বই, বই–পড়া নিয়ে সপ্তাহ কয়েক আগে এই কলামে লিখেছিলাম। এই নিয়ে এর আগেও বার কয়েক লিখেছিলাম। আজ আবারো লিখতে বসেছি এই কারণে লেখাটি প্রকাশিত হবার পর বেশ কিছু মন্তব্য এসেছে আমার কাছে। কেউ লিখেছেন ফেইস বুকে, কেউ ম্যাসেঞ্জারে, কেউ হোয়াটস্যাপে। তাদের কেউ কেউ আমার চেনা, বেশির ভাগ অচেনা। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল খুলে দেখি আমার এক সিনিয়র সাংবাদিক বন্ধু, নাসিরুল হকের পাঠানো একটি লিংক। অনেকেই নানা সময় লিংক পাঠান। তার বেশির ভাগ দেখা হয়না। কারণ বেশির ভাগ চটুল ধরনের কিংবা এমন জাতের যাতে আমার আগ্রহ শূন্যের পর্যায়ে। না দেখেই তা ডিলিট করে দেই। আজ সকালে যে লিংকটি বন্ধু পাঠালেন তা খুলে দেখি বই সম্পর্কিত এবং বেশ দীর্ঘ। দীর্ঘ লিংক মানে অনেক সময়ের ব্যাপার, প্রায় ২৫ মিনিটের। মোবাইলে এতো দীর্ঘ সময় ব্যয় করার মত দীর্ঘ–অবসর তো নেই। দাঁত ব্রাশ করতে করতেই লিংকটা খুলি। দেখি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর বক্তৃতা। তার বক্তব্য অনেকের মতো আমারও পছন্দের। তিনি যখন মঞ্চে কিংবা মঞ্চের বাইরে কথা বলেন, তখন মনে হয় মুক্তো ঝরে। দর্শক শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে কেবল তার কথা শোনেন না, তাকে দেখেনও। এই বয়সেও তিনি আকর্ষণীয়, ঝাঁকড়া চুল, সুন্দর শারীরিক গড়ন, কথা বলার স্টাইল – সবকিছু মিলিয়ে তার রয়েছে এক সম্মোহনী শক্তি। আমার সৌভাগ্য যে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত আমার তিনটি বইয়ের দুটি পৃথক প্রকাশনা উৎসবে তিনি প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন। দু‘বারই হলভর্তি ছিল দর্শক–শ্রোতা। দ্বিতীয়বার যখন এসেছিলেন তখন তিনি বেশ অসুস্থ। বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, ‘ঢাকা থেকে আসার মত শারীরিক অবস্থা নেই। কিন্তু বিকাশ বাবুর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারিনি বলে আসা।‘ আমার পরম সৌভাগ্য বলতে হয় যে আমার দুই অনুষ্ঠানেই তাকে আনতে পেরেছি। এর পেছনে আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু, জাতীয় আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ফটো সাংবাদিক তাহেরের (এম এ তাহের) অবদানও ছিল। শারীরিক কারণে তিনি একা আর দূর–ভ্রমণে যান না। তাহের হয়েছিলেন অধ্যাপক সায়ীদের ছায়াসঙ্গী। আসার আগে ওনার স্ত্রী তাহেরকে তার (অধ্যাপক সায়ীদ) সমস্ত ঔষধ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। যাই হোক, ভেবেছিলাম ব্রেকফাস্ট সেরে গোটা ভিডিওটা দেখবো। কিন্তু ওই যে বললাম, তার সম্মোহনী শক্তি– পুরোটা দেখে তবেই ব্রেকফাস্ট করতে বসলাম। ভিডিওতে তিনি মূলত বই পাঠে কী হয়, কী পরিবর্তন ঘটে পাঠকের ভেতর সেই সম্পর্কে চমৎকারভাবে, গল্পাকারে বক্তব্য দেন। কী বক্তব্য রেখেছেন সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে ফিরে আসি আমার লেখার উপর পাঠকের প্রতিক্রিয়া এবং তাদের মন্তব্য সম্পর্কে।
কাজী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ লিখেছেন, ‘(লেখা পড়ে) একটি সুন্দর স্মৃতি মনে পড়ে গেল। রাউজান গহিরা হাই স্কুলে পড়ার সময় নবম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় আমি প্রথম হয়েছিলাম। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এই অর্জনের স্বীকৃতি স্বরূপ স্কুল থেকে আমাকে পূর্ণেন্দু দস্তিদারের লেখা ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম‘ বইটি উপহার দেয়া হয়। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় ছিল, পুরস্কারটি আমি গ্রহণ করেছিলাম সেদিনের প্রধান অতিথি, প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আবুল ফজলের হাত থেকে। তখনকার দিনে এভাবেই আমাদের পাঠ্য বইয়ের বাইরে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করা হতো। অথচ আজ এই ধরনের সুন্দর উদ্যোগগুলো যেন হারিয়েই গেছে। চমৎকার পোস্টটির জন্যে ধন্যবাদ দাদা।’ আব্দুল ওয়াদুদের স্মৃতিচারণ আমাকেও আমার স্কুল দিনের এমনতরো ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিলো। সেটি পাঠকের সাথে ভাগাভাগি না করে পারছিনে। কারো কারো মনে হতে পারে ‘নিজের ঢোল নিজে পেটানো‘। তা হোক। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। বাসার খুব কাছে, মিনিট সাতেক হাঁটার দূরত্বে ছিল রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনি হাই স্কুল। ছাত্র–ছাত্রী আমরা সবাই একসাথে পড়তাম, মেয়ে–ছেলে কোন ভাগাভাগি ছিলনা। সেভেন তক পড়ার পর চলে যাই অন্য স্কুলে (কলেজিয়েট স্কুল)। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। তার বেশ কিছুদিন আগে স্কুলের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক রচনা প্রতিযোগিতায় যোগ দেবার আহবান জানানো হয়েছিল। বিষয়: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। প্রতিযোগিতার দিন সংগীতানুষ্ঠান ছাড়াও আয়োজন করা হয় আরো কিছু ইভেন্ট। এক পর্যায়ে ঘোষণা দেয়া হলো রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে ক্লাস এইটের ছাত্রী সেলিনা (পুরো নামটা মনে পড়ছে না), দ্বিতীয় আমি। পুরস্কার হিসাবে পেলাম একটি বই। আমার জীবনের প্রথম এবং খুব সম্ভবত শেষ পুরস্কার। এরপর জীবনে আর তেমন কোন পুরস্কার জোটেনি। জুটেছে তিরস্কার। মূলত সিরিয়াসলী লেখাপড়া না–করার কারণে। মজার ব্যাপার হলো, সেই অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠে আমাকে গানও গাইতে হলো। তার জন্যে দিন কয়েক আগে থেকে আমাকে গানের তালিম নিতে হলো স্কুলের পেছনে রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনিতে থাকা ক্লাস টেনের ছাত্রী সবিতা চৌধুরীর কাছে। তার গানের গলা ছিল খুব ভালো। তার বাবা অনিল চৌধুরীও ছিলেন গানের শিক্ষক। দিন কয়েক সবিতাদির বাসায় গিয়ে গানের চর্চা করতে হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের কেন যে মনে হলো আমি গাইতে পারি কিংবা আমাকেই বা কেন গান গাইবার জন্যে সিলেক্ট করা হলো জানিনে। তখন কিংবা তারও অনেক পরে এই প্রশ্ন মনে আসেনি। কিন্তু অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে এখন তা খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জানার কোন উপায় নেই। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। সময় তো আর আমার কিংবা অন্য কারো জন্যে বসে থাকেনা। সে আপন গতিতে চলে। সময় চলতেই থাকবে, কিন্তু একটা সময় আমরা থেমে যাবো। এটিই ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘ওয়ে অফ লাইফ‘। সেই ছিল আমার জীবনে মঞ্চে উঠে প্রথম এবং শেষ বারের মত গান গাওয়া। যাই হোক–
শফিকুল আলম খান। প্রাক্তন এই সরকারি কর্মকর্তা এবং সাংবাদিক লেখক আমার সীমিত সংখ্যক বিদগ্ধ পাঠকদের অন্যতম। প্রকাশিত লেখার উপর তিনি মন্তব্য করে লিখেছেন, ‘আসলে ছেলেমেয়েদের মোবাইল আসক্তি দূর করতে না পারলে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘বর্তমানে শতকরা ৯৫% ছাত্র–ছাত্রী পাঠ্য বই ছাড়া অন্য কোন বই পড়ে বলে মনে হয়না। আমরা কিশোর বয়স থেকে ‘ঠাকুর মার ঝুলি‘ (দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার), দস্যু বনহুর, কুয়াশা এগুলো দিয়ে শুরু করে, কলেজে পৌঁছাতে পৌঁছাতে নাম–করা লেখকদের উপন্যাস শেষ করেছি। কলেজের প্রথম বর্ষে এক নাগাড়ে তিন বা চারদিনে বিমল মিত্রের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম‘ এর বিশাল দুটি খন্ড শেষ করেছিলাম। কথা হলো, কিশোর বয়সে নেশা (বই পড়ার) জাগ্রত করতে পারলে হয়তো ভবিষ্যতে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। আজাদীতে আপনার লেখাটি বরাবরের মত চমৎকার। বিয়েতে বই উপহার দেয়া, আদান–প্রদান করার বিষয়টি লেখায় সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন। অভিনন্দন।’
সমপ্রতি শ্রীমঙ্গলে ‘এসো বই পড়ি, মন গড়ি’ স্লোগানে এক অভিনব উদ্যোগ নেয়া হয় স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে। লক্ষ্য– উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে ‘পাঠ্যাভ্যাসের ছাতার‘ নিচে আনা। সে–কথা বই বিষয়ক লেখায় উল্লেখ করেছিলাম। বই এবং সাহিত্য–বিষয়ক নানা অনুষ্ঠানের অত্যন্ত সফল উদ্যোক্তা বন্ধুবর সাংবাদিক ও কবি রাশেদ রউফের কাছে প্রস্তাব রেখেছিলাম অনুরূপ উদ্যোগ নেয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখতে। উত্তরে তিনি লিখেছেন, ‘দাদা, আপনার প্রস্তাবনা নিয়েই আমরা আজ আলোচনা করেছি। অনেক ধন্যবাদ।’ তিনি প্রশংসা করতেও ভুলেননি এই বলে, সুন্দর লিখেছেন। সঠিক কিংবা বাড়িয়ে বলা কিনা জানিনে। তবে আবারো বলি, শুনে খুশি হয়েছি। শফিকুল আলম খানও লিখলেন, ‘এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, যদি অঙ্কুরে হারিয়ে না যায়।‘ ঢাকা থেকে সমির বড়ুয়া লিখেছেন, ‘মোবাইল এসে হাত থেকে বই কেড়ে নিয়েছে।‘ আসলেও দুঃখজনক যে, মোবাইল এসে বই কেড়ে নিয়েছে। সে কি কেবল শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে? এই নেশায় কমবেশি সব বয়েসীদের মাঝে দেখা যায়।
শেষ করবো অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের দীর্ঘ বক্তৃতা থেকে নেয়া কয়েকটি কথা উল্লেখ করে। ঢাকায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত ‘স্বপ্নের সমান বড়‘ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বই পড়ার কারণে পাঠকের চিন্তার জায়গা, বোধের জায়গার পরিবর্তন ঘটে। যে বই পড়েনা তার বোধের জায়গা, চিন্তার জায়গার কোন পরিবর্তন ঘটেনা। সে তখন যে বই পড়ে তার থেকে ভিন্ন হয়ে যায়।‘ তার কথাগুলি যে কত সত্যি তা নিজেও টের পাই। কেননা আমারও কিছু পরিচিতজন আছে, গুটি কয়েক বন্ধু আছে, যারা বই পড়েনা, যাদের সাথে বইয়ের কোন সম্পর্ক নেই। দূরত্বটা টের পাই। অধ্যাপক আবু সায়ীদ বলেন, ‘বই কারা লেখে? পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বইগুলি লেখে শ্র্রেষ্ঠ মানুষেরা। ওই মানুষগুলি তখন তোমার ভেতর চলে আসে। প্রত্যেকটা বই পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষগুলি তোমার হৃদয়ের মধ্যে এসে পড়ে। তুমি তাদের দেখতে পাওনা। আমাদের যদি বড় হতে হয়, তাহলে বই খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা নাটক দেখলাম, সেটাও একটা বই, একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গেলাম, সেটাও একটা বই। একটা ফিল্ম দেখলাম সেটাও একটা বই। কারণ একটা ফিল্ম যখন তুমি দেখো, কিংবা একটা বই যখন পড়, তখন তুমি অন্য একটা জগৎ দেখো, দেখোনা? নতুন একটা জগৎ। পৃথিবীতে সুন্দর, অভাবনীয়, বড় যা কিছু আছে তা নিজের মাঝে নিয়ে নেয়াটা একটা জগৎ। সেই জন্য আমরা চাই টোটাল মানুষ, আংশিক মানুষ নয়। আর তা সম্ভব কেবল বই পড়ার মধ্যে দিয়ে। আবারো বলি, ‘বই পড়ুন, রঙিন ক্রেষ্ট নয়, বই উপহার দিন। অন্যকে পড়ার জন্যে অনুপ্রাণিত করুন। বই হোক আমাদের নিত্য সঙ্গী‘। (৯–৯–২০২৬)
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।











