জেমস হ্যারিসন : এক মানবতাবাদী রক্তদাতার কাহিনি

ডা. দুলাল দাশ | সোমবার , ২০ জুলাই, ২০২৬ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ

রক্তদান এতই মহৎকাজ যেটা মাপকাটি দিয়ে মাপা যায় না। একটা প্রবাদ আছে ‘নো ব্লাড নো লাইফ’। রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে বুঝতে হবে জীবন শেষ। হৃদস্পন্দন থেমে গেছে। কারণ এই রক্ত প্রবাহিত হয় হার্টের মাধ্যমে। হার্ট পাম্প করে সমস্ত শরীরে রক্ত যোগান দেয়। হার্ট বিভিন্ন কারণে অসুস্থ হয়ে গেলে বা দুর্বল হয়ে গেলে রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে। এমন কি শরীরের যে অংশে রক্তচলাচল বন্ধ হলে সেই অংশটুকু পচে যায় ডাক্তারি ভাষায় সেটাকে গ্যাংগ্রিন বলা হয়। সেটা জীবন রক্ষার্থে শরীর থেকে বাদ দিতে হয়। আমরা হাঁটি ব্যায়াম করি এটার মেইন উদ্দেশ্য হলো শরীরের প্রতিটা অঙ্গে রক্ত চলাচল সচল রাখা। মাসল পাওয়ার বাড়ানো, যাতে আমরা সুন্দর জীবন যাপন করতে পারি। রক্ত আমাদের পুষ্টি রক্ত আমাদের শক্তি। আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান উৎস। বিভিন্ন রোগের কারণে, দুর্ঘটনাজনিত কারণে। সহিংসতার কারণে, অপারেশনকালীন সময়ে, প্রসবকালীন ক্ষত থেকে রক্ত ঝরা বন্ধ না হলে, বুলেট ইনজুরি, হার্টের অপারেশনে, বড় বড় সার্জারীকে রক্তের প্রয়োজন হয়। রক্তের পরিবর্তে রক্ত দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। এমন এমন জন্মগত রোগ আছে যেগুলি চিকিৎসা ব্লাড ট্রান্সফিউশান, রক্ত দিয়েই বাঁচিয়ে রাখতে হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অনেক সময় হৈ চৈ পরে যায় ‘আপনারা রোগী বাঁচাতে চাইলে রক্ত জোগার করুন, রক্ত দেওয়ার আগে দাতা এবং গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ মিলে কিনা দেখতে হয়, আবার রেসিস (Rh+Rh-) নেগেটিভপজিটিভ কিনা মিলাতে হয়। দাতার রক্ত স্ক্র্যানির করে দেখতে হয় অন্য কোনও রোগ আছে কিনা যেগুলি নিষিদ্ধ। বয়সের একটা ফ্যাক্টর আছে। কিছু কিছু গ্রুপ আছে দুষ্প্রাপ্য। গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, একটা রোগীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন ওমুক গ্রুপ দরকার। আজকে এমনি একজন মানতাবাদী মহামানবের কথা বলবো যার রক্তে এমন একটা অ্যান্টিবডির সন্ধান পাওয়া গেছে যা দিয়ে লক্ষ লক্ষ শিশুর ও মানুষের জীবন বাঁচানো গেছে। যেখানে মানুষ রক্ত প্রদান করতে ভয় পায় মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে গেলে তাৎক্ষণিক রক্তের দরকার তবুও রক্তের বিরাট সংকট হয়সেখানে ঐ মহামানব ৮১ বৎসর বয়সেও রক্ত দিয়ে লক্ষ প্রাণ বাঁচিয়েছেন। অকাতরে বিনা পয়সায় রক্ত দিয়ে গেছেন। তিনি হলেন অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা ‘জেমস হ্যারিসন।’ তিনি ২০১৮ সাল পর্যন্ত যখন তাঁর বয়েস ৮১ বৎসর, ২৪ লক্ষ শিশুর জীবন বাঁচিয়েছিলেন। বিশ্বের একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ভাবলে অবিশ্বাস্য মনে হয়। এই বিশ্বে প্রতিনিয়ত সুপার ন্যাচারেল ঘটনা ঘটে যাচ্ছে যেগুলি সাধারণের চিন্তার বাইরে। তবে সেই ব্যাপারে সবাইকে অবাক থাকতে হবে। শরীর বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তা করলে আমাদের শরীরে ‘ইম্পিউন শক্তি বলে একটা শক্তি আছে যেটা দিয়ে মানবদেহ বহিঃশত্রুর বা দেহের ভেতরের শত্রুর মোকাবেলা করে। যাদের এই শক্তি দুর্বল তারা ঘন ঘন রোগাক্রান্ত হয়। সেই মহৎশক্তি অ্যান্টিবডি। ‘জেমস’ মাত্র ১৪ বৎসর বয়সে তার জীবন রক্ষার্থে এক বার রক্ত নিতে হয়। বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা ধারণ করেছিলেন জেমসকে দেওয়া রক্তের দ্বারা তার রক্তে কোন বিশেষ পরিবর্তন হয়েছিল। সেইটাই অহঃরউ যা লক্ষ প্রাণ বাঁচিয়েছে। ‘জেমস’ পূর্ণাঙ্গ বয়স হওয়ার পর থেকে সে নিয়মিত রক্ত ডোনেট করতো। যেমন একজন গর্ভবতী মায়ের শরীরে যদি রেসিস নেগেটিভ রক্ত (Rh-ve) থাকে এবং গর্ভে থাকা শিশুর শরীরে যদি রেসিস পজিটিভ (Rh-ve) রক্ত থাকে তাহলে ঐ সন্তানের মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ মায়ের শরীরের (Rh-ve) রক্ত থেকে এমন এক ধরনের Anti Body তৈরী হয় যা শিশুর শরীরের রক্তের লোহিত রক্ত কণিকা (R.B.C) যেটা অক্সিজেন বহন করে (৩ মিনিট না পেলে ব্রেইন ডেমেজ হয়ে যায়) তাকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে শিশুর মস্তিষ্ক দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন কি শিশু মারা যেতে পারে। এই শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শিশুটিকে জন্মের সাথে সাথে Anti-D ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়। এবার চিকিৎসকেরা কয়েক বছর পর যখন জানতে পারলো ‘জেমস হ্যারিসনের’ রক্তে মহামূল্যবান অ্যান্টিবডি-D আছে, অদ্ভুত ধরনের রোগ প্রতিরোধ Antibody -D থাকায় সেটি দিয়ে Anti-D নামের জীবন রক্ষাকারী ইনজেকশ তৈরী করা শুরু করলো অস্ট্রেলিয়ান ওষুধ প্রশাসন। বেঁচে রইল লক্ষ প্রাণ। এখন এটা জানার আগে ‘জেমস’ সরাসরি মানুষদের রক্তদিত। তার কাছে মহামূল্যবান Anti body-D আছে জানার পর জেমস সরাসরি রক্তদান বন্ধ করলো। সেই থেকে শুধু Anti-D ইনজেকশন তৈরির জন্য রক্ত দিত। আরও একজন রক্তদাতার নাম উল্লেখ না করলে নয় আমেরিকার একটা স্টেইটআলবার্টায় এক নারী ‘জোসেখাইন মিচালুক; ৮০ বছর বয়সী এই নারী ১৯৬৫ সালে ২২ বছর বয়স থেকে রক্তদান শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ২০৩ ইউনিটের উপরে রক্তদান করেছেন। এখানে সবচেয়ে মূল্যবান কথা বলে রাখি। আমাদের দৈনন্দিন প্র্যাক্টিসে দেখতে পাই প্রচুর মা ((Rh-ve); শিশু ((Rh+ve) রক্ত পাই। তাই ডাক্তারদের বলে রাখুন যেন সঠিক সময়ে Anti-D ইনজেকশন দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এই ইনজেকশন বাজারে সহজ লভ্য। আমি জানি সংশ্লিষ্ট গাইনোকলিজস্ট সিজারিয়ান অপারেশনের পরপরই আম্বি লিক্যাল কর্ড (মাতৃ সংযোগকারী নারী) থেকে রক্ত সংগ্রহ করে এবং ইনজেকশনের ব্যবস্থা করে। ‘ডাঃ ফল কেনি’ বলেনজেমসের রক্তে অসাধারণ প্রকৃতির। অস্ট্রেলিয়াতে তৈরি হওয়া Anti-D ইনজেকশন প্রতিটি ব্যাচই তৈরী হয়েছে জেমস হ্যারিসনের রক্ত থেকে। আমাদের দেশে কতজন মায়ের শরীরে Rh-ve) আছে পরিসংখ্যান নেই। অস্ট্রেলিয়াতে প্রতি ১০০ জনে ১৭ জন নারী এ ধরনের ঝুঁকিতে। ‘জেমস’ নিজের মেয়েকেও ইনজেকশন Anti-D দিতে হয়েছে। করোনাকালে ২০২০ সালে হলিউড মেঘাস্টার ‘টম হকস’ এবং স্ত্রী ‘বিটা মার্চ’, করোনা আক্রান্ত এবং চিকিৎসায় সুস্থ হন। যেহেতু সুস্থ হয়েছেন তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরী হয়েছে। এটা জানার পর তারা ঠিক করলো “আমাদের রক্ত ভ্যাকসিন তৈরীতে ব্যবহার করা যাবে।” তাই তারা রক্তের প্লাসমা (তরল অংশ) দান করতে প্রস্তুত হয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো। ‘জেমস’ মহামূল্যবান রক্তের অধিকারী হয়েও আজীবন বিনামূলে রক্ত দান করে গেছেন। তাঁর ৮১ বৎসর বয়সে তিনি অবসর নিয়েছিলেন। তিনি আহ্বান করেছিলেন যাদের এ ধরনের রক্ত থাকে তা যেন দেশের মানুষের কাজে লাগায়। এই মহামানবের জন্য রাষ্ট্র তাকে সর্বোচ্চ সম্মান পদক দিয়েছিল। রক্ত দেওয়া মহৎ কাজ। ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। রক্ত দেওয়ার যোগ্য হলে কেবল রক্ত দেওয়া যায়। লোহিত কণিকার বয়স ১২০ দিন। প্রতিনিয়ত সেটা দেহে তৈরী হচ্ছে।

লেখক: প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট,

বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅধুনালুপ্ত কিছু আঞ্চলিক শব্দ ও প্রবাদ বাক্য
পরবর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে