শিক্ষার্থীরা কেন ঝরে পড়ছে- কারণ খোঁজার এখনই সময়

রেজাউল করিম স্বপন | মঙ্গলবার , ২১ জুলাই, ২০২৬ at ৬:৫২ পূর্বাহ্ণ

যে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা যত উন্নত, সে দেশের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার প্রতি তত বেশি আগ্রহী। কারণ ঐসব দেশ শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়াকে উপভোগ করে। সে জন্য ঐসব দেশে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকে এবং দিনের বেশিরভাগ সময় স্কুলে কাটায়। সেসব দেশে স্কুলের নিয়মিত পাঠদানের মধ্যেই শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর পর্যবেক্ষণ ও গ্রেডিং করেন। ফলে সেখানে আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাইয়ের গুরুত্ব কম থাকে। তবু ঐসব দেশে পরীক্ষা পদ্ধতি চালু আছে। যদিও প্রথাগত কোনো বার্ষিক পরীক্ষা Annul Exam) বা মুখস্থনির্ভর বোর্ড পরীক্ষা নেই। প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিকের পুরো নয় বছরের বেসিক এডুকেশন চলাকালীন শিক্ষার্থীদের কোনো জাতীয় প্রমিত পরীক্ষা দিতে হয় না। এর বদলে সেখানে স্কুলের শিক্ষকেরা সামগ্রিক মূল্যায়নের উপর জোর দেন। শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিখছে, তাদের অগ্রগতি কেমন এবং তাদের আগ্রহের বিষয় কোনটিশিক্ষকরা তার ভিত্তিতে সারা বছর ধরে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করেন। বছরের শেষে শিক্ষার্থীদের একটি বার্ষিক রিপোর্ট কার্ড বা সনদ দেওয়া হয়। এটি গ্রেডিংয়ের মাধ্যমে বা মৌখিক মতামতের মাধ্যমে হয়। ১৬ বছর বয়সে বেসিক শিক্ষা শেষ করার পর, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে (General Upper Secondary School) পড়াশোনা শেষে কেবল একটি বাধ্যতামূলক জাতীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। আরো একটি বিষয় হলো সেসব দেশে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত থাকে ১ঃ১২ থেকে ১ঃ১৫।

কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। বিগত সরকারের আমলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর চলে উল্টাপাল্টা এক্সপেরিমেন্ট ও অদূরদর্শী আচরণ। তখন শিক্ষা প্রদানের চেয়ে অবকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য দিকে বেশি মনোনিবেশ করা হয়। অবলম্বন করা হয় ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতি। সৃজনশীল শিক্ষা, পরীক্ষা ব্যতীত অটোপাসআরো কত কী! তখন পরীক্ষার খাতায় কিছু একটা লিখলেই পাস মার্ক দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষীয় নির্দেশ ছিলো। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই এক্সপেরিমেন্ট চালানোর ফলে শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়ে বই বিমুখ। তার উপর রয়েছে করোনাকালিন সময়ে স্কুল বন্ধ, সামাজিক আতংক, অস্থিরতা ও জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব, রয়েছে অটোপাসের কুপ্রভাব। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় চরম পরীক্ষা ভীতি। যার ফলশ্রুতিতে এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬% অংশ নিচ্ছে না। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় না। তবে এ বছর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার অস্বাভাবিক বেশি বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। যদিও গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯% কিছু বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হারটি প্রায় ৭% বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয় নাই। তবে ইদানীং পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করার পরেও পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। যেমন গত বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ১৯,৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলো। এর আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিলো ১৫,২০৩ পরীক্ষার্থী।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। এ বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪% বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেননি। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে গেলো বা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি শিক্ষা বিভাগ।

তবে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের করা একটি বিশ্লেষণে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।ওই বছর ঢাকা বোর্ডের অধীনে ৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে ১,৩৫০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৪১% বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বাল্যবিবাহই ছিল অনুপস্থিতির প্রধান কারণ। এ ছাড়া পরীক্ষার প্রস্তুতির অভাব ও দারিদ্র্যও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে আসে। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতে দেখা গেছে, দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও তাদের মধ্যে ২৩% বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মতে, নিবন্ধন করার পর দুই বছরের বিভিন্ন সময়ের মধ্যে এই শিক্ষার্থীরা কার্যত পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে কারণ বের করা যায়নি। তবে তারা এ বিষয়ে একটি গবেষণা করার পরিকল্পনা করছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে উপরের শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য এবং এসএসসি পাসের পর অনেক শিক্ষার্থীর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া এ প্রবণতার উল্লেখযোগ্য কারণ। তবে এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি উদ্বেগের।

২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা একধরনের আত্মতুষ্টিতে ভুগছি। উচ্চমাধ্যমিকের মতো একটি পরীক্ষায় ৩৬% ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে না এর চেয়ে বড় মানসিক ধাক্কা আর হতে পারে না। বিপুল সংখ্যায় শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার মানেটা কী? আমাদের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা যে বেহাল, এটি কি তার প্রতিফলন? এই শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি রূঢ়ভাবে আমাদেরকে জাগিয়ে তোলার একটা ধাক্কা দিচ্ছে। এর অর্থ খুঁজতে হবে। ছাত্রছাত্রীরা, বাবামা বা অভিভাবকেরা কি পুরোপুরি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর থেকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছেন? নাকি তাঁদের কোনো ভিন্ন ধরনের অসুবিধা আছে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার বা বর্তমান সরকার বা সার্বিকভাবে আমরা কেউই ছাত্রছাত্রী তথা যুবসমাজের কথা শুনিনি। তাদেরকে বোঝার চেষ্টা করিনি। তাদের বেদনা, তাদের আকাঙ্ক্ষা, তাদের কনফিউশন, বিভ্রান্ত্তি এসব গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করিনি।

শিক্ষা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের উন্নতির বাহন। কিন্তু সেই শিক্ষা নিয়ে আমরা অতীতে সেই মনোযোগটা দিই নাই এবং দেওয়ার লক্ষ্যটাও জোরালোভাবে অনুভব করছি না। এখানে আমরা সার্বিকভাবে অন্য যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি ট্রিলিয়ন ডলার আয় বা এ ধরনের নানা পরিকল্পনা, সেগুলো কিন্তু কাগজের বিষয় হয়ে যাবে। যদি এই প্রজন্মকে, এই মানুষগুলোকে আমরা চিন্তার বা মনোযোগ দিয়ে শোনার সংস্কৃতির বাইরে রাখি। এরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় রাষ্ট্র থেকে, শিক্ষা থেকে তাহলে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। রাষ্ট্র বিনির্মাণে তাদের আবেগঘন সম্পৃক্ততা যদি আলগা হয়ে যায়, তাহলে সমাজে অস্থিরতা অনেক বেড়ে যাবে। এর কিছু কিছু নিদর্শন আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি।তাই অতিদ্রুত শিক্ষার্থীদের মনোজগত বুঝার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে হবে। শিক্ষাকে সংস্কার করে মানসম্পন্ন ও শিক্ষার্থী বান্ধব করতে হবে। শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে। এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যেন শিক্ষকরা তাদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য রাস্তায় না নামেন। সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের বুঝাতে হবে সঠিক জ্ঞান অর্জনই হলো তাদের উন্নতির সোপান। আর যত তাড়াতাড়ি তাদেরকে আমরা সেটি বুঝাতে পারবো তত তাড়াতাড়ি দেশ এগিয়ে যাবে বিশ্বের সাথে সমান তালে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবন্যা-পরবর্তী কৃষির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে করণীয়
পরবর্তী নিবন্ধবিদ্যুৎ-বৈষম্য : বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধা কোথায়