ভারত সরকার প্রায় দুই বছরের ব্যবধানে সম্প্রতি বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালু করেছে। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি যেয়ারতের উদ্দেশ্যে ভারতে যাবেন–এটাই স্বাভাবিক। তাঁদের মধ্যে আমাদের আজমগড়ী সিলসিলার অসংখ্য যেয়ারতকারীও থাকবেন। তাঁরা ভারতের উত্তর প্রদেশের গোন্ডায় যাবেন আমাদের দাদা পীর হযরত আলহাজ শাহ মাওলানা হাফেজ হামেদ হাসান আলভী (রহ.) (যিনি আজমগড়ী হযরত লকবে পরিচিত) এর যেয়ারত করতে।
তাঁদের প্রতি নিবেদন থাকবে, তাঁরা সেখানে অবস্থান করে যেয়ারত সম্পন্ন করে ফিরে আসবেন। ওখানকার যেয়ারতের ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো প্রকার সংস্কার বা নির্মাণের চেষ্টা যেন না করেন।
ভারতের উত্তরপ্রদেশের বিভাগীয় শহর গোন্ডায় শায়িত রয়েছেন হযরত আলহাজ শাহ মাওলানা হাফেজ হামেদ হাসান আলভী (রহ.)। উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলার বাসিন্দা হওয়ায় এই অঞ্চলে তিনি ‘আজমগড়ী হযরত’ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। তাঁর স্ত্রী ইন্তেকাল করেছেন। পুত্র ও পুত্রবধূ পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে বসবাসরত ছিলেন। তারাও ইন্তেকাল করে গেছেন।
অতি বৃদ্ধ বয়সে সেবাশুশ্রূষার প্রয়োজন হওয়ায়, ইন্তেকালের বছরখানেক আগে নিজের মেয়ে মোছাম্মৎ মছরুরা খাতুন এবং ভাগিনা ও জামাতা প্রফেসর ড. ইলতেফাদ আহমদ তাঁকে আজমগড় জেলার জন্মস্থান কোহন্ডা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে গোন্ডায় নিয়ে যান।
এখানে বছরখানেক মেয়ে ও জামাতা তথা ভাগিনার সেবাশুশ্রূষায় থাকার পর, ১৯৫৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রবিবার তিনি ইন্তেকাল করেন। ওই সময় যোগাযোগ ও যাতায়াত প্রতিকূল থাকাটা স্বাভাবিক। ফলে এই গোন্ডাতেই জামাতা তথা ভাগিনার নিজস্ব জায়গায় তাঁকে দাফন করা হয়। ইন্তেকালের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে যেয়ারতের উদ্দেশ্যে এ সিলসিলার অসংখ্য মানুষ গোন্ডায় যাওয়া–আসা করছেন। এরই মধ্যে আজমগড়ী হযরতের গোন্ডার বাড়ির কন্যা মোছাম্মৎ মছরুরা খাতুন এবং ভাগিনা তথা জামাতা প্রফেসর ড. ইলতেফাদ আহমদ ইন্তেকাল করেন। তাঁদের এই সংসারে ৩ পুত্র ৪ কন্যা। পুত্ররা হলেন–তিনবারের এমএলএ ফজলুল বারী, প্রফেসর জাফরুল বারী ও ডা. আবদুল বারী। বান্ডেল হযরত সৈয়দ সাহেব হুজুরের নামের সাথে মিলিয়ে আজমগড়ী হযরত এই কনিষ্ঠ নাতির নাম রাখেন আবদুল বারী। তিনি এলাকায় খুব পরিচিত ব্যক্তিত্ব; একাধিক স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সভাপতি এবং নিজ বাড়ির সামনের জামে মসজিদেরও সভাপতি। তিনবারের এমএলএ ফজলুল বারীর পাশাপাশি ডা. আবদুল বারীও একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ডা. আবদুল বারী বললেই সবাই তাঁকে এক নামে চেনে। তাঁদের বাড়ি থেকে ৭০০–৮০০ মিটার দূরে আজমগড়ী হযরতের সাদামাটা কবর রয়েছে।
এই আজমগড়ী সিলসিলায় সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস ও দরুদ শরিফ পড়ে মোরাকাবা বা ধ্যান করা তরিকতের অন্যতম নিয়ম। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে যেয়ারত করা ছাড়া বসে যেয়ারত করার সুন্দর ব্যবস্থাপনা নেই।
১৯৯৮ সাল থেকে আজমগড়ী হযরতের যেয়ারতের উদ্দেশ্যে গোন্ডায় যাওয়া–আসা হচ্ছে। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও আজমগড়ী সিলসিলার অসংখ্য মানুষ যেয়ারতের উদ্দেশ্যে গোন্ডায় যাতায়াত করছেন। সাথে পশ্চিমবঙ্গের বান্ডেল শাহ সৈয়দ আবদুল বারী আল হাসানী ওয়াল হোসাইনীর যেয়ারত তো আছেই।
বান্ডেল শাহ সৈয়দ আবদুল বারী হুজুরের কবর সংলগ্ন জামে মসজিদে সালমা–আদিল ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে আমার মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকার কাজ করা হয়। এতে আজমগড়ী সিলসিলার অনেকে আমার কাছে আবদার করেন, আমি যেন গোন্ডায় আজমগড়ী হযরতের যেয়ারতের সুবিধার্থে ন্যূনতম ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করি। সেই লক্ষ্যে ২০২৩ সালের নভেম্বরে পঞ্চম বারের মতো এমদাদ উল্লাহকে সাথে নিয়ে গোন্ডায় যাই বানারস, কোহন্ডা হয়ে।
আজমগড় জেলার এই কোহন্ডায় যেয়ারতে ২–৩ ঘণ্টা সময় দিয়ে আমরা সরাসরি গোন্ডায় চলে যাই। গভীর রাতে হোটেলে পৌঁছি। সাথে সালমা–আদিল ফাউন্ডেশনের পর্যাপ্ত অর্থ নিয়ে যাই। ডা. আবদুল বারীর সাথে দুই দফা বৈঠক করি। সাথে তাঁর বড় ভাই মরহুম ফজলুল বারীর বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার জিয়াউল ইসলাম। এখানে গ্রীষ্মকালে গরম বেশি তাপমাত্রা বেড়ে ৪৩–৪৪ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে। শীতকালে তীব্র শীত তাপমাত্রা ৪–৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে।
চারটি ছোট লোহার পিলার দিয়ে একটি ছাউনি এবং নিচে মেঝেতে বসার ব্যবস্থা থাকলে দূর–দূরান্ত থেকে আসা যেয়ারতকারীরা এখানে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টা বসতে পারতেন। দীর্ঘ সময় মোরাকাবা করতে পারতেন। কিন্তু ডা. আবদুল বারী এটি মানতে নারাজ। তাঁর যুক্তি হলো–তাঁর নানা আজমগড়ী হযরত সারাজীবন কঠোর শরিয়তের ভেতর থেকে তরিকত চর্চা করে গেছেন। তিনি শিরক ও বিদআতের ঊর্ধ্বে থাকতেন। এখানে নানার কবরের পাশে ন্যূনতম কোনো কিছু করলে শিরকের ছোঁয়া লাগবে। তাঁর বড় ভাইয়ের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার জিয়াউল ইসলাম অবশ্য কিছুটা নমনীয়।
ওই অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে অতি গরম ও শীতকালে অতি শীত অর্থাৎ আমাদের বাংলাদেশের মতো নয়, তাই এবার কিছু কাজ করার উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলাম। সেই লক্ষ্যে তিন রাত অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিই। পরপর দুই রাত তাঁর বৈঠকখানায় ভাতিজা জিয়াউল ইসলামকে নিয়ে দীর্ঘ সময় আলাপ করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকে হতাশ হতে হলো।
১৯৯৮ সাল থেকে তাঁকে বারবার দেখে আসছি। তিনি কেন জানি নানার মুরিদদের কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা হাদিয়া নেয়া খুব অপছন্দ করেন। বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে তাঁদের সংস্থার একটি গেস্ট হাউস আছে। সেখানেও নানার যেয়ারতে আসা লোকদেরকে থাকতে দিলে কোনো টাকা নেয়া হয় না। অন্যান্য যেয়ারতকারীদের পাশাপাশি আমার প্রতি তাঁর সম্মান ও আতিথেয়তা আমাকে অভিভূত করে। যতবার যাই, তাঁর বাসায় দুপুর বা রাতের খাবারের ব্যবস্থা থাকে। আমার জন্য গোস্তের পাশাপাশি মাছের ব্যবস্থা করেন। বলেন আপনারা বাঙালীরা মাছ পছন্দ করেন। রুটির সাথে ভাতের ব্যবস্থাও করেন। আমি অবশ্য তাঁদের তিন ভাইয়ের পরিবারের জন্য শুকনো খাবার ও ফলমূল নিয়ে যাই।
অবাক লাগছে যে, আমার প্রতি এত আন্তরিকতা ও সম্মান থাকার পরও নানার কবরে কোনো কিছু করার ব্যাপারে তিনি আমাকে ছাড় দিতে নারাজ।
ডা. আবদুল বারী নানার কথা বলতেই আবেগপ্রবণ হয়ে যান। তিনি বলেন, আমার নানা মুরিদদের টাকা–পয়সা সহজে গ্রহণ করতেন না। মুরিদরা পীরের সাথে মুসাফাহা করার সময় হাতের তালুর মধ্যে টাকা রাখতেন। আমার নানা এই টাকা নিতেন না। আমার নানা পৈতৃক জমিতে চাষাবাদ করে জীবন অতিবাহিত করে গেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ চলায় কথার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছোট খালার ছেলে যফরুল ইসলাম শৈশবে নানার সাথে বেশি সফর করেছেন। নানার জীবন নিয়ে আমার চেয়ে আমার খালাতো ভাই অনেক বেশি জানেন। তখন আমি বললাম, তাঁর সাথে দেখা না হলেও তাঁর সম্বন্ধে আমার কিছু জানা আছে। যেহেতু আজমগড়ী হযরত আমার পীর সাহেব গারাংগিয়া হযরত বড় হুজুরের কাছে প্রেরিত চিঠিপত্রে যফরুল ইসলামের কথা উল্লেখ রয়েছে। আমার রচিত ‘মকতুবাতে হামেদী–মজিদী’ গ্রন্থে এসব পোস্টকার্ড ছাপানো আছে।
ভগ্ন হৃদয়ে তিন দিন পর ট্যাক্সি নিয়ে গোন্ডা থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে লখনউ বিমানবন্দরে পৌঁছি। সেখান থেকে চণ্ডীগড় হয়ে সেরহিন্দ যেয়ারতে, অতঃপর দিল্লিতে পৌঁছি। পরদিন ট্যাক্সিযোগে অন্যান্য যেয়ারতের পাশাপাশি আজমগড়ী হযরতের নাতি যফরুল ইসলামকে দেখতে হাসপাতালে যাই। হাসপাতালের কেবিনে তিনি আমাকে পেয়ে আবেগ–প্রবণ হয়ে পড়েন। তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে মুসাফাহা করার সময় তিনি আমার হাত এমনভাবে ধরলেন যে ছাড়তেই চাচ্ছিলেন না। তাঁর নানা কর্তৃক গারাংগিয়া হযরত বড় হুজুরের কাছে পাঠানো একাধিক চিঠিতে তাঁর নাম উল্লেখ আছে সেই কার্ডের ছবি মোবাইলে তুলে তাঁর কাছে পাঠানোর জন্য তিনি আবদার রাখেন।
দিল্লিতে তিন দিন যেয়ারত শেষে আজমীর যাই। দুই–তিন রাত যেয়ারতে অবস্থান করার পর খুব ভোরে বন্দে ভারত ট্রেনে আজমীর থেকে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসি। সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে বিমানবন্দরে যাই। সন্ধ্যার ফ্লাইটে দিল্লি থেকে কলকাতায় চলে আসি। দুই রাত পর কলকাতা থেকে আকাশপথে চট্টগ্রাম পৌঁছি।
বস্তুতঃ আজমগড়ী সিলসিলা সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী, তবে উদার মতাদর্শ। কিন্তু কঠোর শরীয়তের ভেতর তরিকত। শুধু পীরের নিকট মুরিদ হলে চলবে না। মাগরিব, এশা, ফজর নামাজের পর তরিকতের আমল বাধ্যতামূলক। তৎমধ্যে এশারের নামাজের পর তরিকত মতে ৫০০/৯০০ বার দরূদ শরীফ পড়া বাধ্যতামূলক।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।












