১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা–এর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারত উপমহাদেশে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে পরাধীনতার অন্ধকার নেমে আসে। সেই বেদনা থেকেই সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন
“স্বাধীনতা–হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব–শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।
কোটি কল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে, নরকের প্রায়!
দিনেকের স্বাধীনতা, স্বর্গ–সুখ তায় হে, স্বর্গ–সুখ তায়!”
একটি প্রচলিত প্রবাদ ছিল “ব্রিটিশদের সূর্য কখনো অস্ত যায় না।” অর্থাৎ পৃথিবীর এক দেশে সূর্য ডুবলেও অন্য দেশে সূর্য উঠত, আর সেই দেশটিও থাকত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য–এর অধীনে। এমন শক্তিধর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধেই ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল জাতীয়বীর বিপ্লবী মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন–এর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ।
চট্টগ্রাম নগরীর দামপাড়া এলাকায় তৎকালীন পুলিশ ব্যারাকের অস্ত্রাগার দখল করে বিপ্লবীরা সেখানে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের ঘোষণা দেন। চার দিন স্বাধীন ছিল চট্টগ্রাম। পরে ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে তিন ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধে ৮২ জন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হন এবং ১২ জন বিপ্লবী শহীদ হন। সেদিন সূর্য সেনের নেতৃত্বে মাত্র ৬৫ জন তরুণ প্রমাণ করেছিলেন ব্রিটিশদের সূর্যও অস্ত যেতে পারে। উপমহাদেশের মানুষ প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে।
আজ অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে দেশপ্রেমিক ভাই ও বোনদের জানাচ্ছি যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৩০ সালের যুব বিদ্রোহ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ইতিহাসের মেলবন্ধন হিসেবে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে চট্টগ্রাম দামপাড়া পুলিশ লাইনের ঐতিহাসিক অস্ত্রাগারটি ২৪ মার্চ ২০২২ তারিখে সংরক্ষণ করে এবং এর নামকরণ করে “চট্টগ্রাম পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর”। আমরা বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের পক্ষ থেকে এই নামকরণের তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং তৎকালীন পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর সাহেবের কাছে ২ নভেম্বর ২০২১ তারিখে স্মারকলিপি প্রদান করে বিষয়টি তুলে ধরি যে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের এই মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে বর্তমান নামকরণের কোনো সাদৃশ্য নেই। সেই সময় আমরা প্রস্তাব করেছিলাম জাদুঘরটির নাম “চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ ও পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর” করা হোক। তিনি মৌখিকভাবে আমাদের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি, যা ইতিহাসের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে না। তাই সমগ্র বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক মানুষের পক্ষ থেকে ৯৭তম যুব বিদ্রোহ দিবসে বর্তমান সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, যুব বিদ্রোহের যথাযথ মর্যাদা প্রদর্শন করে অচিরেই “পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর”–এর নাম পরিবর্তন করে “চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ ও পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর” নামকরণ করা হোক। একই সঙ্গে জালালাবাদ পাহাড়ে শহীদ বিপ্লবীদের স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন এবং স্থানটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবিও জানাই। যুব বিদ্রোহ দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবিও আজ সময়ের প্রয়োজন।
আজকে আমাদের দেশের রাজনীতি যখন টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির সংকীর্ণতায় আবদ্ধ, তখন বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
একসময় পৃথিবীর মানচিত্রে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অপ্রতিরোধ্য দাপট; ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজ সেই আধিপত্যের রূপ যেন বদলে দাঁড়িয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ছায়ায়। শক্তির এই অসম ভারসাম্য যতদিন মানবজাতির ওপর বিস্তৃত থাকবে, ততদিন পৃথিবীর মানুষ অন্যায়, অত্যাচার ও গোলামির শৃঙ্খল থেকে প্রকৃত মুক্তির স্বাদ পাবে না।
মানুষের সত্যিকারের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার অবিচল ভিত্তি যেখানে কোনো জাতি, কোনো মানুষ আর অন্যের আধিপত্যের বোঝা বইতে বাধ্য হবে না।
পরিশেষে উইলিয়াম শেকসপিয়ার–এর অমর বাণী স্মরণ করি– “Cowards die many times before their death, but the valiant dies only once” দুর্বলেরা মৃত্যুর আগে বহুবার মরে, কিন্তু নির্ভীকরা জীবনে একবারই মৃত্যুবরণ করে। বিপ্লবীদের মৃত্যু নেই তাদের আত্মত্যাগ চির অম্লান থাকবে মানুষের হৃদয়ে।
লেখক: প্রকৌশলী; সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ, চট্টগ্রাম।














