ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিরা-একে খান সংযোগস্থল : জনভোগান্তির অন্তহীন বৃত্ত

আলমগীর মোহাম্মদ | রবিবার , ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়ক বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এই মহাসড়কটি কেবল রাজধানী ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে যুক্ত করেনি, এটি দেশের আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের প্রধানতম ধমনী। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন কোটি মানুষ, পরিবাহিত হয় দেশের সিংহভাগ পণ্য। কিন্তু এই অমিত সম্ভাবনাময় সড়কের একটি নির্দিষ্ট অংশ গত কয়েক বছর ধরে যাত্রী ও চালকদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। ঢাকা, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বা পদুয়ার বাজার থেকে যাত্রা শুরু করে মহাসড়কের অধিকাংশ পথ বেশ অনায়াসেই পাড়ি দেওয়া যায়, কিন্তু সীতাকুণ্ডের কুমিরা থেকে চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার একে খান মোড় পর্যন্ত পৌঁছাতেই শুরু হয় এক দুুঃসহ নরকযন্ত্রণা। এই কয়েক কিলোমিটার পথ যেন সময়ের অপচয়ের এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ, যেখানে আটকা পড়ে মানুষের শ্রমঘণ্টা, জ্বালানি এবং মানসিক প্রশান্তি।

কুমিরা থেকে একে খান পর্যন্ত এলাকার ট্রাফিক জ্যামের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনা এবং অরাজকতারই এক অবধারিত ফল। এই দীর্ঘ যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মহাসড়কের দুই পাশ দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা। নিয়মানুযায়ী মহাসড়কের নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা থাকার কথা নয়, অথচ বাস্তবে কুমিরা থেকে একে খান পর্যন্ত সড়কের দুই ধার আজ নানা ধরনের দোকানপাট, চাঘর এবং ভাসমান বাজারের দখলে। এই দখলদারিত্বের ফলে প্রশস্ত সড়কও সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ভাঙারির দোকান এবং ছোটখাটো গ্যারেজগুলো মহাসড়কের অনেকটা অংশজুড়ে তাদের মালামাল ফেলে রাখে। এই সরু পথে যখন শত শত যানবাহন একসাথে চলতে চায়, তখন যানজট অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

সমস্যার তীব্রতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এই অঞ্চলে অবস্থিত দেশের বেশ কিছু বড় শিল্পগ্রুপের কর্মকাণ্ড। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য হলেও, তাদের কার্যক্রমের ধরন মহাসড়কের শৃঙ্খলা বিঘ্‌িনত করছে। কুমিরা সংলগ্ন এলাকায় অসংখ্য বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব কারখানার নিজস্ব পার্কিং লট বা মালামাল লোডআনলোডের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে তাদের বিশালাকার ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং দীর্ঘ লরিগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাসড়কের ওপরই পার্কিং করে রাখা হয়। যখন এসব ভারী যানবাহন মুভমেন্ট শুরু করে, তখন তাদের মন্থর গতির কারণে পেছনের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ব্যক্তিগত গাড়ি বা যাত্রীবাহী বাসগুলো তখন আটকা পড়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকারকে এখানে চরমভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

একজন নিয়মিত যাত্রীর অভিজ্ঞতায় এটি কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং এক মানসিক নিগ্রহের নাম। যারা কর্মস্থলের তাগিদে প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করেন, তাদের জীবনের একটি বড় অংশ কেড়ে নিচ্ছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যাম। সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় বা সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পথে যখন একজন মানুষ দুইতিন ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকেন, তখন তার সৃজনশীলতা এবং কর্মস্পৃহা উভয়ই হ্রাস পায়। কুমিল্লার মতো একটি দূরত্ব থেকে যারা চট্টগ্রামে অফিস করতে আসেন, কুমিরা পার হওয়ার পর তাদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা পুরো দিনের কর্মশক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। এটি কেবল একক ব্যক্তির ক্ষতি নয়, সামগ্রিকভাবে জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বব্যাপী যখন প্রচারণা চলছে, তখন বাংলাদেশের প্রধান মহাসড়কে হাজার হাজার গাড়ি ইঞ্জিন চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকা মানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি অপচয় এবং বায়ুদূষণ বৃদ্ধি করা।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দায় মূলত সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এই এলাকাটিকে একটি ‘বিশেষ ট্রাফিক জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি। প্রথমত, রাস্তার দুই পাশে গড়ে ওঠা সমস্ত অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট এবং ভাঙারির ব্যবসা উচ্ছেদে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। মহাসড়ক কেবল যানবাহনের নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের জন্য সংরক্ষিত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, মহাসড়ক সংলগ্ন শিল্পগ্রুপগুলোকে আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি কারখানার নিজস্ব গণ্ডির ভেতরে ট্রাক ও লরি পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত স্লট নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যারা মহাসড়ককে পার্কিং হিসেবে ব্যবহার করবে, তাদের কঠোর জরিমানা এবং লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মহাসড়কের ওপর মালামাল ওঠানোনামানোর কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না। ​এছাড়া কুমিরা থেকে একে খান পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যেখানে শিল্পকারখানার যানবাহনগুলো রাস্তা দখল করছে, সেখানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কেবল একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি জনস্বার্থের একটি মৌলিক দাবি। দেশের সাধারণ মানুষ যারা প্রতিনিয়ত কর প্রদান করছেন, তারা একটি স্বস্তিদায়ক এবং নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার অধিকার রাখেন। একজন মানুষের সময় তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, আর সেই সম্পদ যদি অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন রাস্তায় ধুলো হয়ে যায়, তবে তা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। কুমিরা থেকে একে খান মোড় পর্যন্ত যাতায়াতকে সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে পারলে কেবল মানুষের এনার্জি ও সময়ই বাঁচবে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সরকার যদি আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে মহাসড়কের এই বিশৃঙ্খলা দূর করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জনভোগান্তির এই ফাঁদ ছিঁড়ে ফেলার এখনই সময়। দিনের শেষে মানুষ চায় একটু স্বস্তি, একটু সময়মতো ঘরে ফেরা। আর সেই স্বস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কুমিরা থেকে একে খান পর্যন্ত এই নরকযন্ত্রণা বন্ধ হলে কোটি মানুষের জীবনে ফিরে আসবে কাঙ্ক্ষিত গতি ও প্রশান্তি।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের আবেদন
পরবর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে