বিশ্বায়নের এই যুগে ভাষা ও সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াই সহজ নয়। বিশেষ করে অভিবাসী জীবনে মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আজ বিশ্বপরিসরে নিজের অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী করে তুলছে। একসময় দেশের বাইরে বাংলা বই পাওয়া ছিল কঠিন; এখন অনলাইন বিপণন, আন্তর্জাতিক বইমেলা এবং প্রবাসী সাংস্কৃতিক উদ্যোগের ফলে বাংলা বই বিশ্বের নানা প্রান্তে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণগুলোর একটি হলো নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা।
সমপ্রতি চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬। উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ এই আয়োজন গত ২২ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল– ‘যত বই তত প্রাণ’। টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন মেলায় ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। সমাপনী দিনে আবহাওয়া অনুকূলে ফিরলে বই বিক্রি ও দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। এ দৃশ্য প্রমাণ করে, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই বাড়ুুক, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবাসী বাঙালির ভালোবাসা এতটুকু কমেনি।
চার দিনের কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক। উদ্বোধনী দিনে মহাশ্বেতা দেবী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম এবং তপন রায়চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি, সংগীত, নৃত্য এবং সাহিত্যপাঠের মধ্য দিয়ে মেলার সূচনা হয়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। পরবর্তী দিনগুলোতে অনুষ্ঠিত হয় লেখক–পাঠক আড্ডা, সেমিনার, বিতর্ক, কবিতা পাঠ, নতুন বই নিয়ে আলোচনা, রবীন্দ্রসংগীতের আসর, শিশু–কিশোরদের চিত্রাঙ্কন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তরুণদের মতবিনিময়, সাহিত্য পুরস্কার প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ২৬টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। তবে এই বইমেলার গুরুত্ব শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। এর তাৎপর্য আরও গভীর।
প্রথমত, এই মেলা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির একটি প্রাণবন্ত কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। প্রবাসে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের অনেক শিশুর কাছে বাংলা ভাষা আর ঘরের ভাষা নয়; বরং শেখার ভাষা। তাদের সামনে বাংলা বই, বাংলা গান, কবিতা, ইতিহাস এবং শিল্পকলাকে একত্রে হাজির করার যে প্রয়াস বইমেলাটি নেয়, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিশু–কিশোরদের বাংলা লিখন প্রতিযোগিতা, গল্প লেখার কর্মশালা কিংবা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার–এসব আয়োজন কেবল বিনোদন নয়, পরিচয়ের শিক্ষা।
দ্বিতীয়ত, বইমেলাটি বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের লেখক, কবি, গবেষক ও প্রকাশকদের সঙ্গে উত্তর আমেরিকার পাঠকদের সরাসরি সংযোগ তৈরি হচ্ছে এখানে। নতুন বই নিয়ে আলোচনা, লেখক–পাঠক মুখোমুখি পর্ব, স্বাক্ষরদান অনুষ্ঠান এবং সাহিত্যবিষয়ক মতবিনিময় বাংলা সাহিত্যকে ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে এক বৈশ্বিক পরিসরে নিয়ে যাচ্ছে। একজন নিউ ইয়র্কের পাঠক যেমন ঢাকার নতুন উপন্যাসের খবর পাচ্ছেন, তেমনি একজন বাংলাদেশি লেখকও জানতে পারছেন প্রবাসী পাঠকের রুচি ও প্রত্যাশার কথা।
তৃতীয়ত, এই মেলা বাংলা বইয়ের বিপণনের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বই প্রকাশনা শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি পাঠক, আর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম বইমেলা। প্রকাশকদের ভাষ্যমতে, এবারের মেলায় গবেষণাধর্মী বই, উপন্যাস, স্মৃতিকথা ও শিশুতোষ বইয়ের রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি হয়েছে। অনেক স্টলের বই প্রায় শেষ হয়ে যায়। ভিসা জটিলতা, পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘ যাত্রার বাধা অতিক্রম করেও প্রকাশকদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, প্রবাসে বাংলা বইয়ের একটি শক্তিশালী বাজার তৈরি হয়েছে। এই বাজার শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চতুর্থত, নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা প্রবাসী বাঙালিদের জন্য একটি নিরপেক্ষ মিলনমেলা। রাজনৈতিক বিভাজন, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা আঞ্চলিক পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে এখানে মানুষ একত্রিত হন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির টানে। একজন লেখক, পাঠক, গবেষক, শিল্পী, শিক্ষক কিংবা সাধারণ দর্শনার্থী–সবাই এখানে একই পরিচয়ে উপস্থিত হন: তাঁরা বাঙালি। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে এই মিলনমেলা সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সমপ্রদায়ের অনুভূতি সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই বইমেলা প্রমাণ করেছে যে বাংলা ভাষার প্রাণশক্তি এখনও অমলিন। ভাষা তখনই বেঁচে থাকে, যখন তা শুধু পাঠ্যবইয়ে নয়, মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি, উৎসব এবং দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা সেই কাজটিই করছে। এটি শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি স্মৃতি ও স্বপ্নের মিলনক্ষেত্র, শিকড়ের সঙ্গে পুনঃসংযোগের একটি সেতু।
অনেক প্রবাসী আয়োজন রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত বিভাজনে আক্রান্ত হয়, কিন্তু একটি বইমেলা স্বভাবতই মানুষকে একটি বৃহত্তর পরিচয়ের নিচে একত্রিত করে–পাঠক, লেখক, বাঙালি। সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নানা ব্যক্তিগত ঝামেলার কারণে এ বছর নিউইয়র্ক বইমেলায় আমার যাওয়া হয়নি। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে আমি সর্বক্ষণ বইমেলায় কী ঘটছে না ঘটছে, তা নিয়ে কান পেতে রেখেছিলাম। বন্ধু প্রিয় লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন এবারে অতিথি হিসেবে ছিলেন। কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, বন্ধু কবি হোসাইন কবির, জাফর আহমদ রাশেদ বইমেলায় প্রতিদিন ছিলেন, কবিতা পড়েছেন, আলোচনা করেছেন। বাতিঘরের স্বত্বাধিকারী দীপংকর দাশ প্রতিবছরের মতো এবারও ছিলেন। এদের সঙ্গে কথা বলে, যোগাযোগ রেখে আমি চেষ্টা করেছি বইমেলায় মনের দিক থেকে উপস্থিত থাকতে। চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম প্রকাশনা বাতিঘর ৩৫ তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের মধ্যে এই বছর ‘চিত্তরঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার’ অর্জন করে। গত ২৬ মে জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে আয়োজক মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এটাও আমাদের জন্য গৌরবের বিষয়।বিশ্বজিত সাহার ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৯২ সালে যে ছোট্ট বীজ রোপিত হয়েছিল, আজ তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ৩৫ বছরের পথচলায় নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা এখন শুধু একটি প্রবাসী আয়োজন নয়; এটি বিশ্ববাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। বাংলা ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, বইয়ের প্রতি এই ভালোবাসা এবং শিকড়ের প্রতি এই আকর্ষণ ততদিন বাঙালির পরিচয়কে সমৃদ্ধ করবে।
লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক











