হল্যান্ড থেকে

হাঙ্গেরির নির্বাচন: দীর্ঘ ১৬ বছর পর ভিক্টর ওরবানের ভূমিধস পরাজয়: ইউরোপে স্বস্তির নিঃশ্বাস

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ

স্কুল বয়সে ‘দানিয়ুব’ এর নাম শুনেছিলাম। রাশিয়ার ভলগা নদীর পর এটি য়ুরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। ভুপেন হাজারিকার আমি এক যাযাবর‘- এই জনপ্রিয় গানে ভলগানদীর উল্লেখ রয়েছে। তিনি গেয়েছেন– ‘আমি গঙ্গার থেকে মিসিসিপি হয়ে ভলগার রূপ দেখেছি। আজ দানিয়ুবের তীরে বিজয়ানন্দের বন্যা বইছে। গেল রোববার ১২ এপ্রিল হাঙ্গেরিতে যে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো তাতে যে ফলাফল তাকে ঘিরে আনন্দের বন্যা কেবল দানিয়ুবের তীরে নয়, এই আনন্দের বন্যা গোটা ইউরোপকে ছুঁয়েছে বললে এতটুকু বাড়িয়ে বলা হবেনা। কেননা এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে যে কেবল বিগত ১৬ বছর ধরে অগণতান্ত্রিক চরম ডানপন্থী নেতা ভিক্টর ওরবানের ভূমিধস পরাজয় হয়েছে তা নয়, তার পেছনে যে দুই পরাশক্তির অতি ক্ষমতাধর দুই ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভ্‌লাদিমির পুতিন ছিলেন তাদেরও এক ধরনের পরাজয় হয়েছে বলা চলে। কেননা তাদের উভয়ের পছন্দের প্রার্থী ভিক্টর ওরবান যাতে এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারে তার জন্যে নির্বাচনের আগে অতলান্তিক পাড়ি দিয়ে বুদাপেষ্ট এসেছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী। অস্বীকার করলেও ওনারা যে ওরবানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে এসেছিলেন তাতে কারো সন্দেহ ছিলোনা। সেই অভিযোগও করেছিলেন বিজয়ী প্রার্থী পিটার মাগিয়ার। ওরবান জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্র আরো সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসবেতেমন আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলোনা। কোন প্রলোভন টলাতে পারেনি ওরবানের একনায়কত্বে তিক্তবিরক্ত হাঙ্গেরির বৃহৎ জনগণকে। রেকর্ড পরিমাণ ভোটার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তারা ভূমিধস জয় ছিনিয়ে এনেছেন পিটারের জন্যে। সিএনএনের দীর্ঘ এক প্রতিবেদনের হেডলাইন ছিল, ”ট্রাম্প ও পুতিন তাদের পোস্টার বয়‘ (PosterBoy) কে হারালো। প্রতিবেদনটি আরো লিখেছে, ‘সামপ্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বিদেশিনির্বাচনে খুব কমই একই প্রার্থীকে সমর্থন করেছে। হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান ছিলেন এর ব্যতিক্রম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, তারা পরাজিত প্রার্থীকেই সমর্থন করেছিল।হোয়াইট হাউসের কাছে ডানপন্থী পপুলিস্ট মতবাদের পথপ্রদর্শকওরবানকে অধিকতর জাতীয়তাবাদী ও ‘সমমনা’ ইউরোপ গড়ার প্রচেষ্টার মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হতো। অন্যদিকে, ক্রেমলিনের কাছে, ইউক্রেনকে অস্ত্রসজ্জিত করা এবং রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানোর ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রচেষ্টার প্রধান বিনাশকারী ছিলেন ওরবান। কিন্তু বিধি বাম। তাদের স্বপ্নভঙ্গ হলো। হাঙ্গেরির জনগণ তাদের সে স্বপ্ন ভেস্তে দিলো -‘এক্সিট ওরবান, ইন মাগিয়ার

. যা অনুমান করা হয়েছিল তাই হলো। হাঙ্গেরির উগ্র ডান নেতা, প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান ক্ষমতাচ্যুত হলেন। তার এই নির্বাচনী ভরাডুবিতে হল্যান্ড সহ গোটা ইউরোপ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। য়ুরোপীয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও ভিক্টর ওরবান য়ুরোপকে দুর্বল করার জন্যে যাবতীয় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তার এই দীর্ঘ শাসনামলে। আর তার এহেন কাজকর্মের জন্যে তিনি প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন রুশ প্রধানমন্ত্রী পুতিন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। বলা বাহুল্য, ট্রাম্প এবং পুতিন উভয়েরই য়ুরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি এক ধরনের এলার্জি রয়েছে। দুর্বল য়ুরোপ মানে রাশিয়ার আধিপত্যবাদের জন্যে সোনায় সোহাগা। ইউক্রেন সহ ইউরোপের নানা সংকটময় মুহূর্তে ওরবান য়ুরোপের পক্ষে না গিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন পুতিনের পক্ষে। ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন মেরামতের কাজে গড়িমসি করে তার দেশে রাশিয়ার তেল সরবরাহ ব্যাহত করার অভিযোগে তিনি ইউক্রেনের জন্য ইইউএর ৭৮ বিলিয়ন পাউন্ডের একটি ইউরোপীয়ঋণ আটকে দিয়েছিলেন। কিয়েভ ওরবানের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এইভাবে ওরবান পুতিনকে সহায়তা করেছেন নানা সময়ে। তার বাধার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের সদস্যপদ লাভও বাধার মুখে পড়েছিল। ওরবানের একনায়কত্ব, স্বৈরাচারী নিয়মনীতি ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, পাশাপাশি তার উগ্র ডানপন্থী আন্দোলনকে প্রত্যাখ্যান করে হাঙ্গেরীয় ভোটাররা বেছে নিয়েছেন ৪৫ বছরের ইউরোপপন্থী পিটার মাগিয়ারকে। এবারের হাঙ্গেরিরনির্বাচন কেবল একটি ইউরোপিয় দেশের নির্বাচন ছিল না। এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে ছিল আমেরিকা, রাশিয়া সহ গোটা ইউরোপ। কেননা এই চাঞ্চল্যকর নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব রয়েছে গোটা ইউরোপে, বলা চলে বিশ্বজুড়ে। কেননা প্রোরুশ নেতা ওরবানের অনুসৃত নানা এন্টিইউরোপীয় পদক্ষেপের কারণে ইউরোপিয় ইউনিয়ন ইউক্রেন সহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঠিকমত এগুতে পারছিলোনা। আর দুর্বল ইউরোপ মানে শক্তিশালী রাশিয়া যা ইউরোপের মুক্ত উদার গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার জন্যে উদ্বেগের কারণ। তবে ইউরোপের জনগণ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও নিঃসন্দেহে নাখোশ হয়েছেন ওরবানের দুই পরম মিত্রমার্কিন প্রেসিডেন ট্রাম্প এবং রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট পুতিন।

. নির্বাচনে ওরবানের দলের বিপর্যয়ের সমূহ সম্ভাবনা ছিল বলে প্রাকনির্বাচনী জরীপে বলা হলেও অনেকের মধ্যে সংশয় রয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনের পরদিন ঘুম থেকে উঠে এই প্রত্যাশিত সংবাদে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না অনেক হাঙ্গেরীয়। তেমন মন্তব্য করলেন রাজধানী বুদাপেষ্টের নিউগাটি রেল স্টেশনের সামনে এক ছোট চত্বরে ৪০ বছরের গাবর। স্থানীয় সাংবাদিককে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সারারাত ধরে পার্টি করেছি। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা পাগলামি, আমি ধরে নিয়েছিলাম ওরবানের দল, ‘ফিদেজজিতে যাবে। তবে না, তেমনটি হয়নি। এখন আমি সত্যি আশাবাদী আমরা ইউরোপের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবো।আর এক ভোটার, ৩৭ বয়েসী ইভা বলেন, ‘আমি অত্যন্ত খুশি। তবে আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা যে এমনটি ঘটেছে। আজ সকালে আমি এমন কিছু ঘটনার জন্যেই প্রস্তুত ছিলাম যে তারা (ওরবান) হয়তো বলবে যে তারা বিপুল সংখ্যক ব্যালট খুঁজে পেয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফল বদলে দেবে। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে এটি সত্যি হতে পারে।বিশ্বাস না হবারই কথা। কেননা বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে ভিক্টর ওরবান দেশটিকে উদারনীতিবাদের (iliberalism) আঁতুড়ঘরেপরিণত করেছিলেন। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন এবং তারই ফলশ্রুতিতে গেল রোববার রেকর্ড সংখ্যক ভোটার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলেন বিরোধী দল, টিসা পার্টিকে (Tisza) ভোট দিয়ে দলটিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে। জনগণ ভূমিধস বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন পিটার মাগিয়ারের জন্যে। পিটার মাগিয়ারের নেতৃত্বে মধ্যডানপন্থী দলটি সংসদের ১৯৯টি আসনের মধ্যে ১৩৮টি আসন পেয়ে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ফলে মাগিয়ারের দল এখন চাইলে সংবিধান সংশোধন করতে পারবে এবং ভিক্টর ওরবান তার উদার গণতন্ত্রকে‘ (illiberal democracy) টিকিয়ে রাখার জন্যে যে সমস্ত নিয়ম নীতির প্রবর্তন করেছিলেন তা বাতিল করা সম্ভব হবে।

) অপেক্ষাকৃত তরুণ নুতন প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগিয়ার এক সময় ওরবানের দল, ফিদেজএর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। কেবল ২০২৪ সালের শুরুরদিকে তিনি দলটির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেন এবং দলের ভেতরে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনেন। এর কিছুদিন পর তিনি নিজের দল গঠন করেন। ততদিনে ওরবানের বিরুদ্ধেও জনমত গড়ে উঠেছিল। এই সুযোগ নিয়েছেন মাগিয়ার। দুর্নীতি এবং ভেঙে পড়া সরকারি সার্ভিস নিয়ে অসন্তোষের ঢেউ যখন বেড়ে চলে তখন মাগিয়ার দেশ জুড়ে ঘুরে বেড়ান এবং প্রচারণার সময় দিনে ছয়টি পর্যন্ত সমাবেশ করেন। তিনি হাঙ্গেরির জনগণকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে হাঙ্গেরির তিক্ত সম্পর্ক মেরামত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দেশের ভেঙে পড়া সরকারি পরিষেবা পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে মাগিয়ার বলেন, তার দল এক অভূতপূর্ব নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে যা তাদের নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করবে। তিনি আরো বলেন, ‘হাঙ্গেরির জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য ভোট দেয়নি, বরং শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তনের জন্য ভোট দিয়েছে। তিনি রাশিয়ার সাথেও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে চান। কেননা রাশিয়ার তেলের উপরও হাঙ্গেরি অনেকাংশে নির্ভর করে।

. ইউরোপ: পিটার মাগিয়ারজয়ে হাঙ্গেরির জনগণ যতটা খুশি তার চাইতে কোন অংশেই কম খুশি নন ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তনিও কস্তা হাঙ্গেরীয় জনগণের এই রায়কে গণতান্ত্রিক চেতনারলক্ষণ হিসাবে প্রশংসা করে বলেন, ‘ইউরোপকে আরো শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করার জন্যে তিনি পিটার মাগিয়ারের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রত্যাশা করছেন।অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রো বলেন, ‘এই ফলাফল ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল্যবোধের প্রতি হাঙ্গেরীয় জনগণের অনুরাগ প্রকাশ করেছে।স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এটিকে ইউরোপের জন্যেই একটি অর্জন বলে উল্লেখ করেন।জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ মন্তব্য করেন, ‘ভোটাররা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে স্বৈরাচারের দিকে কোন অপরিবর্তনীয় প্রবণতা (irreversible trend toward authoritarianism) নেই।পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক আরো এক ধাপ এগিয়ে এক্সএ একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন এই বলে, ‘আমি খুব খুশি এবং মনে হয় মাগিয়ারের চাইতেও বেশি খুশি আমি।এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া সহ গোটা ইউরোপ তাকিয়ে আছে পিটার মাগিয়ারের দিকে। দেখা যাক, পিটার মাগিয়ার কীভাবে, কত দ্রুত ওরবানের রেখে যাওয়া অগণতান্ত্রিকহাঙ্গেরিকে উদারগণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। (১৫২০২৬)

লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখাল বাঁচলে দেশ বাঁচবে
পরবর্তী নিবন্ধমায়ের শ্রমকে কাঠামোগত স্বীকৃতি দেয়া আজ সময়ের দাবি