মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা ক্রমাগত আঘাত করছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহনের বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এতটাই কমে গেছে যে গতকাল (১০ সেপ্টেম্বর) সেখানে মাত্র সাতটি জাহাজ চলাচল করেছে। আগের দিনের ১২টি এবং গত ১০ দিনের গড় ১৪টির নিচে। একই সময়ে হরমুজ ও লোহিত সাগরের আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উঠে গেছে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে। যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে তেলবাহী জাহাজগুলো নিরাপদ বিকল্প পথ খুঁজছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতায় সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের জন্য ১ লাখ ৪ হাজার ২৬ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেশি পাড়ি দিয়ে আফ্রিকা ঘুরে চট্টগ্রামে আসছে ‘এমটি নিনেমিয়া’। আগামীকাল শনিবার জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছানোর কথা। ২৪৯ দশমিক ৯৫ মিটার দীর্ঘ, ৪৪ দশমিক ৪ মিটার প্রশস্ত ও ১৪ দশমিক ৬ মিটার ড্রাফটের মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ট্যাংকারটি গত ২৩ জুলাই সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ক্রুড নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ২০২৪ সালে নির্মিত জাহাজটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল। কিন্তু স্বাভাবিক রুটে চট্টগ্রামে পৌঁছানোর বদলে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়িয়ে এবার তাকে সুয়েজ খাল, জিব্রাল্টার প্রণালি ও দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ভারত মহাসাগরের পথে আসতে হয়েছে। এতে সাধারণ সময়ে সৌদি আরব থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত ৪ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইলের পথ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার নটিক্যাল মাইলের কাছাকাছি। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যাত্রার সময় ১৩–১৫ দিন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ দিনে।
সূত্র বলেছে, একটি ক্রুড চালান দেশে আনতেই এখন প্রায় সাড়ে তিন গুণ সময় এবং প্রায় তিন গুণের বেশি নৌপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। দীর্ঘ পথের সঙ্গে বাড়ছে জাহাজের বাংকার জ্বালানি, মেরিন গ্যাস অয়েল, সুয়েজ খালের ফি, জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়। বিএসসি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। কিছু ব্যয় নির্দিষ্ট হলেও চূড়ান্ত হিসাব দুই পক্ষের আলোচনায় নির্ধারিত হবে বলে মন্তব্য করে সূত্রগুলো বলেছে যে, যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশ নেই, এই যুদ্ধের কোনো পক্ষের সাথেও নেই বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তেল দেশে পৌঁছানোর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বাড়তি খরচের বোঝা বাংলাদেশকে টানতে হচ্ছে।
বিপিসির একজন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এক দুইটি জাহাজের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যয় হয়তো বড় কোনে াসমস্যা করবে না। কিন্তু
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরবর্তী ক্রুড চালানগুলোকেও একইভাবে বিকল্প পথে আনতে হলে শুধু পরিবহন ব্যয় নয়, জাহাজের প্রাপ্যতা, যুদ্ধঝুঁকি বীমা, আন্তর্জাতিক তেলের দাম এবং সরবরাহের সময়–সবকিছুই বাংলাদেশের জন্য অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। সংকট তৈরি হবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায়। ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি যুদ্ধ–পূর্ব মাত্রার প্রায় দুই–তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। আগস্টে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন কম ছিল বলে সূত্র জানিয়েছে।
দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানি করতে হয়। দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য খাতের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই বিদেশি উৎস ও আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সমুদ্রপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ করিডর দীর্ঘদিন অনিরাপদ থাকলে তার প্রভাব সরাসরি পড়বে দেশের আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি সরবরাহে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ক্রুড অয়েলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় গত ১২ এপ্রিল রাতে ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে এমটি নিনেমিয়ার আগের চালানের ক্রুড দেশে পৌঁছানোর পর ৮ মে শোধনাগারটি আবার চালু করা হয়। আন্তর্জাতিক নৌপথে সরবরাহ মাত্র কয়েক সপ্তাহ ব্যাহত হলেই দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগারের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন হচ্ছে। বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই শোধনাগার দেশের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক–পঞ্চমাংশ পূরণ করে। পরিশোধিত পণ্যের মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এর পাশাপাশি উৎপাদিত হয় এলপিজি, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিনসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য। ইআরএলের ক্রুড সরবরাহে ছেদ পড়লে এসব উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। যা সরাসরি দেশের জ্বালানি সেক্টরে মারাত্মক সংকট তৈরি করে।
ইআরএলের ক্রুড সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন। নতুন করে আসা নিনেমিয়ার ১ লাখ ৪ হাজার ২৬ টন ক্রুড একাই এই ধারণক্ষমতার প্রায় ৬৫ শতাংশের সমান। কিন্তু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পরবর্তী চালান সময়মতো পৌঁছাবে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একটি চালান ৫২ দিন পথে থাকলে একই সময়ে পরবর্তী চালানগুলোর পরিকল্পনা, জাহাজের প্রাপ্যতা এবং নিরাপদ রুট নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও সূত্র জানায়।
সূত্র বলেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। গতকাল ১০ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ১০৫ দশমিক ২৬ ডলারে উঠেছে। একই দিনে ডব্লিউটিআইও ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। হরমুজের কাছে জাহাজে হামলার মাত্রা বৃদ্ধি, লোহিত সাগরে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তেলের দাম বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিপিসির ক্রুড পরিবহনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) একজন কর্মকর্তা জানান, শুধু হরমুজ নয়, বাংলাদেশের জন্য বিকল্প ইয়ানবু রুটও এখন পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। সৌদি আরবের লোহিত সাগরের এই বন্দরটি হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হলেও জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টে বাব আল–মান্দেবের কাছে হুথি হামলার কারণে এখানকার তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইয়ানবু থেকে ক্রুড ও কনডেনসেট লোডিং কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নৌ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তাই যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিবেচনায় জাহাজ মালিকপক্ষ ও স্থানীয় এজেন্টের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে নিনেমিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ–লোহিত সাগর করিডর এড়িয়ে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রার মাধ্যমে আফ্রিকা ঘুরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার দিক থেকে সিদ্ধান্তটি যুক্তিসংগত হলেও এর আর্থিক মূল্য অনেক বড় বলে উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ৪ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইলের পথের বদলে প্রায় ১৩ হাজার নটিক্যাল মাইল ঘুরে আসায় একটি জাহাজকে অতিরিক্ত প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল চালাতে হচ্ছে। এতে নানা খাতে ব্যয় বাড়ছে।
জাহাজটি আগামীকাল চট্টগ্রামে পৌঁছালে ছোট ট্যাংকারে লাইটারিং করে ক্রুড ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ক্রুডবাহী জাহাজের বার্থিং, লাইটারিং, চলাচল ও খালাসে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র বলেছে, সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি মজুত বাড়ানো, পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিকল্প উৎস থেকে আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ সরবরাহ রুট, দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি, পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত এবং বিকল্প উৎস ও পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কারণ যুদ্ধের গোলা বাংলাদেশের ভূ–খণ্ডে না পড়লেও তার ধাক্কা যদি তেলবাহী জাহাজকে ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল ঘুরিয়ে দেয়, তবে জ্বালানি নিরাপত্তার যুদ্ধটি বাংলাদেশের জন্যও শুরু হয়ে গেছে বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।












