বিদ্যুৎ-বৈষম্য : বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধা কোথায়

ড. নারায়ন বৈদ্য | মঙ্গলবার , ২১ জুলাই, ২০২৬ at ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে সমগ্র বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে শহরাঞ্চলে অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ ছিল না। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে সবেমাত্র নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছি। রাউজান থানার ১৪নং বাগোয়ান ইউনিয়নের গশ্চি গ্রামে অবস্থিত ‘গশ্চি হাই স্কুল’ টি ছিল আমার একান্তই আপন একটি স্কুল যে স্কুলের মাধ্যমে ১৯৭৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম। সে সময়ের স্মৃতি এখনও মানস চক্ষে স্পষ্ট। আমরা আট ভাইবোনের মধ্যে যাতে লেখাপড়ার কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সে বিষয়ের ওপর ছিল মায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বড় সংসারে আমাদের পরিবারটি অধিক সচ্ছল না হলেও একান্তই দরিদ্র ছিল না। এ কারণে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এলাকার অধিকাংশ পরিবার বিভিন্ন প্রকারের সরকারি সাহায্য পেলেও আমাদের পরিবার এমন সাহায্য পেয়েছে বলে আমার মনে নেই। তবে বাবা যেহেতু শহরে চাকুরি করতেন সেহেতু মা পরিবারের আট ভাইবোনের পড়াশোনা সম্পর্কে সব সময় সজাগ থাকতেন। যখন আমি দশম শ্রেণিতে উঠলাম, আমার পড়াশুনার গতি আরো বৃদ্ধি করার প্রয়োজনে মা একজন প্রাইভেট শিক্ষকের কথা চিন্তা করলেন। তখনকার সময়ে বাড়িতে গিয়ে কোনো স্যার প্রাইভেট পড়াতেন না। আমাদের গ্রামে সকল ছাত্রের জন্য একজন প্রাইভেট শিক্ষক ছিলেন। এ শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরুর নাম ছিল ‘নরেশ স্যার’। আমাদের এলাকায় যত ছেলেমেয়ে স্কুলের গন্ডি পার করেছে তার অধিকাংশই নরেশ স্যারের ছাত্র। তিনি সকাল সাতটা থেকে নয়টা ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত আমাদের এলাকার প্রাইমারি স্কুলের একটি রুমে পড়াতেন এক সাথে প্রায় বিশ পঁচিশ জন ছাত্রছাত্রী। আর বিকালে পড়াতেন রাত্রে স্যারের বাড়িতে। দশম শ্রেণিতে উঠে মা নরেশ স্যারের কাছে আমাকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। যতটুকু মনে পড়ে, স্যারের প্রতি মাসের বেতন ছিল ১২ টাকা। তবে স্যার আমাদের পরিবারের প্রতি অতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে আমার কাছ থেকে নিতেন নয় টাকা। ১৯৭২ সালের মার্চ মাস থেকে স্যারের কাছে যাওয়া শুরু করেছি। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে একটি হারিকেন, পর্যাপ্ত বই ও রাত্রে খাবার জন্য তিনটি রুটি (মা প্রস্তুুত করে দিত) এবং সকালের জন্য দুইটি রুটি নিয়ে যেতাম। সন্ধ্যা সাতটা থেকে স্যারের টিনশেড ঘরের সাথে লাগানো বড় খোলা বারান্দায় আমরা প্রায় পাঁচজন হারিকেন জ্বালিয়ে ছালার চট বিছিয়ে মাটিতে বসে স্যারের তত্ত্বাবধানে বিদ্যা অভ্যাসে লিপ্ত হতাম। রাত দশটা পর্যন্ত পড়াশুনা করে স্যারের মাটির কোটার উত্তর পার্শ্বের ঘরটিতে আমরা মাটিতে বিছানা করে শুয়ে পড়তাম। অবশ্য শোয়ার জন্য বিছানা, বালিশআমরা প্রত্যেকে নিয়েছি। তখনও গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল না। সন্ধ্যা ৭:০০ টা থেকে রাত ১০:০০ টা পর্যন্ত এ সময়ে উচ্চ স্বরে পড়াশুনা, স্যারের লম্বা ভিটায় একটিমাত্র ঘরকে আনন্দময় করে রাখতো। আর রাত ১০:০০টা সে তো গভীর রাত। আমাদের কাছে কোন ঘড়ি ছিল না। বারান্দায় পড়াশুনা করতে করতে যখন কালুরঘাট কারখানায় সাইরেন শুনতাম তখন ধরে নিতাম রাত ১০:০০ টা। এরপর আমরা শুয়ে যেতাম। অবশ্য রাতের খাবারটা ৮:০০ টার দিকে খেয়ে নিতাম। সকালে উঠে মুখ ধুয়ে দুইটা রুটি খেয়ে আবার ঐ বারান্দায় চট বিছিয়ে স্যারের তত্বাবধানে উচ্চ স্বরে পড়াশুনায় লেগে যেতাম। সূর্যের আলোতে ঘরের ছায়া কতটুকু আসলে আমাদের চলে যাবার সময় হতো তা আমরা বুঝতাম। তাড়াতাড়ি বাড়ি এসে স্নান করে দ্রুত স্কুলে চলে যেতাম। ঘড়ি না থাকা সত্ত্বেও কোনোদিন স্কুলে উপস্থিত হতে দেরি হতো না। স্কুলেও কোনো বিদ্যুৎ এর জোগান ছিল না। অতএব ক্লাসরুমে সিলিং ফ্যানের কোনো প্রশ্নই আসে না।

সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশে বিদ্যুৎ এর জোগান দেয়া হয়েছে। যেহেতু বিদ্যুৎ হচ্ছে মানব সভ্যতার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অংশ সেহেতু ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে চলছে। আর মানব সভ্যতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ। সমগ্র বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, উৎপাদন ও বণ্টন করে থাকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সংক্ষেপে বিপিডিবি (BPDB) নামে পরিচিত। কোনো কোনো সময় পিডিবিও বলে থাকে। বাংলাদেশের গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করার জন্য ১৯৭৮ সালে আমেরিকান রুরাল মডেল (এনআরইসিএ) অনুসরণে গঠিত হয় ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড’। এই বোর্ডের অধীনে এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য গঠিত হয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নতুন সংযোগ, সরবরাহ, বিল সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে সমগ্র গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করে থাকে। এখানেই বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার মূল কেন্দ্র।

২০২৬ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। অথচ এই সময়ে গড়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার মেগাওয়াট। উক্ত সময়কালে এক রাতে পিডিবি কর্তৃক লোডশেডিং নথিভুক্ত হয়েছে ৩ হাজার ২৭৫ মেগাওয়াট। আর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নিজস্ব হিসেবে ঐ রাতে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। ইহার অর্থ দাঁড়ায় যে, ঐ রাতে লোডশেডিং এর ৮৪ শতাংশই হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের এ কেমন বৈষম্য। শহরের বাবু সাহেবরা আরামে আয়েশে যাতে দিন যাপন করতে পারে তার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করেছে পিডিবি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

উৎপাদনের দিক থেকেও পিডিবির ব্যর্থতা রয়েছে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পিডিবি এর বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। পিডিবি চুক্তিভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনে। কিন্তুু বকেয়া থাকায় কেন্দ্রগুলো নিয়মিত উৎপাদন চালাতে পারছে না। প্রয়োজনীয় কয়লা ক্রয় করতে না পারায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাওনা থাকার কারণে ৬০০ মেগাওয়াট ও রামপালে কারিগরি ত্রুটির কারণে আরও ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ৪৫০ মেগাওয়াট হলেও গড় উৎপাদন হয় মাত্র ৩৫ মেগাওয়াট। তেলচালিত কেন্দ্রগুলো মোট সক্ষমতার এক চতুর্থাংশ সরবরাহ করছে। এসব কেন্দ্রের পাওনা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এ থেকে উৎপাদন ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠে। আর এ জাতীয় উৎপাদন ঘাটতির প্রধান ভুক্তভোগীরা হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষ। তাই শহরে যারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ভোগ করছে তারা এই অভিঘাত কিছুতেই অনুভব করতে পারবে না। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা হচ্ছে গ্রামাঞ্চল, সেহেতু দেশে সরবরাহকৃত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫৭ শতাংশ গ্রামীণ অঞ্চলে পল্লীবিদ্যুতের মাধ্যমে যায়। কিন্তু লোডশেডিং এর ক্ষেত্রে মোট লোডশেডিং এর ৮৪ শতাংশই দেয়া হয় গ্রামাঞ্চলে। এ কেমন বৈষম্য?

এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং এর কিছু তথ্য আমার হাতে এসেছে। গ্রামে লোডশেডিং এর এই কাহিনী আরো হৃদয়বিদারক। নেত্রকোণায় দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, ময়মনসিংহে রাতে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে প্রায় ৮৭ মেগাওয়াট। আর বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় ৪৮ মেগাওয়াট। দিনাজপুরে যেখানে চাহিদা ৩৩ মেগাওয়াট সেখানে সরবরাহ করা হয় ১৮২০ মেগাওয়াট। কক্সবাজারের টেকনাফে দিনে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। আর রাতে কোনো কোনো সময় এক নাগাড়ে ৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে। এসব আলাদা আলাদা ঘটনা একত্র করলে দেখা যায়, গ্রামে গ্রামে চাহিদার অর্ধেকও বিদ্যুৎ না পাওয়া এক স্বাভাবিক ঘটনা। গ্রামের দারিদ্র জনগোষ্ঠী এ ব্যবস্থাকে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হিসেবে মেনে নিয়েছে। কখনো কখনো দুই এক জায়গায বিদ্যুতের জন্য কিছু দাবি উত্থাপিত হলেও তা শহরের বাবু সাহেবদের কানে পৌঁছায় না।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল এখন দ্বিমুখী বৈষম্যের শিকার। একদিকে জাতীয় জ্বালানিসংকট জনিত লোডশেডিং অব্যাহত রেখে বিদ্যুৎবৈষম্য করা হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্বল অবকাঠামো বলে গ্রামের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর দোষ চাপাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বৈষম্যের বিষয়টিকে প্রকান্তরে অস্বীকার করছে কর্তৃপক্ষ। জাতীয় পর্যায়ের সংকট অস্বীকার করতে গিয়ে নীতি নির্ধারকেরা অবকাঠামোগত সংকটকে সামনে হাজির করছেন। অথচ দায় কার। কীভাবে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপকার করা যায়, কীভাবে সংকট নিরসন করা যায় এবং বিদ্যুৎবৈষম্য থেকে মুক্তি ঘটানো যায়তা রয়ে গেছে সম্পূর্ণ আলোচনার বাইরে। মনে রাখতে হবে, গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। কারণ জাতীয় আয়ের সিংহ ভাগের জোগান আসে এই গ্রাম থেকে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীরা কেন ঝরে পড়ছে- কারণ খোঁজার এখনই সময়
পরবর্তী নিবন্ধবেসরকারি হাসপাতালে নতুন চিকিৎসকদের ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের প্রস্তাব