এক সময় চট্টগ্রামকে বলা হতো সংস্কৃতির শহর। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারা প্রবাহিত হয়েছে তার নিজস্ব ঢঙে। এদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস কখনো চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে পরিপূর্ণতা পাবে না। বিশ এর দশকে সুরেন্দ্রলাল দাসের নেতৃত্বে আর্য সংগীতের শিল্পী দলের নিখিল বঙ্গ কংগ্রেস সম্মেলনে যোগদান ঐ সময়ে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। চট্টগ্রামের ‘প্রগতিলেখক সংঘের’ প্রতিষ্ঠা, কবিয়াল সমিতি গঠন, নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের সম্মেলন উপলক্ষে মানিক বন্দোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ সাহিত্যিক কবির আগমন, ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের অশান্ত পরিবেশে জনগণের মধ্যে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ভাব জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে নজরুল জয়ন্তী উদযাপন, প্রগতিশীল মাসিক পত্রিকা সীমান্ত প্রকাশের উদ্যোগ ইত্যাদি ঘটনার মধ্য দিয়ে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তবে চট্টগ্রাম নগরীর সাংস্কৃতিক বিকাশ মূলত পঞ্চাশের দশক থেকেই। সেই সময় চট্টগ্রাম কলেজ, রেলওয়ে ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউট, সেন্ট প্লাসিডস স্কুল, জে. এম. সেন হল প্রভৃতি রঙ্গমঞ্চে নিত্যনতুন অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। আর্য সঙ্গীত সমিতি (১৯০৬), সঙ্গীত পরিষদ (১৯৩৯), চট্টগ্রাম কৃষ্টি কেন্দ্র, প্রাচ্য ছন্দ গীতিকা এবং ছোট বড় আরো কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম শহরে সংস্কৃতি চর্চায় ব্রত ছিল।
১৯৪৭ সালের দিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেশ ক’জন প্রতিভাবান শিল্পী সাহিত্যিকের চট্টগ্রামে আগমন ঘটে। এঁদের মধ্যে উল্লেখ করতে হয় কথাশিল্পী শওকত ওসমান, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, ইবনে গোলাম নবী প্রমুখের নাম। এঁদের সাথে যুক্ত হলেন চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকর্মীরা। তাঁদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় মাহবুব উলুআলম চৌধুরীর সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে প্রথম প্রগতিশীল সাহিত্যপত্র ‘সীমান্ত’ এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্রমে তা হয়ে উঠে চট্টগ্রামের প্রবীণ–নবীন লেখক, সাহিত্যিক শিল্পীদের মিলন কেন্দ্র এবং তার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক আবুল ফজল, কবি ওহীদুল আলম, শুভাশীষ চৌধুরী প্রমুখ। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশে প্রধান কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠে ‘সীমান্ত’।
১৯৫০ সালের দিকে শিল্পী কলিম শরাফী গড়ে তুলেন নাট্য সমপ্রদায় ‘প্রান্তিক নব নাট্য সংঘ’। কবিয়াল রমেশ শীলকে সভাপতি করা হয়। ১৯৫১ সালে ১৬ই মার্চ মোমিন রোডস্থ হরিখোলার মাঠে সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন প্রখ্যাত পুঁথি সংগ্রাহক ও গবেষক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। উক্ত অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমন্ত্রিত শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সত্যেন মজুমদার, গীতিকার ও সুরকার ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সলিল চৌধুরী ও তাঁর দল, রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী সুখেন্দ গোস্বামী ও শ্রীমতি হেনা দে। স্থানীয় শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন কবিয়াল রমেশ শীল ও তাঁর দল।
দেশ বিভাগের পর চট্টগ্রাম শহরে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে আর্য সঙ্গীত ছিল একমাত্র প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ছিলেন সুরকর্তা সুরেন্দ্র লাল। অবশ্য পরবর্তীতে ‘প্রান্তিক’ নবনাট্য সংঘ সংস্কৃতি চর্চায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। প্রান্তিক গণসঙ্গীত ছাড়াও জীবন ঘনিষ্ঠ নাটক করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং দেশ বিভাগের পর সর্বপ্রথম স্ত্রী পুরুষের মিলিত অভিনয়ে কলিম শরাফীর পরিচালনায় ১৯৫২ সালের ১৪ই অক্টোবর এনায়েত বাজারস্থ ওয়াজিউল্লাহ রঙ্গ মঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে জবানবন্দী নাটক অভিনীত হয়। প্রান্তিক নাট্যকর্মীদের মধ্যে ছিলেন কলিম শরাফী, মাহবুব হাসান, অচিন্তকুমার চক্রবর্তী, মোহাম্মদ ছাদেক আলী, কাজী আলী ইমামসহ আরো অনেকেই।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ইতিহাস সমৃদ্ধ। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম গ্রুপ থিয়েটার গড়ে উঠার মধ্য দিয়ে নাটকের বিকাশ ঘটতে থাকে। বিশেষ করে মঞ্চনাটক ও পথনাটক। এর আগে শহরে বিচ্ছিন্নভাবে দু’একটি গ্রুপ অনিয়মিতভাবে মাঝে মধ্যে নাটক মঞ্চস্থ করতো মাত্র। চট্টগ্রাম গ্রুপ থিয়েটার গড়ে উঠার পর থেকেই শিল্পকলা একাডেমি ক্যাম্পাস কার্যত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়। এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরে বিশটিরও অধিক নাট্যগ্রুপ রয়েছে এবং তারা প্রতি বছরই নতুন নতুন নাটক মঞ্চস্থ করছে। প্রতিবছর নাট্যোৎসব হচ্ছে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রাম থেকে অনেক নাট্যগ্রুপ রাজধানী ঢাকা ও কোলকাতায় গিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। যে সমস্ত নাট্যগোষ্ঠী অধিকতর সক্রিয় এদের মধ্যে আছে : চট্টগ্রাম থিয়েটার, অরিন্দম, তির্যক, নান্দীকার, নান্দীমুখ, গণায়ন, মঞ্চমুকুট ইত্যাদি। এ সমস্ত নাট্যগোষ্ঠী চট্টগ্রাম শহরে সৃষ্টি করেছে অনেক নাট্যকর্মী ও দর্শক। জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত অনেক অভিনেতা চট্টগ্রামের এসব নাট্য গোষ্ঠী থেকে উঠে এসেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী চট্টগ্রাম শহরে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, আবৃত্তি সংগঠন ও নৃত্যকলা চর্চা, শিল্পুসাহিত্য সংগঠন। সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, চট্টল ইয়ুথ কয়ার, পলগ, ত্রিতরঙ্গ, উদীচী, খেলাঘর, পায়রা, ফুলকুঁড়ি, বন্ধন, অচিরা ইত্যাকার অনেক সংগঠন। আবৃত্তি চর্চার ক্ষেত্রে বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা, অনার্য অন্যস্বর, অঙ্গন নিয়মিত নতুন ধারার আবৃত্তি প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে এবং নিয়মিত আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে।
শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, ফুলকি, ললিতকলা একাডেমি, সঙ্গীত পরিষদ, আলাউদ্দিন ললিতকলা একাডেমি, আর্যসঙ্গীত, প্রবর্তক সংঘ, সঙ্গীত বিদ্যালয়, ইত্যাকার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবছর প্রশিক্ষণ নিয়ে বেরিয়ে আসছে অনেক সঙ্গীত শিল্পী ও নৃত্যশিল্পী। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্র–ছাত্রী জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। চট্টগ্রাম শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে বেগবান করার ক্ষেত্রে ইত্যাকার গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।
বলা বাহুল্য, শিশুসাহিত্যিক, কবি, লেখক, সংগঠক, উপস্থাপক, ফেলো, বাংলা একাডেমি ও সাংবাদিক রাশেদ রউফ এর হাত ধরে গড়ে উঠে চট্টগ্রামের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন চট্টগ্রাম একাডেমি। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম একাডেমির ২৫ বছর পূর্তি উৎসবকে ঘিরে সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ–উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগামী ৬, ৭ ও ৮ আগস্ট নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার রজতজয়ন্তী উৎসব উদযাপন করবে সংগঠনটি। গত ২৫ বছরে চট্টগ্রাম একাডেমি চট্টগ্রামের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। আঞ্চলিক, মরমি ও মাইজভাণ্ডারী গানে নবযুগ সৃষ্টি করেছেন আবদুল গফুর হালী। ‘মনের বাগানে ফুটিল ফুল গো’, ‘পাঞ্জাবিঅলা মনে বড় জ্বালারে’, অ শ্যাম রেঙ্গুম ন যাইও, কিংবা মাইজভাণ্ডারি গান ‘দেখে যারে মাইজভাণ্ডারি হইতাছে নূরের খেলা’ এমন অনেক জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা আবদুল গফুর হালী। শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব এবং শেফালী ঘোষকে বলা হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী। শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের জনপ্রিয় ও কালজয়ী গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বানুরে ও বানু, আর বাইক্যা টেঁয়া দে, ও জেডা ফইরার বাপ প্রভৃতি। শেফালী ঘোষের চিরসবুজ গানের মধ্যে রয়েছে ‘ও রে সাম্পানওয়ালা/ তুই আমারে করলি দিওয়ানা’, ‘ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত/ লুসাই পাহাড়ত্তুন লামি যারগই কর্ণফুলী’, ‘নাতিন বরই খা, বরই খা, আঁতে লইয়া নুন/ ঠেইল ভাঙ্গিয়া পইজ্জে নাতিন বড়ই গাছত্তুন’ ইত্যাদি। আরও একটি জনপ্রিয় গান আছে সঞ্জিত আচার্য্যের লেখা ও সুরে শেফালী ঘোষের গাওয়া, ‘ওরে কর্ণফুলীরে, সাক্ষী রাখিলাম তোরে।’ কিংবদন্তী এসব গুণী শিল্পীরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে তুলে ধরেছেন বিশ্ব দরবারে। তথ্যসূত্র : ১.আহমদ শরীফ: চট্টগ্রামের ইতিহাস, ২. আবদুল হক চৌধুরী: চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা; ৩. চৌধূরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি: চট্টগ্রামের ইতিহাস; ৪. হাজার বছরের চট্টগ্রাম, দৈনিক আজাদী, ৩৫ বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার।












