আলো খুঁজি অন্ধকারে, নিজেকে খুঁজতে হয় প্রতিকূলতায়

সাইফ চৌধুরী | শনিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ

অন্ধকার বলতে এখানে শুধু রাতের অন্ধকার বোঝানো হয়নি। অন্ধকার হলো অনিশ্চয়তা, সংকট, ব্যর্থতা, ভয়, অভাব, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়। আর আলো মানে শুধু সাফল্য বা অর্জন নয়। আলো হলো আশা, বিবেক, সাহস, আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা এবং নিজের সামর্থ্যকে চিনে নেওয়ার শক্তি। মানুষের জীবনে প্রতিকূলতা অনিবার্য হতে পারে, কিন্তু সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শক্তিকে খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতাই তাকে সামনে এগিয়ে নেয়। তাই অন্ধকারের ভেতর আলো খোঁজা এবং প্রতিকূলতার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়া কেবল আশাবাদের কথা নয়, এটি জীবনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা।

আমাদের সময় এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রত্যেক মানুষের সামনে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো না কোনো প্রশ্ন রয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা শুধু ভালো ফল করা নয়, পড়াশোনা শেষে সে কোথায় দাঁড়াবে এবং কীভাবে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করবে। একজন অভিভাবকের ভাবনা শুধু সন্তানের শিক্ষা নিয়ে নয়, বাড়তে থাকা ব্যয়ের মধ্যে তার শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কীভাবে নিশ্চিত করবেন। একজন কর্মজীবী মানুষ মাসের শুরুতে যে আয় নিয়ে পথ চলেন, মাসের শেষে এসে সেই আয় দিয়ে প্রয়োজন মেলানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

ব্যবসায়ী বাজারের অনিশ্চয়তা নিয়ে ভাবেন, কৃষক আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে চিন্তা করেন, তরুণ কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রব্যমূল্যের চাপ, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর, জলবায়ু ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা। ফলে বর্তমান সময় শুধু কঠিন নয়, এটি পরিবর্তনেরও সময়। পুরোনো অনেক ধারণা ও নিশ্চয়তা বদলে যাচ্ছে। নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রতিটি সংকটের মধ্যেই পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনা থাকে। স্বস্তির সময়ে মানুষ নিজের অনেক প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু সংকট এসে তাকে নিজের সামনে দাঁড় করায়। আমি কে, আমি কী চাই, আমার শক্তি কোথায়, আমার সীমাবদ্ধতা কোথায়, কোন মূল্যবোধের জন্য আমি দাঁড়াব, ব্যর্থ হলে কীভাবে আবার শুরু করব, এসব প্রশ্ন তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখান থেকেই শুরু হয় আত্মআবিষ্কার।

সক্রেটিসের অপরীক্ষিত জীবন সম্পর্কে যে উপলব্ধি, তা আজও মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিজের জীবনকে পরীক্ষা করা মানে শুধু সাফল্য ও ব্যর্থতার হিসাব করা নয়। নিজের বিশ্বাস, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, ভুল এবং সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করা। সংকট মানুষকে সেই আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ দেয়। নিজের ভুল স্বীকার করা কঠিন, নিজের দুর্বলতার দিকে তাকানো আরও কঠিন। অথচ আত্মজ্ঞান শুরু হয় সেখান থেকেই।

যে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা চিনতে পারে, সে নিজের শক্তির জায়গাটিও ধীরে ধীরে আবিষ্কার করতে পারে। সীমাবদ্ধতা জানা মানে থেমে যাওয়া নয়। বরং কোথা থেকে নতুন শক্তি তৈরি করতে হবে, তা বুঝে নেওয়া। এই অর্থে প্রতিকূলতা কখনো কখনো কঠিন একজন শিক্ষকের মতো কাজ করে। তার শিক্ষা আনন্দের নয়, কিন্তু সেই শিক্ষা মানুষকে বাস্তব জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়।

মির্জা গালিবের জীবন আমাদের এই সত্যের একটি মানবিক উদাহরণ। ব্যক্তিগত শোক, অভাব, হারানো এবং অনিশ্চয়তা তাঁর জীবনে ছিল। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টিকে মানুষের বেদনা, একাকিত্ব এবং আকাঙ্ক্ষার গভীরে নিয়ে গিয়েছিল। এর অর্থ এই নয় যে কষ্টকে মহিমান্বিত করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, মানুষ তার কষ্টকে কীভাবে উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতায় রূপ দেবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

আমাদের সমাজে অনেক মানুষ শক্ত থাকার নামে নিজের কষ্টকে লুকিয়ে রাখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা অন্যের সাফল্য দেখি, সুন্দর জীবন দেখি, কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনের সংগ্রাম দেখি না। ফলে নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করে হতাশ হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। অথচ মানুষের পথ এক নয়, সময়ও এক নয়। তাই আত্মআবিষ্কারের অর্থ অন্যের সঙ্গে নিজের জীবন মাপা নয়। বরং গতকালের নিজের সঙ্গে আজকের নিজের তুলনা করা। আজ যদি গতকালের চেয়ে সামান্য ভালো হতে পারি, সেটিও অগ্রগতি।

ফকির লালন শাহ্‌ এর আত্মঅনুসন্ধানের দর্শন আমাদের এখানেই নতুন করে ভাবতে শেখায়। আমরা পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চাই, অন্যের জীবন নিয়ে অনেক কথা বলি, কিন্তু নিজের মনের খবর কতটা রাখি। নিজের ভয়, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা এবং বিবেকের সঙ্গে কতবার কথা বলি। প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীর অসংখ্য তথ্য দিয়েছে, কিন্তু নিজের ভেতরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর সময় যেন কমিয়ে দিয়েছে। তাই আধুনিকতার সঙ্গে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের উন্নত মম শিরের আহ্বান আত্মমর্যাদার শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। সত্যিকারের সাহস ভয়হীন হওয়া নয়, বরং ভয়কে জেনেও সত্য ও ন্যায়ের জায়গা থেকে সরে না যাওয়া। প্রতিকূলতার সময়ে আত্মমর্যাদা মানুষকে ভেতর থেকে শক্ত করে। তবে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তব সক্ষমতাও প্রয়োজন।

শুধু স্বপ্ন দেখলেই ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না। প্রয়োজন শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, উদ্যোগ এবং ন্যায়ভিত্তিক সুযোগ। একজন তরুণকে শুধু চেষ্টা করতে বলা যথেষ্ট নয়, তাকে চেষ্টা করার সুযোগও দিতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু ভালো ফলের জন্য প্রস্তুত করলে হবে না, তাকে বাস্তব জীবনের দক্ষতাও দিতে হবে। একজন কৃষককে শুধু ঝুঁকি নিতে বলা যথেষ্ট নয়, তার কাছে প্রযুক্তি, তথ্য এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

এখানেই ব্যক্তি ও সমাজের দায়িত্ব এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে চেষ্টা করবে, কিন্তু সমাজকে তার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আত্মআবিষ্কার ব্যক্তিগত যাত্রা হলেও তার পূর্ণতা সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। নিজের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অন্যের জীবনেও সামান্য আলো পৌঁছে দিতে পারলেই আত্মজ্ঞান আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

প্রতিকূলতা আমাদের সম্পর্কের সত্যতাও প্রকাশ করে। সুখের দিনে পাশে থাকা সহজ, কঠিন সময়ে পাশে থাকা কঠিন। ব্যর্থতা শেখায় ভুল থেকে শিক্ষা নিতে। প্রত্যাখ্যান শেখায় নিজের মূল্য সবসময় অন্যের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে না। একাকিত্ব শেখায় নিজের সঙ্গে থাকতে। অপেক্ষা শেখায় ধৈর্য। আর অন্ধকার শেখায় আলোর প্রকৃত মূল্য।

তবে কষ্টকে মহিমান্বিত করা উচিত নয়। দারিদ্র্য কোনো রোমান্টিক অভিজ্ঞতা নয়, বেকারত্ব কোনো দার্শনিক পরীক্ষা নয়, অন্যায় সহ্য করাকে আত্মিক শক্তি বলা যায় না। প্রতিকূলতা থেকে শিক্ষা নেওয়া মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। বরং অন্যায় ও সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে বাস্তব পরিবর্তনের পথ তৈরি করা। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়, সুযোগের সমতা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের জন্য সম্মানজনক জীবনযাপনের পরিবেশ।

জীবন কখনো সব উত্তর একসঙ্গে দেয় না। কখনো একটি প্রশ্ন দেয়, কখনো একটি ব্যর্থতা, কখনো একটি বন্ধ দরজা। আমরা অনেক সময় সেটিকে শেষ বলে মনে করি। পরে বুঝতে পারি, সেটিই ছিল নতুন শুরুর সংকেত। মাটির অন্ধকারের মধ্যেই বীজ অঙ্কুরিত হয়। নদী বাধার সঙ্গে ধাক্কা খেয়েই নতুন পথ খুঁজে নেয়। মানুষও সংকটের মধ্য দিয়ে নিজের অজানা শক্তিকে চিনতে শেখে।

আজকের বাংলাদেশে আমাদের অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি মানসিক শক্তিও প্রয়োজন। দক্ষতার পাশাপাশি মূল্যবোধ প্রয়োজন। সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর সংস্কৃতিও প্রয়োজন। যে সমাজ মানুষকে দ্বিতীয় সুযোগ দিতে জানে, যে সমাজ তরুণদের শুধু প্রতিযোগী নয়, সম্ভাবনাময় নাগরিক হিসেবে দেখে, সেই সমাজই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়।

অন্ধকার সবসময় দূর করা আমাদের হাতে নেই। ঝড় থামানোও সবসময় সম্ভব নয়। কিন্তু ঝড়ের মধ্যে নিজের দিক ঠিক রাখা আমাদের দায়িত্ব। সব ক্ষত মুছে যায় না, কিন্তু ক্ষত থেকে অভিজ্ঞতা জন্ম নিতে পারে। সব দরজা খোলে না, কিন্তু বন্ধ দরজা কখনো কখনো নতুন পথ খুঁজতে শেখায়।

মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো সে কতবার পড়ে গেছে তা দিয়ে নয়, কতবার উঠে দাঁড়িয়েছে তা দিয়ে। প্রতিকূলতা আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু নিজের ভেতরের আলোটুকু যদি আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তাহলে সেই অন্ধকারও একদিন পথ দেখানোর কারণ হয়ে উঠতে পারে। হয়তো জীবনের সবচেয়ে গভীর অন্ধকারেই মানুষ নিজের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয়টি আবিষ্কার করে। সেখানেই আলো জন্ম নেয়, সেখানেই মানুষ নতুন করে নিজেকে খুঁজে পায়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বপ্নজয়ী এক বাঙালি চিকিৎসকের কথা