পূর্ব পশ্চিমসহ দুনিয়ার দুয়ার খুলে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেড় বছর মেয়াদী একটি ফাস্ট–ট্র্যাক প্রকল্প হাতে নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে অগ্রসর হচ্ছে। বিমানবন্দরের অবকাঠামো সমপ্রসারণ, কার্গো পরিবহন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ট্রানজিট সুবিধা চালুর মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের সঙ্গে চট্টগ্রামের আকাশ যোগাযোগ বাড়ানোই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের জন্য পূর্ব এবং পশ্চিমমুখী সব দুয়ারই পুরোপুরি খুলে যাবে।
সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। এর আওতায় রানওয়ে সমপ্রসারণ, বড় আকারের উড়োজাহাজের জন্য পার্কিং সুবিধা, নতুন কার্গো ভিলেজ, কোল্ড–চেইন ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং আঞ্চলিক যাত্রী ট্রানজিট টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তা চেয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। প্রস্তাবিত ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব প্রজেক্ট’কে এডিবির ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট উদ্যোগের আওতায় নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে ইতোমধ্যে প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য প্রস্তাবটি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাবে রূপান্তরের বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে এগোচ্ছে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ছাড়া তেমন কোন ফ্লাইট এই বিমানবন্দর দিয়ে চলাচল করে না। অথচ এখান থেকে চীন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যন্ডসহ পূর্বমুখী দুয়ার খুলে দেয়ার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আগে এসব দেশের ফ্লাইট এখান থেকে চলাচল করতো। এসব ফ্লাইটে চট্টগ্রাম থেকে একজন যাত্রী পৃথিবীর যে কোন দেশের কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে পারতো। অথচ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যে কয়টি ফ্লাইট চলাচল করে সেগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খুব বেশি সুবিধা দিচ্ছে না।
সূত্র জানায়, সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বন্ধাত্ব ঘুচাতে চায়। শুরুতে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
খসড়া পিডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ধাপকে ‘কুইক–উইন ফেজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ধাপে এমন একটি কার্যকর আঞ্চলিক হাব গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যেখানে ওয়াইড–বডি (বড়) উড়োজাহাজ, ট্রানজিট যাত্রী এবং বাড়তি কার্গো পরিবহনের চাপ সামলানো সম্ভব হবে।
প্রথম ধাপে সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে এডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ বা সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। অবশিষ্ট ৭৫ মিলিয়ন ডলার সরকার ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সংস্থান করবে।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক ও হসপিটালিটি অবকাঠামো গড়ে তুলতে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে আরও ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিনিয়োগ ২০ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় হতে পারে। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমান রানওয়ের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার। দুটি বোর্ডিং ব্রিজ এবং ন্যারো–বডি (ছোট) উড়োজাহাজের জন্য ১১টি পার্কিং স্ট্যান্ডও রয়েছে। বিমানবন্দরটির বার্ষিক কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৪০ হাজার টন।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রানওয়ে শক্তিশালী করার পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ সমান্তরাল ট্যাঙিওয়ে ও র্যাপিড–এঙিট ট্যাঙিওয়ে নির্মাণ করা হবে। পর্যায়ক্রমে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৬০০ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ছয় থেকে আটটি ওয়াইড–বডি উড়োজাহাজের জন্য নতুন পার্কিং স্ট্যান্ড তৈরি করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭ এবং এয়ারবাস এ ৩৩০ ও এ৩৫০–এর মতো বড় উড়োজাহাজ এই বিমানবন্দরে ওঠানামা করতে পারবে। এয়ারসাইড অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার। যাত্রী টার্মিনাল সমপ্রসারণ ও বোর্ডিং সুবিধা উন্নয়নে ব্যয় হবে আরও ৪৩ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে টার্মিনাল ভবনের সমপ্রসারণ ও পুনর্বিন্যাসে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, টার্মিনাল সমপ্রসারণের পর বার্ষিক যাত্রীসেবা সক্ষমতা ৫০ লাখ থেকে বেড়ে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটিতে উন্নীত হবে। চারটি নতুন বোর্ডিং ব্রিজ নির্মাণ করা হলে মোট ব্রিজের সংখ্যা দাঁড়াবে ছয়ে। এর মধ্যে অন্তত চারটি বড় উড়োজাহাজের উপযোগী হবে।
প্রকল্পটিতে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি আঞ্চলিক যাত্রী ট্রানজিট কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। সেখানে পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ইমিগ্রেশন কাউন্টার ও ট্রানজিট লাউঞ্জ থাকবে। আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াতকারী ট্রান্সফার যাত্রীদের সেবা দেয়ার মতো অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে বলেও সূত্র জানায়।












