মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বপ্নজয়ী এক বাঙালি চিকিৎসকের কথা

ঝর্না বড়ুয়া | শনিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ

ডাক্তার মহুয়া বড়ুয়া বর্ষা আমাদের অহংকার। তার প্রথম হাতেখড়ি হয় চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র জামালখানের সুপরিচিত মিশনারিজ প্রতিষ্ঠান সেন্ট মেরিস স্কুলে। মাত্র বছর খানিক পড়াশোনা শেষে পিতার আবেদনে সপরিবার পাড়ি জমান পাশ্চাত্যের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে পাড়ি জমিয়েছে দেশ মাতৃকার মায়া ত্যাগ করে মাতাপিতার ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশ বিভূঁইয়ে। সেই প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনবহুল ব্যস্ততম শহর লস এঞ্জেলসে মাতাপিতার সাথে বসবাস শুরু করে এ শতকের শুরুতেই।

তিন বোনের মধ্যে বড় মেয়ে সংগীতা মাস্টার্স শেষ করে একাউন্টস ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত। মাতাপিতা তিন কন্যাকে সুপাত্রস্থ করেছে। মেজকন্যা তৃষা মাস্টার্স শেষ করে মায়ানমার দূতাবাসে কর্মরত। বর্ষাও সদ্য বিবাহিত তার সুযোগ্য বর অভিও অত্যন্ত মেধাবী। সে আমেরিকার স্বনামধন্য ভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করে কর্মরত আছে।

ছোট মেয়ে বর্ষা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও কর্মঠ। তিনবোনই অত্যন্ত মেধাবী, তারা নিজেরাই স্কলারশিপ নিয়ে নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে। মাবাবাকে তেমন অর্থনৈতিক বেগ পেতে হয়নি। তারা মাবাবার দুঃখ কষ্ট অনুভব করতো। এতো লক্ষ্মী মেয়েগুলো তেমন কোন চাহিদা নেই বললেই চলে, এ সমাজে এমন মানবিক সন্তান খুবই কম।

ছোট বোন বর্ষা তার বড় বোনদের ভাইয়ের মতো জানতো। যে কোন বিষয়ে পরামর্শ দিক নির্দেশনা বিশেষ করে বড় বোন সংগীতার কাছ থেকে নিতো। এভাবে ক্রমে ক্রমে সে মেডিকেল স্কুলে ফুল ফ্রী স্কলারশিপে ভর্তি হলো। গত চারবছর হাড় ভাঙা পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সাধনা করে ‘লয়োলা ইউনিভার্সিটি শিকাগো, স্ট্রিট স্কুল অব মেডিসিন’ জুলাই১৯মে ২৩ সেশনে ‘ডক্টর অব মেডিসিন’ কৃতিত্বের সাথে পাশ করে। তার এ সাফল্য শুধু একটা পরিবারের সাফল্য নয়, পুরো বাঙালি জাতির ও জন্মভূমি বাংলাদেশের গৌরবময় সম্মান। ডাক্তার মহুয়া বড়ুয়া বর্ষা তার নামের সাথে বড়ুয়া নিয়েও গর্ববোধ করে। তাই সে খুব স্বাচ্ছন্দ বোধ করে ডাক্তার বড়ুয়া নামে নিজেকে সবার কাছে সুপরিচিত করতে।

তার এ দীর্ঘ পথচলা তেমন সহজ ছিল না। এদিকে নানান সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক অপ্রতুলতা এবং দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব অভাব। এখানে উল্লেখ যে, তার বাবা অধ্যাপক তুষিত বড়ুয়া মহোদয় শারীরিক সমস্যায় ২০০৮ সাল থেকে কাজ করতে পারেন না। তিনি ঘরে থাকেন, কন্যাদের সাফল্যে তিনি উৎসাহ অনুপ্রেরণার একজন মহাবটবৃক্ষ স্বরূপ পরম আশীর্বাদক ও ছায়াসঙ্গী হয়ে পাশে থাকে।

মা একমাত্র উপার্জনক্রম ব্যক্তি। দুই বোন অন্যত্র স্বামী সংসার নিয়ে বাস করে। তাই পড়ালেখার জন্য অন্য অঙ্গরাজ্য শিকাগো শহরে যাওয়া আসা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। মেডিকেল সায়েন্সের কঠিন পড়ালেখা, বই সংগ্রহ করা, লাইব্রেরিতে সময় নিয়ে পড়া, নোট তৈরী করা, পরীক্ষার পর পরীক্ষা, ব্যয়বহুল সরঞ্জামাদি ক্রয়, বিশেষ করে চ্যালেঞ্জিং ‘অন দ্যা জব ট্রেনিং’ এ চব্বিশ ঘন্টা রোগী দেখা, সার্জারী, রিসার্চ, কমিউনিটি ক্লিনিক, কাউন্সিলিং, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, জেন্ডার ও ওমেন হেলদসহ বহুমুখী ক্রেডিট অর্জন করতে ব্যস্ততম সময় পার করেছে। নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য দিনরাত হাঁড়ভাঙা কঠোর পরিশ্রমে আজ তার সাফল্য হাতের মুঠোই ধরা দিয়েছে। যথাসময়ে কৃতিত্বের সাথে মার্কিন মুল্লুকে একজন চিকিৎসক হয়ে পরিবার, সমাজ, সমপ্রদায় ও জাতিকে গর্বিত করেছে। তার গৌরবে আমরা আপনারা সবাই গৌরবান্বিত। ক্যালিফোর্নিয়া বৌদ্ধদের মধ্যে প্রথম নারী চিকিৎসক মুহুয়া বড়ুয়া বর্ষা।

বাঁশখালীর কাহারঘোনার ছোট্ট পল্লী থেকে ওঠে আসা স্বপ্নজয়ী বাঙালি কন্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক চিকিৎসক। আরো আনন্দের বিষয় সদ্য পাস করেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য বৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘কাইজার পার্মানেন্টে’ প্রথম চাকরি জীবনে যোগদান করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। তার এমন সাফল্যগাথা আলোকিত জীবনকে অভিনন্দন ও প্রাণভরা আশীর্বাদ জানাই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনজরুল
পরবর্তী নিবন্ধআলো খুঁজি অন্ধকারে, নিজেকে খুঁজতে হয় প্রতিকূলতায়