আগামী মাসে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনে

ঢাকা - চট্রগ্রাম মহাসড়ক ১০ লেন প্রকল্প ফিজিবিলিটি স্টাডি ও নকশা চুড়ান্ত ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প , অর্থের সংস্থান নিয়ে সরকারের তৎপরতা

হাসান আকবর | রবিবার , ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ

ছয় লেনের টোলভিত্তিক অ্যাকসেস কন্ট্রোল হাইওয়ে এবং দুই পাশে সার্ভিস রোডসহ চট্টগ্রামঢাকা মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য আগামী মাসেই পরিকল্পনা কমিশনে যাচ্ছে। প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের এ প্রকল্পের বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগেও (ইআরডি) পাঠানো হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাথে প্রাথমিক আলাপ আলোচনা হলেও আরো বিদেশি বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এডিবি, বিশ্বব্যাংক, এআইআইবি, জাইকাসহ বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থার সাথে চলছে আলোচনা। সুবিধাজনক উৎস থেকে অর্থের সংস্থান করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

সূত্র জানায়, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত চট্টগ্রামঢাকা মহাসড়ক দিয়ে দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি পণ্য পরিবাহিত হয়। লাখ লাখ মানুষের প্রতিদিনকার যানবাহন ছাড়াও বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনে এই রাস্তার উপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। ২০১৬ সালে মহাসড়কটিকে চার লেনে উন্নীত করা হয়। কিন্তু মাত্র ক’বছরের মধ্যে বিপুল যানবাহনের চাপ সামলাতে সড়কটির হিমশিম অবস্থা। সড়ক ও জনপথ বিভাগের জরিপে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র যানজটের কারণে এই সড়কে প্রতিদিন ৮৫ কোটি টাকার শ্রমঘণ্টা ও জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। ২০১৯ সালে এই মহাসড়ক ব্যবহার করে প্রতিদিন চলাচল করতো প্রায় ৩৫ হাজার গাড়ি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ছুঁই ছুঁই। মাত্র বছর পাঁচেকের মধ্যে এই সংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলেও সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

যানবাহনের এই বিপুল চাপ সামলানোর জন্য চট্টগ্রামঢাকা মহাসড়ক সম্প্রসারণের ব্যাপারটি সামনে আসে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রকল্পটির দায়িত্ব দেয়া হয় সড়ক ও জনপথ বিভাগকে। পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে ইতোমধ্যে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের ডান দিকে প্রায় ৯০ শতাংশ জমির মালিক সড়ক ও জনপথ বিভাগ। তবে আরো কিছু জমি অধিগ্রহণ এবং আধুনিক সুযোগ সুবিধা সন্নিবেশের কারণে প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা।

২০১৬ সালে সড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হয়েছিল তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকার মতো। কিন্তু দিনে দিনে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। জমি অধিগ্রহণ, উন্নয়ন, উড়াল ইন্টারচেঞ্জ, মাল্টিলেভেল ক্রসিং, ইলেকট্রনিক টোল সিস্টেম, উন্নতমানের সিসি ক্যামেরা, সড়কের নিরাপত্তা, পণ্যবাহী গাড়ির জন্য স্টেশন এবং জরুরি লেন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির খরচ বেড়ে গেছে বলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন।

সওজের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১০ লেনের প্রকল্পটিতে ছয় লেনের অ্যাকসেস কন্ট্রোল হাইওয়ে থাকবে। পাশাপাশি দুই পাশে দুই লেনের সার্ভিস রোড নির্মাণ করা হবে। হাইওয়েতে প্রবেশ করতে হলে টোল পরিশোধ করতে হবে। এর উভয়পাশের দুই লেন করে ৪ লেনে সব ধরনের যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। এই চার লেনে চলাচল করতে কোনো ধরনের টোল পরিশোধ করতে হবে না। এ ছাড়া মহাসড়কে ছয়টি মাল্টিলেভেল উড়াল ক্রসিং এবং ২০টিরও বেশি ফ্লাইওভার ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাখা হবে তিন মিটার প্রশস্ত জরুরি লেন এবং আধুনিক মাল্টিলেয়ার ইন্টারচেঞ্জ ও আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা।

সওজ কর্মকর্তারা বলেছেন, ইতোমধ্যে প্রণীত নকশায় সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে সাগরিকা পর্যন্ত আট কিলোমিটার এবং যাত্রাবাড়ী থেকে মদনপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার এলিভটেড এঙপ্রেসওয়ে থাকবে। এছাড়া ব্যস্ততম ছয়টি মোড়ে আধুনিক ইন্টারসেকশন হিসেবে ছয়টি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সীতাকুণ্ডের সলিমপুর, মীরসরাইর আবু তোরাব বাজার, বারৈয়াহাট, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও শিমরাইল এবং মদনপুরে এই ছয়টি ফ্লাইওভার নির্মিত হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, মহাসড়কের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যে, যাতে মূল সড়ক ও সার্ভিস লেনের মধ্যে সরাসারি ওঠানামার সুযোগ খুবই সীমিত থাকবে। এতে মহাসড়কে অনাহুত যানজট কমে যাবে এবং সময় সাশ্রয় হবে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

সওজ সূত্র জানায়, এডিবির সহায়তায় পরিচালিত ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং প্রণীত নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী মাসেই এটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। একইসাথে অর্থের সংস্থান নিয়েও সরকার কাজ করছে। প্রকল্প প্রস্তাব ইআরডিতে পাঠানো হবে বলেও তারা জানান। তারা বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে সরকার বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ ও আলোচনা করছে। তবে কারা প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। যে উৎসের অর্থ সুবিধাজনক মনে হবে সরকার তাদের কাছ থেকে প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহ করবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশাল একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পটি দেশের লাইফ লাইন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অগ্রসর হচ্ছে বলে উল্লেখ করে তারা বলেন, ১০ লেনের প্রস্তাবিত মহাসড়ক দেশের জিডিপি ১ থেকে ১.৩ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করবে। চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র, মীরসরাই শিল্পাঞ্চলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই মহাসড়ক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করে তারা বলেন, এটি শুধু দেশের অর্থনীতিই নয়, জীবনযাত্রার মানেও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবে। নির্মাণকাজ শুরুর ৫ বছরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও সওজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাঘা শরীফ হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন
পরবর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ায় সেচ পাম্পের তারে জড়িয়ে কৃষকের মৃত্যুর অভিযোগ