হল, তাহলে মক্কার লোকরা কি সব নিরামিষাশী নাকি? সেটাই বা হয় কী ভাবে? কোরবানির সময় কোরবানি কী তাহলে মক্কার বাইরে গিয়েই দিতে হয় নাকি? মনে ঐ প্রশ্নগুলো খলবল করলেও, জিজ্ঞেস করতে গিয়েও, কড়া ব্রেক কষলাম। মনে পড়েছে আল গা’রের কথা। সৌদিতে থাকা অনেক মিশরি হল ইসলামী ব্রাদারহুডের কর্মী। তার ভাষায় নিজ গ্রুপের বাইরের এমনকি মুসলমানদের জন্যও এরা হল কিলারহুড। আছে যারা আমাদের কোম্পানিতেও। কে জানে শিহাব তাদেরই একজন কী না? ভাবতে ভাবতে তার শেষ কথার রেশ টেনে বলি–
তার মানে তো মক্কাবাসিরা খুবই মধুর স্বভাবের। ঝগড়াঝাটিতে নাই একদম।
“একদম ঠিক না ওটা? আটবছর আগে প্রথম যখন জেদ্দায় এসে কাজ শুরু করি, তখন এক শুক্রবারে গিয়েছিলাম গাড়ী চালিয়ে, মক্কায় ওমরাহ করতে। ওমরাহ শেষে, মক্কা শহরের নানান গলিতে পথ হারিয়ে বুঝতে পারছিলাম না কোন দিক দিয়ে বেরুলে পাবো এই হাইওয়ে। বাধ্য হয়েই নিয়েছিলাম শরণ মক্কার এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের। কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে আমার দিকে তাকিয়ে, হে হে করে হাসতে হাসতে বলেছিল -“ফেলো তো বিশ রিয়াল আগে চান্দু।” তাই নাকি? বল কী? দিয়েছিলে নাকি বিশ? “না বিশ দেই নি। পাঁচ সাধতেই খেকিয়ে উঠেছিল। পরে দশে রফা হয়েছিল। এবার শোন একই বিষয়ে মদিনার অভিজ্ঞতা। মদিনার ট্যাক্সি ড্রাইভার কিন্তু আমাকে হাসিমুখে প্রথমে বুঝিয়ে বলেছে। তারপর যখন দেখলো তার পরিচিত এক ট্যাক্সি ড্রাইভার যাচ্ছে ঐদিকে, তাকে থামিয়ে বলেছে আমাকে যেন নিয়ে যায় পথ দেখিয়ে– আহ ডক্টর ঐ যে দেখো? এক্সিডেন্ট হয়েছে মনে হচ্ছে। থামতেই হবে এখন। পুলিশ না আসা পর্যন্ত রাস্তা ক্লিয়ার হবে না।”
উইন্ডশিল্ডের ওপাশে চোখ সোজা যেতেই দেখি, রাস্তাজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিশ্চল গাড়ীসমূহ। কে জানে এই রোজায় পুলিশ সাহেব আসেন কখন? ছিল আশা মনে কাবা প্রাঙ্গণে করবো ইফতার আজ। জানি না আছে কি না তা কপালে অবশেষে।
লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক।













