সাইকেলের দেশ হল্যান্ড। উত্তর সাগর পাড়ে সমুদ্রপৃষ্ট সীমার নিচে অবস্থিত এই দেশটিকে বলা হয় সাইকেলের ‘স্বর্গরাজ্য’। এদেশে জন্মের পর শিশু হাঁটতে শেখার সাথে সাথেই ওদের ধরিয়ে দেয়া হয় ছোট্ট সাইকেল। প্রথমে তিন চাকার, তারপর একটু বড় হলে (৪/৫ বছর) দু–চাকার । সকালে স্কুলে যাচ্ছে, দুপুরে বাসায় ফিরছে, সাথে মা কিংবা বাবা। তারা সবাই চলেছে সাইকেলে। কী শীত, কী বর্ষা– বছরের গোটা সময় ধরে এই দৃশ্য চোখে পড়ে সর্বত্র। এমন কী যখন প্রচণ্ড বরফে রাস্তা ঢাকা পড়ে তখনও। পাঁচ বছরের শিশুটি যেমন সাইকেল চেপে ঘরের বাইরে বেরোয়, ঠিক তেমনি ৭৫/৮০ বছর বয়সীদেরও হরহামেশা দেখা যায় সাইকেলে চেপে, হয় কাজে, কিংবা ঘুরে বেড়াতে, শরীরকে চাঙ্গা রাখতে। এমন সাইকেল–পাগল জাতি বিশ্বে খুব কম আছে। সামার বা উইন্টার ভ্যাকেশনে ভিন্ন শহরে বা অন্য দেশে গাড়িপথে বেড়াতে গেলে এদের অনেককে দেখা যায় ক্যারাভান বা গাড়ির ছাদে একটি নয় কয়েকটি সাইকেল বেঁধে নিতে। এদেশে ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি ঘরে যেমন রয়েছে এক বা একাধিক গাড়ি, ঠিক তেমনি রয়েছে বাড়ির প্রতিটি সদস্যের একটি কিংবা দু–তিনটি সাইকেল। এ কেবল ডাচদের বেলায় নয়, আমাদের মত প্রতিটি বিদেশীরও একই দশা। আমাদের কথাই যদি ধরি, বাড়ির পেছনে বাগান–লাগোয়া যে স্টোর, তাতে আছে চারটে সাইকেল– আমাদের দুজনের (স্ত্রী) দুটি, বাকি দুটি ছেলে ও মেয়ের। ওরা কেউ এখন আর আমাদের সাথে থাকে না। বড় হয়েছে, থাকে ভিন্ন শহরে। মাঝে মধ্যে এলে চালায়।
‘কালচারাল শক’ বলে একটা বিষয় আছে। পরিচিত পরিবেশ, অভ্যেস, রীতিনীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশে এসে যা কিছু দেখে তাই নতুন ঠেকে। নতুন পরিবেশ, চারপাশের সাথে খাপ খাওয়াতে, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে, অর্থাৎ ধাতস্ত হতে কিছুটা সময় লাগে– বুঝি এটিই কালচারাল শক। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে যখন এদেশে এসেছিলাম, তখন আমারও তাই হয়েছিল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, চারিদিক সবকিছু এতো সুন্দর, ছবির মত দেশ, যা দেখি তাই ভালো লাগে, অনেকটা কবির কথায় – ‘ফুলের বনে যারেই দেখি তারে লাগে ভালো’। সেই সময়টায় অন্যের কাছে বিষয়টা স্বাভাবিক হলেও আমার কাছে শুরুতে এতো এতো সাইকেল ছিল চমক লাগার মতো ব্যাপার–স্যাপার। চারিদিকে সাইকেলের মেলা। আমাদের দেশে আজ থেকে ৩৫ বছর আগে রাস্তাঘাটে, এমন কী অলি–গলিতেও খুব একটা সাইকেল দেখা যেতো না। সাইকেল চালাবে নিম্ন মধ্যবর্তী বা গরিব শ্রেণির লোকজন –এমন ধারণাই সেই সময় আমাদের মাথায় ছিল। স্যুট কিংবা ভালো পোশাক পরে কাউকে সাইকেল চালিয়ে যাবার দৃশ্য ছিল অকল্পনীয়। ১৯৯০ সালে হল্যান্ড এসে মাস কয়েকের মাথায় পেশাগত কাজে ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সরকারি উচ্চ পর্যায়ের এক মহিলা কর্মকর্তার সাথে আলাপ হয়, পরিবেশ ও বাংলাদেশ নিয়ে আসন্ন সম্মেলনকে নিয়ে। মাঝবয়েসী ওই মহিলাকে একদিন বাসায় ডিনারের নিমন্ত্রণ করলাম। সন্ধ্যের দিকে তিনি এলেন, একা, সাইকেলে চেপে। আমার কাছে দৃশ্যটা অস্বাভাবিক ঠেকলো। স্বাভাবিক কারণে বাংলাদেশ থেকে সদ্য আসা আমি ধরেই নিয়েছিলাম এই সরকারি আমলা গাড়ি করে আসবেন। উচ্চ পর্যায়ের এই সরকারি কর্মকর্তা তিনি কিনা এলেন সাইকেল চেপে। আমার সে সময়কার ‘মাইন্ড–সেট’ যে কত পিছিয়ে ছিল সে টের পেতে খুব একটা দেরি হলো না। দেখলাম, চারিদিকে সাইকেল। দেশজুড়ে সাইকেলের জন্যে পৃথক সড়ক। ছেলে–বুড়ো, সকল বয়েসী লোকজন সমানে সাইকেল চালাচ্ছে। এমন কী খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রীও। এই দৃশ্য দেখে আমার যে–ভিমড়ি খাওয়ার দশা, বুঝি এটাকেই বলে, ‘কালচারাল শক’। যাই হোক–
হল্যান্ডে সাইকেলের জন্য রয়েছে পৃথক ও ডেডিকেটেড সড়ক, প্রতিটি শহরে, অলি–গলিতে। এমনটি ইউরোপের আর কোন দেশে দেখা মেলে না। তাই বলে এদেশে সাইকেল–দুর্ঘটনা ঘটে না বা খুব কম এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। হর–হামেশা ঘটছে দুর্ঘটনা। আঁতকে উঠার মত ব্যাপার নয় কি যদি শোনেন যে ২০২৫ সালে গোটা দেশে মোট সড়ক–দুর্ঘটনার এক–তৃতীয়াংশের বেশি ছিল সাইকেল–সম্পর্কিত। গত বছর সাইকেল চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যাবার সংখ্যা ছিল ২৮১, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫ বেশি। গোটা দেশে সাইকেল সহ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান মোট ৭৫৯ জন। এই সংখ্যা তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় ৮৪ জন বেশি। ‘ভেইল্যাগহাইড নেদারল্যান্ডস’ (নিরাপত্তা নেদারল্যান্ডস) নামক এক সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, হল্যান্ডে সাইকেল চালকদের গত বছর তার আগের দুই বছরের তুলনায় অধিকবার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাইকেল দুর্ঘটনায় ৮১,০০০ আরোহীকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ হাজার সাইকেল দুর্ঘটনার শিকার আরোহীরা মৃদু বা গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত পেয়েছিলেন। মারাত্মক সাইকেল দুর্ঘটনার ৬৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল মাথার আঘাত। ২০২৫ সালে সাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষদের মধ্যে, যেখানে মৃতের সংখ্যা ৪০ জন থেকে বেড়ে ১১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। আতংকিত হবার মত ব্যাপার–স্যাপার।
উক্ত সংস্থার (ভেইল্যাগহাইড নেদারল্যান্ডস) পরিচালক মাইনচা বাকাররের মতে, হেলমেট না পরার কারণে মৃত্যুসংখ্যা বেশি। তার যুক্তি, ভাঙা হাড় একটা সময় ঠিক হয়ে গেলেও মস্তিষ্কের আঘাতের পরিণতি প্রায়শ দীর্ঘস্থায়ী হয়, এমন কী মৃত্যুও ঘটে। সংস্থাটি জানায় যে, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে হেলমেট পড়লে মারাত্মক মাথার আঘাতের ঝুঁকি ৭১% শতাংশ এবং গুরুতর মাথার আঘাতের ঝুঁকি ৬০% শতাংশ পর্যন্ত কমানো যায়। আর এই কারণে সংস্থাটি সাইকেল হেলমেটের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে বেশ কিছুদিন আগে এক প্রচারাভিযান শুরু করেছে। পরিস্থিতি এতই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকার আরোহীদের সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট পড়াকে উৎসাহী করে তোলার লক্ষ্যে, ‘জেড হেম অপ’ (তবঃ ’স ঙঢ়) নামে দেশব্যাপী এক ‘ক্যাম্পাইন’ শুরু করেছে। ডাচ শব্দ ‘জেড হেম অপ’–এর অর্থ হলো ‘মাথার উপর রাখো’। কিন্তু কে শোনে কার কথা– পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়নি। তরুণ আরোহীদের মধ্যে তো নয়ই, এমন কী ষাটোর্দ্ব আরোহীদেরও মাথায়ও হেলমেট খুব কম দেখা যায়। এক তথ্যসূত্রে জানা যায়, কেবল শতকরা ৫% আরোহী সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট পরিধান করেন। দেখা যায়, সাইকেল চালানোর কারণে হওয়া প্রায় ৮১,০০০ গুরুতর আঘাতের মধ্যে ১৪,০০০–এরও বেশি ছিল মাথায় আঘাত। ‘ভেইল্যাগহাইড নেদারল্যান্ডস’ (নিরাপত্তা নেদারল্যান্ডস) – এর মতে ‘সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট পড়লে সংঘর্ষ বা পড়ে–যাওয়ার কারণে মাথায় মারাত্মক আঘাতের ঝুঁকি ৭১% শতাংশ এবং গুরুতর মাথায় আঘাতের ঝুঁকি ৬০% শতাংশ কমে যায়।‘ জানা যায়, ৭৫ বছরের বেশি বয়সী সাইকেল আরোহীদের মাত্র ২৫% শতাংশ বর্তমানে হেলমেট পড়েন। অন্যদিকে, বাকি সাইকেল আরোহীর মধ্যে মাত্র ৫% হেলমেট পরিধান করেন। দুর্ঘটনা বৃদ্ধির জন্য অন্য সাইকেল আরোহী বা চালকদের দোষারোপ করা সহজ হলেও, মাত্র এক–চতুর্থাংশ ঘটনায় সংঘর্ষ ঘটেছিল। দুই–তৃতীয়াংশ সাইকেল দুর্ঘটনায় কেবল একজন পথচারীই জড়িত ছিলেন, যেমন ‘পড়ে যাওয়ার’ কারণে। হল্যান্ড সাইকেল–প্রেমী দেশ হিসাবে বিশ্বে পরিচিত। মজার ব্যাপার হলো তা সত্ত্বেও সাইকেল চালানোর এই স্বর্গরাজ্যের বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হলো ‘সাইকেল–চুরি’। সরকারের দেয়া এক তথ্য অনুযায়ী, হল্যান্ডে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখেরও বেশি সাইকেল চুরি হয়। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চাইতেও অনেক বেশি বলে অনুমান করা হয়, যা কিনা ১০ লাখের কাছাকাছি। কেননা সাইকেল চুরি ঘটলে খুব কম লোকই পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন। এই নিয়ে পরবর্তী সংখ্যায় আরো লেখার ইচ্ছে রইলো। (চলবে) – ০১–০৬–২০২৭
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।












