আমাদের দেশ ও সমাজে এখন তারুণ্য বড় উদভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে কি এটা এখন ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের সমানে একদল কিশোর কিশোরী বা তরুণ তরুণীর এমন উচ্ছন্নে যাওয়া সত্যি কষ্টের। এরা কি ভাবে এমন হয়ে গেল? সবটাই কি তাদের দোষ? তাদের জন্য সমবেদনা আর ভালোবাসা রেখেই বলি পরিপূর্ণভাবে তাদের দোষারোপ করা সঠিক না। তারা যে বয়সে প্রেম ভালোবাসা কবিতা নাটক নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা সে বয়সে তাদের মাথায় রাজনীতি ঢুকিয়ে দিয়েছে সমাজ। সমাজের মাথা নামে পরিচিতজনেরা দিয়েছেন ইন্ধন।
একটি সরকার যখন একনায়ক হয়ে ওঠে বা সরকার যখন অগণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে তখন সমাজ তার বিরুদ্ধে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে এদের ব্যবহার করে সরকার পতনের কারণেই এরা বিপথগামী হয়ে পড়েছিল।
যেটা সবচাইতে বড় ব্যাপার এরা ভালোমন্দ ঠিক বেঠিক বোঝার আগেই এদের স্বপ্ন ছিনতাই হয়ে গেছে। যে কারণে এখন এরা বেপরোয়া আর নিয়মের বাইরে। এদের জন্য ভালোবাসার পরিবর্তে মানুষের মনে যে ক্রোধ আর ঘৃণার বিস্তার হচ্ছে তার নিরসন জরুরি। সে কারণেই আজ আমাদের দেশ সাহিত্য আর সমাজে প্রচলিত কয়েকটি গুরু ভক্তির গল্প বলব। যে গল্পগুলো ঠিক গল্প না এগুলো আসলে শিশু কিশোর মানস গঠনের সহায়ক। কেন কি কারণে তাদের টার্গেট তাদের শিক্ষক বা গুরুকুল? যারা তাদের পথ দেখাবে যারা তাদের ভুল শুধরে দেবেন যারা তাদের ভবিষ্যতের জন্য তৈরী করবেন তাদের প্রতি এদের এতো রাগ? এতো ক্রোধ? এই অন্ধত্ব যে বা যারাই চালু করুক এর অবসানে নীচের গল্পগুলো জানা জরুরি।
১. একদিন আচার্য দ্রোণ তাঁর শিষ্য ও একটি কুকুর নিয়ে সেই বনে পৌঁছেছিলেন যেখানে একলব্য শিকারের জন্য থাকতেন। তার কুকুর পথ হারিয়ে একলব্যের আশ্রমে পৌঁছে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। একলব্য তখন ধনুর্বিদ্যার অনুশীলন করছিলেন।
কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে একলব্যের সাধনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। তাই তিনি এমন তীর নিক্ষেপ করলেন যে কুকুরটি সামান্য আঁচড়ও দিল না এবং কুকুরের মুখও বন্ধ হয়ে গেল। একলব্য এমন দক্ষতার সাথে তীর নিক্ষেপ করেছিলেন যে কুকুরটি কোনভাবেই আঘাত না করে এবং তার তীর দিয়ে কুকুরের মুখ বন্ধ করে দেয়।
কুকুরটি দ্রোণের কাছে ছুটে গেল। কুকুরটি অসহায়ভাবে গুরু দ্রোণের কাছে পৌঁছে গেল। এমন চমৎকার ধনুর্বিদ্যা দেখে দ্রোণ ও শিষ্যরা বিস্মিত হলেন। তারা সেই মহান তীরন্দাজের সন্ধানে একলব্যের আশ্রমে পৌঁছে দেখেন যে একলব্য এমন তীর নিক্ষেপ করছেন যা একজন শীর্ষ যোদ্ধাও ছুড়তে পারে না। এটি দ্রোণাচার্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি একলব্যের সামনে তাঁর গুরু সম্পর্কে জানার কৌতূহল দেখালে একলব্য তাঁকে সেই মূর্তিটি দেখান।
দ্রোণাচার্যকে মানসিক গুরু হিসেবে বিবেচনা করে একলব্য নিজে অনুশীলনের মাধ্যমে এই জ্ঞান অর্জন করেছিলেন জেনে তিনি আরও অবাক হয়েছিলেন। একলব্যের গুরুদক্ষিণা তার মূর্তি দেখে আচার্য দ্রোণ বললেন, তুমি যদি আমাকে তোমার গুরু মনে কর, তবে আমাকে গুরুদক্ষিণা দাও। একলব্য জীবন বিসর্জনের কথা বললেন।
গুরুদক্ষিণায়, গুরু দ্রোণ বুড়ো আঙুল চেয়েছিলেন যাতে একলব্য শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধারী না হয়, এমনটা হলে অর্জুনকে মহান তীরন্দাজ বানানোর প্রতিশ্রুতি মিথ্যে হয়ে যাবে। একলব্য বিনা দ্বিধায় গুরুকে তার বুড়ো আঙুল অর্পণ করলেন। এর পর একলব্য ছাড়া সবাই চলে গেল।
একটি পুরানো গল্প অনুসারে, এর একটি প্রতীকী অর্থও হতে পারে যে, একলব্যকে খুব মেধাবী বলে জেনে দ্রোণাচার্য তাকে বুড়ো আঙুল ছাড়াই ধনুক চালানোর বিশেষ দক্ষতা উপহার দিয়েছিলেন।
আরও বলা হয় যে বুড়ো আঙুল কাটার পর একলব্য তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল ব্যবহার করে তীর ছুড়তে শুরু করেন। এখানেই আধুনিক ধনুর্বিদ্যার জন্ম। তাই একলব্যকে আধুনিক ধনুর্বিদ্যার জনক বলাই সঙ্গত হবে। নিঃসন্দেহে এটিই উত্তম উপায় এবং আজকাল এভাবেই তীরন্দাজ করা হয়। ছেলেবেলায় হিতোপদেশে আরুণীর গল্প পড়েছিলাম।
গুরু তাকে ডেকে বলেছিলেন, শস্য ক্ষেতে জল ঢুকছে, গিয়ে বন্ধ করে এসো। বেচারা কিশোর গিয়ে দেখে পানি ঢোকা বন্ধ করার কোন উপায় নাই। কিন্তু গুরুবাক্য অমান্য করবে কী ভাবে?
অনেক বিলম্ব দেখে গুরু বেরিয়েছিলেন তাকে খুঁজতে। গিয়ে দেখেন যে দিক দিয়ে পানি ঢুকছে সেটাকে আড়াল করে লম্বালম্বি শুয়ে আছে আরুনী। তার শরীর পুরো ভিজে গেছে কিন্তু গুরুর কথা অমান্য করে নি সে। গুরুই তাকে কোলে তুলে নিয়ে এসেছিলেন।
২. বাদশাহ আলমগীর ভারতের সম্রাট। দিল্লীর অধিশ্বর। পুত্রের শিক্ষা কেমন চলছে দেখার জন্য গুরুগৃহে গিয়ে দেখেন, ওস্তাদজী পা পরিস্কার করছেন নিজ হাতে। বাদশাহর পুত্র দূর থেকে পানি ঢেলে দিচ্ছিল ওস্তাদের পা‘য়। বাদশাহকে দেখে শিক্ষকের তো জান খাঁচা ছাড়া। ভাবলেন এই অপরাধে জীবনই দিতে হবে হয়তো। কিন্তু না কাদের নেওয়াজের কবিতায় আমরা পড়লাম, বাদশাহ পুত্রকে ভৎসর্না করে বলেছিলেন, তুমি মানুষ হবে না। কেন তুমি নিজ হাতে শিক্ষকের পা পরিস্কার করো নি?
৩. বাঙালির কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শিক্ষকদের সম্মান করতেন বলে শান্তি নিকেতনের যে সব ক্লাশে ছাত্র ছাত্রী কম হতো তিনি নিজে এসে ছাত্রদের সাথে বসে যেতেন। তাঁর মতে শিক্ষক যেন মনে করেন যে, তিনি গুরুত্বপূর্ণ।
বাঙালির আজ এ কোন দশা? বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো কে আর যাই বলি কোমলপ্রাণ কোমলমতি বলা যায় না। দুধের দাঁত পড়ে নি, আক্কেল দাঁত ওঠে নি এরা যে ভাষায় কথা বলে, যে পরিমান মারমুখী তাতে তো মনে হয় এই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের চাইতেও ভয়াবহ।
এসব রাগ ক্রোধ মান অপমান সব আগেও ছিল। কিন্তু বিগত মেটিকুলাস ডিজাইন আমলে এগুলো ওপেন করা দেয়া হয়েছিল। সরকার পতনের জন্য টুলস হিসেবে এদের ব্যবহারের পরিণতিতে জন্ম নেয় মব। অবাধ মবের এখন যা চেহারা তাতে কপালে বহুত খারাপ আছে। দেখুন না কোন অশিক্ষিত না কোন এস এস সি বা ইন্টার পাশ না কোন গ্র্যাজুয়েট সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে মহা পন্ডিত শান্তিধর এক উচ্চডিগ্রী ধারী কথিত শিক্ষক।
হায়, বাঙালি এই প্রজন্মের কি হবে?
লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক।












