মাধ্যমিক শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রস্তুতি নয়; এটি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার বড় একটি অংশ এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক। ভালো ফলাফল যেন শিক্ষার একমাত্র সাফল্যের মানদণ্ড। ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু মুখস্থ করছে, কিন্তু কতটা বুঝছে, প্রশ্ন করতে পারছে কি না, বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারছে কি না–এসব প্রশ্ন আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
এই প্রবণতা বদলাতে হবে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের নতুন বাস্তবতায় শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য জানা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীকে তথ্য যাচাই করতে হবে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দলগতভাবে কাজ করতে হবে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হবে। তাই মাধ্যমিক শিক্ষায় মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, ব্যবহারিক কাজ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে আছেন শিক্ষক। শিক্ষক দুর্বল হলে কোনো সুন্দর পাঠ্যক্রমই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। তাই শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং আধুনিক শিক্ষণ–পদ্ধতির সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষকদের অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজের বোঝা কমাতে হবে, যাতে তাঁরা শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশ ও মানসিক বিকাশে যথাযথ মনোযোগ দিতে পারেন।
শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো মূল্যায়ন। একটি বা কয়েকটি পরীক্ষার নম্বর দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মেধা ও সম্ভাবনাকে বিচার করা বাস্তবসম্মত নয়। ধারাবাহিক মূল্যায়ন, শ্রেণিকক্ষের অংশগ্রহণ, ব্যবহারিক কাজ, সৃজনশীল প্রকল্প, উপস্থাপনা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে মূল্যায়নের অংশ করতে হবে। পরীক্ষার ভয় নয়, শেখার আনন্দই হওয়া উচিত শিক্ষার চালিকাশক্তি। তবে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন শুধু শ্রেণিকক্ষের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ–সুবিধার বৈষম্য কমাতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞানাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, প্রযুক্তি সুবিধা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পাশাপাশি বিদ্যালয় পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অভিভাবকদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর বয়সের শিক্ষার্থীদের মানসিক জগতও উপেক্ষা করা যাবে না। পারিবারিক চাপ, সামাজিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা–সবকিছু তাদের ওপর প্রভাব ফেলে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। শুধু জিপিএ, সনদ কিংবা পরীক্ষার ফল দিয়ে শিক্ষার সাফল্য মাপলে আমরা দক্ষ পরীক্ষার্থী তৈরি করতে পারি, কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করতে পারব না। আমাদের প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা একজন শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরির বাজারের প্রতিযোগী নয়, একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে অবহেলার সুযোগ নেই। কারণ একটি প্রজন্মকে ভুলভাবে গড়ে তোলার ক্ষতি কোনো বাজেট দিয়ে পূরণ করা যায় না। আজকের শ্রেণিকক্ষে আমরা যে শিক্ষা দিচ্ছি, আগামী দিনের বাংলাদেশ তারই প্রতিফলন। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে–আমরা কি শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রজন্ম চাই, নাকি এমন একটি প্রজন্ম চাই যারা সত্যকে প্রশ্ন করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করবে এবং দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে? মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সংস্কার শুরু হোক সেই দ্বিতীয় স্বপ্নকে সামনে রেখেই।












