খাল বাঁচলে দেশ বাঁচবে

ড. আবদুল্লাহ আল মামুন | শনিবার , ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ একদিকে যেমন নদীমাতৃক দেশ, অন্যদিকে তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটির একটি। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং এগুলো একই সংকটের বিভিন্ন প্রকাশ। এই বাস্তবতায় সরকার কর্তৃক দেশব্যাপী ৫৪টি জেলায় প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যকে সামনে রেখে নেওয়া এই কর্মসূচি, পরিবেশ ও উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের পরিকল্পনা যুক্ত হওয়ায় উদ্যোগটি আরও বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে।

তবে কাগজে কলমে কর্মসূচি ঘোষণার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এর বাস্তবায়ন। খাল খনন শুধু মাটি কাটার কাজ নয়; এটি ভূপ্রকৃতি, নদীখাল সংযোগ, পানি ব্যবস্থাপনা, সামাজিক ব্যবহার ও কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। তাই এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে নীতি, বিজ্ঞান ও কূটনীতির সমন্বিত প্রয়োগের ওপর।

খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশে নতুন নয়। ১৯৭৬ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের বেতনা নদী খননের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা ছিল স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বনির্ভরতার পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দেখিয়ে দিয়েছিল, সেচের পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন কতটা ভঙ্গুর। সেই সময় জনশক্তিনির্ভর খাল খনন কর্মসূচির আওতায় আনুমানিক ৩ হাজার কিলোমিটার নতুন খাল খনন ও প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন হয়। “কাজের বিনিময়ে খাদ্য” কর্মসূচির মাধ্যমে একদিকে বেকারত্ব কমেছে, অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য ও নৌযোগাযোগে নতুন গতি এসেছে।

আজকের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। তখন জনসংখ্যা কম ছিল, নগরায়ণ সীমিত ছিল, শিল্পদূষণের চাপও তুলনামূলকভাবে কম। এখন খালনদী দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্যের কারণে অধিকাংশ প্রাকৃতিক খাল কার্যত মৃত বা অস্তিত্বহীন। তাই বর্তমান কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে অধিকতর প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কঠোর শাসনব্যবস্থা।

খালনদীবিল এই তিনটি উপাদান সমুদ্রে পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ। কোথাও এই পথ রুদ্ধ হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক খাল দখল হয়ে ছোট ছোট ড্রেনে পরিণত হয়েছে, আবার অনেক জায়গায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। এর ফলে অল্প বৃষ্টি বা জোয়ারের পানিতেই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের উদাহরণটি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসার মাস্টার প্ল্যানে ৬১টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু সামপ্রতিক স্যাটেলাইট ডাটা, ক্যাডাস্ট্রাল ও ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আরও ৬৯ টি খালের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছে। মোট খালের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩০টি, দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। খালের সংখ্যা ও গভীরতা কমে যাওয়ার কারণে যেখানে আগে দুইতিন ঘণ্টায় জোয়ারের পানি বের হয়ে যেত, এখন সেখানে ছয়সাত ঘণ্টা সময় লাগছে।

একই চিত্র ঢাকাতেও। বৃহত্তর ঢাকায় বর্তমানে ১৮টি নদী থাকলেও অধিকাংশই জৈবিকভাবে মৃত। মাছ, উভচর প্রাণী, জলজ উদ্ভিদ, সবই প্রায় হারিয়ে গেছে। শিল্পকারখানা, বিশেষ করে গার্মেন্টস ও ডাইং ইউনিটের অপরিশোধিত বর্জ্য নদীকে ‘দ্রবণীয় আবর্জনার ভাগাড়ে’ পরিণত করেছে। ভয়াবহ বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে এই দূষিত পানি ভূগর্ভে ইনজেক্ট করে দেওয়া হচ্ছে, যা শত শত বছর ধরে ভূগর্ভস্থ পানিকে বিষাক্ত করে রাখতে পারে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি।

গ্রামে খালই মূল ড্রেনেজ ব্যবস্থা। খালের মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে সেচের পানি আসে, বর্ষায় অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যায়। খাল বন্ধ মানেই কৃষির বিপর্যয়, চাষাবাদ অসম্ভব হয়ে ওঠা, ফসল নষ্ট হওয়া, বসতভিটা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া।

খাল শুধু কৃষির জন্য নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। মৎস্য চাষ, হাঁস পালন, গবাদিপশু গোসল, এমনকি গ্রামীণ নারীদের দৈনন্দিন পানির ব্যবহারের সঙ্গেও এটি যুক্ত। সঠিকভাবে খাল সংস্কার করা হলে তার পাড়ে ফলজ, কাঠবন ও সবজি চাষের সুযোগ তৈরি হয়, যা বাড়তি আয় ও পুষ্টির জোগান দেয়।

দিনাজপুরের সাহাপাড়া খাল, যার খনন কাজ দিয়ে বর্তমান কর্মসূচির উদ্বোধন হয়েছে, এই ধারণার একটি বাস্তব উদাহরণ। এটি ঢেপা নদী ও পূর্ণভবা নদীকে সংযুক্ত করে। এই দুই প্রাচীন নদীর অনেক অংশে প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। খাল পুনঃখনন মানে শুধু খাল সচল করা নয়, বরং নদীর হারানো প্রবাহ ফিরিয়ে আনার একটি প্রয়াস।

দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ডিপ টিউবওয়েলেও অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ একটাই, রিচার্জ হচ্ছে না। খালে পানি থাকলে তা ধীরে ধীরে মাটিতে সেঁধিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণ করে। তাই খালের সঠিক গভীরতা, প্রস্থ ও নকশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে এমব্যাংকমেন্ট, রেগুলেটর, এমনকি ছোট রাবার ড্যাম ব্যবহার করে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর উৎস উজানে, ভারতের ভেতরে। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে মাত্র একটি পানি চুক্তি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। এর নবায়ন প্রক্রিয়া এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি। গ্রীষ্মকালে উজানে পানি কমিয়ে দেওয়ায় তিস্তা, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। অথচ বর্ষায় বিপুল পানি আসে, যা সংরক্ষণের অভাবে সাগরে নষ্ট হয়।

এই বাস্তবতায় গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পের মতো উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় আসছে। যদিও ২০১৭ সালে স্থান ও নকশাজনিত ঝুঁকি, ভারতে উজানের অঞ্জলগুলোতে পানিবদ্ধতার আশঙ্কা এবং পলি জমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনের সম্ভাবনার কারণে প্রকল্পটি স্থগিত হয়েছিল, তবু অফস্ট্রিম রিজার্ভার, নদী পুনরুদ্ধার ও গড়াই পুনর্জীবনের মতো বিকল্প সমাধান এখন সময়ের দাবি। খাল খননের কর্মসূচি যদি এসব বৃহৎ জলব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে পরিকল্পিত হয়, তাহলেই প্রকৃত সুফল মিলবে।

খাল খনন কর্মসূচি সফল করতে হলে এটিকে কোনো স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি জাতীয় জলব্যবস্থাপনা নীতির অংশ হিসেবে নিতে হবে। কোথাও যন্ত্রের বদলে মানবশ্রম ব্যবহার করতে হবে, কোথাও আধুনিক প্রযুক্তি। খাল লিজ নিয়ে মৎস্য চাষ, হাঁস পালন, বনায়ন, এমন বহুমুখী ব্যবহারের মডেল তৈরি করতে হবে, যাতে স্থানীয় মানুষ উদ্যোগটির অংশীদার হয়।

একই সঙ্গে উজানের বাস্তবতা মাথায় রেখে শক্তিশালী কূটনীতি, অভ্যন্তরীণভাবে পানি সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক নকশা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ আবশ্যক। বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত ছাড়া খাল খনন শুধু অস্থায়ী সমাধান হবে।

নীতি, কূটনীতি ও বিজ্ঞান, এই তিনটি স্তম্ভের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশ সত্যিকারের অর্থে পানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে। খালনদী পুনরুদ্ধার তখন আর শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও নিরাপদ দেশ গড়ার ভিত্তি হয়ে উঠবে।

লেখক: গীতিকার; জলবায়ু ও ড্রেইনেজ বিশেষজ্ঞ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধযুব বিদ্রোহ দিবস স্মরণে
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে