বৈচিত্র্যমণ্ডিত পাহাড়, টিলা, নদী, খাল ও সাগর পরিবেষ্টিত উর্বর মৃত্তিকার অপূর্ব সংমিশ্রণে গঠিত বাংলাদেশের অনন্য একটি জেলা আমাদের চট্টগ্রাম। বার আউলিয়ার পুণ্যভুমি এ চট্টগ্রাম। এ অঞ্চলের নাম চট্টগ্রাম এর উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিক গণের নানা মত ও পার্থক্য থাকলেও যে কিংবদন্তী প্রচলিত আছে তা বড়ই অদ্ভুত। একসময় এতদঞ্চল জ্বীন পরিদের একচ্ছত্র দখলে ছিল বলে প্রকাশ। একদা বারোজন পীর আউলিয়া এ শ্যামলদেশে এসে ইসলাম ধর্মের প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন এবং জ্বীন পরিদের কবল থেকে এ অঞ্চলকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে প্রদীপ জ্বালান, ধীরে ধীরে সে প্রদীপের আলো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে দলে দলে জ্বীন পরিরা এখান থেকে অন্যত্র চলে যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি সম্পর্কে ইতিহাসবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নানা মত ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করা আছে।
কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পূর্ব তীর হতে নাফ নদীর উত্তর পাড়ের মধ্যবর্তী হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ অধিবাসী অধ্যুষিত বাংলাদেশের অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এ অঞ্চলটি প্রাচীনকালে কিছু সময় ছাড়া অধিকাংশ সময় আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। চট্টগ্রামের মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি, সামাজিক আচার আচরণ ও মুখের বুলির বৈচিত্র্যময় হওয়ার অন্যতম কারণ হল অষ্টিকাদী, ভোটচীনা, কিরাত ও সেমিষ্টিক গোত্রীয় রক্তের সংমিশ্রণে চাঁটগাইয়া জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি তাই বাংলাদেশের অন্যসব জেলার চাইতে চট্টগ্রামের ভাষা বৈচিত্র্যময় ও ভিন্ন।
পর্বতমালা বিধৌত নীল সাগর মেখলা পলল মাটির স্তরে গঠিত চট্টগ্রামের প্রকৃতি যেমন নানা বৈচিত্র্যে ভরপুর তেমনি বৈচিত্র্যমণ্ডিত এ অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতি ও লৌকিক আচার অনুষ্ঠান। চট্টগ্রামের হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর লৌকিক আচার অনুষ্ঠান সমূহকে সাধারণতঃ পুরাণ হাস্তর বা শাস্ত্র নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। বহু প্রাচীন কাল থেকে চট্টগ্রামের লোকেরা জন্ম, বিয়ে মৃত্যু ও দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় সেই হাস্তর বা শাস্ত্রের অনুসরণ করে আসছে। বর্তমান শতাব্দীর এই যুগ সন্ধিক্ষণে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসার লাভ ও তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়নে এ সব শাস্ত্র বা হাস্তর পালনের রশিটা কিছুটা ঢিলে হলেও তা একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি। বলা যায় শিক্ষিত অশিক্ষিত সকল শ্রেণির মানুষ আজও সেই নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কিছু কিছু শব্দ যা একসময় কথ্য ভাষা হিসেবে এ অঞ্চলের মানুষের মুখের বুলি ছিল তা কালক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে ধীর লয়ে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে প্রমিত ভাষার ব্যবহার এবং সচেতনতা ও চর্চার অভাবে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অনেক কথ্য শব্দ। এ অঞ্চলের ভাষার ৭০% শব্দই আর্যভাষা থেকে আগত বাকী ৩০% শব্দ অনার্য ভাষার। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর আরবী, ফার্সী, পর্তুগীজ ও তুর্কী ভাষার সমাহার ঘটেছে। ইন্দো–ইউরোপিয়ান ভাষা বংশের কিছু কিছু শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়।
আমাদের গ্রামে গঞ্জের আধুনিক কালের শিশু, কিশোর ও তরুণদের মাঝে লুপ্তমান আঞ্চলিক শব্দের কিছু কিছু ব্যবহার লক্ষ্য করা গেলেও নগর জীবনে সিংহ ভাগ পরিবারে এসবের চর্চা নেই বললেই চলে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মানুষ যারা পেশাগত কারণে অন্য জেলায় বসবাস করেন তাদের পরিবারে চাটগাঁইয়া ভাষার ব্যবহার নেই এমন কি এই চট্টগ্রাম নগরে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে অনেক মানুষ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে না যার প্রভাব পড়েছে তাদের সন্তান সন্ততির উপর। সারা বিশ্বের ১ কোটি ৩০ লাখ আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অবস্থান ৮৮তম। সুতরাং কিছুতেই এ ভাষাকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। আমি কিছু লুপ্তপ্রায় আঞ্চলিক শব্দের উল্লেখ করছি যেমন ‘কোটারা’(বাটি),‘সালুন’(তরকারী),‘বসখানা’, (রান্নাঘর), ‘খাক্কা’ (খালা), ‘হুনি/ওনি’ (শুটকি),‘পুরঅইন’(ঝাড়ু),‘ডরবু’ (বড়বোন), ডরবা’ (জেঠা বা বড় চাচা),‘গরবা’ (মেহমান বা অতিথি), ‘ডরমা’ (জেঠিমা)‘গুরা বা’ (চাচা),‘গুরা মা’ (ছোট চাচী), ‘মাইজ্যামা’ (মেজ চাচী),‘তঁসা’ (তামাশা),‘মোগ’ (বউ), ‘ছুনছুইন্যা মিডা‘ (খুবই মিষ্টি),‘বেয়ান বেলা’ (সকাল বেলা), ‘হাজইন্যা বেলা’ (সন্ধ্যা বেলা), ‘লোডা’ (বদনা), ‘দাউরগ্যা’ (জ্বালানী/লাকড়ী), ‘কওরগা তেল’ (সরিষার তেল) ,‘ ‘দোয়াডি‘ (শীত বস্ত্র/শাল), ‘চেয়ইজ্যা পোয়া’ (এতিম বালক), ‘চিক্কা’ (মাচান), ‘ওড়ুম’ (মুড়ি), ‘টেঁরা’ (ছোটখোপ যুক্ত বাঁশের বেষ্টনী), ‘জলি/বেড়া’ (বাঁশের তৈরী বেষ্টনী), ‘ছলই’(দিয়াশলাই),‘জলই’(পেরেক), ‘মাইল্যাপিরা’ (ম্যালেরিয়া রোগ),‘বঅটা‘(পতাকা), ‘বচ্চু’ (চকোলেট), ‘কউচ্যা’ (সবুজ), ‘থোঁয়ারা’ (মুখাবয়ব),‘গোঁজা’ (কাঁটা),‘দুরুস কুরা’ (আস্ত মোরগ বা মুরগির রোস্ট),‘পঅরগেজা’ (লাথি), ‘ছেপ’ (থুথু),‘জেব’ (পকেট), ‘নেক’ (স্বামী বা জামাই) ইত্যাদি। এছাড়া আরও অনেক শব্দ আছে যা একসময় আমাদের গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক প্রচলিত ছিল। চট্টগ্রাম জেলার এক এক জায়গায় একেক রকম আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারের ভিন্নতা দেখা যায়। বিশেষ করে শহুরে জীবন আর গ্রামীণ জীবনে আঞ্চলিক ভাষার উচ্চারণে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
চট্টগ্রামের প্রবাদ–প্রবচন এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য, সাংস্কৃতি ও কৃষ্টির এক অমূল্য সম্পদ। প্রবাদ– প্রবচনগুলো ছন্দোময়, রূপক ও সুন্দর ভাষা মণ্ডিত হওয়ায় তা শ্রুতিমধুর হয়। আমি কয়েকটি প্রবাদ– প্রবচন উল্লেখ করছি যেমন– ‘এক মুইক্কার পাতত্ ভাত, দুই মুইক্কার কোয়ালৎ হাত’ এখানে মুইক্কা হলো বিবাহিত পুরুষ এক মুইক্কা হলো একজন মহিলার স্বামী ব্যাখ্যা করলে যা হয় তাহলো এক স্ত্রী থাকলে যে শান্তি গৃহে থাকে দুই স্ত্রীতে তা সহজে মিলে না। ‘ঘাট পার অইলে ঘাট্টইল্যা হালা’, ‘ছঅল নাচে খুঁডার বলে, বেডি নাচে নেকের বলে’। ‘যে কুঁরি বদা পারে, হেই কুঁরির পোঁদে জানে’, ‘আল্লাহর ধন অফুরানী, বান্দার ধন খোয়ার পানি’, ‘কডে আসমানর তারা, কডে জইনর নারা’, ‘যাইচ্চা কেলা মিডা নাই’ (সেধে দেওয়া কলা মিষ্টি হয় না) তেমনি আরও অনেক প্রবাদ–প্রবচন রয়েছে যা ধীরে ধীরে লোকমুখে হারিয়ে যেতে বসেছে। অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার লুপ্তপ্রায় শব্দ সমূহ সংগ্রহ ও যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে হয়তো এমন দিন আসবে যেদিন এভাষার ঐতিহ্য ও গুরুত্ব হারিয়ে যাবে চিরতরে, সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যাবে এর চর্চা ও ব্যবহার।
লেখক: সভাপতি, নবীনমেলা।












