(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
হোটেলের লবিতে বসে কফি খাচ্ছিলাম। হাতে তেমন কোন কাজ নেই। সিডনিকে বিদায় জানানোর মানসিক প্রস্তুতির সাথে সাথে অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে দেশে ফেরার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। আবারো কাজে ফিরতে হবে, আবারো সংবাদের খোঁজে হেথায় হোথায় ঘুরতে হবে। ক’টি দিন একটি ঘোরের মধ্যে যেনো কাটিয়ে ফেললাম। খুব মনে পড়ছিলো মেলবোর্নের কথা, মনে পড়ছিল সানশাইন কোস্ট, গোল্ড কোস্ট, ব্রিজবেন, ক্যানবেরাসহ অস্ট্রেলিয়ার নানা অঞ্চলে ঘোরাঘুরির কথা! টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো কেমন যেনো চোখের সামনে ঘুরছিল।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের অপ্রয়োজনীয় ম্যাসেজগুলো ডিলিট করছিলাম। মনে হলো, মেইলও ভর্তি হয়ে আছে। অপ্রয়োজনীয় মেইলগুলো ডিলিট করার জন্য মেইল অ্যাপসে ঢুকতেই আমার চোখ নেচে উঠলো। হংকং ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টের মেইল। দ্রুত মেইলটি ওপেন করলাম। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো যে, যা দেখছি তা সত্যি কিনা। হংকং আমাকে তিন মাসের ভিসা দিয়েছে! অন্তরটি লাফিয়ে উঠলো। বিমানবন্দরে বসেই যে আবেদন করেছিলাম তার ভিসা অনলাইনে দিয়ে দেয়া হয়েছে। ডাবল এন্ট্রি ভিসা। যদিও আমার দরকার নেই। চেয়েছিলাম শুধু একবার বন্ধুর কবর জেয়ারত করেই দেশে ফিরে যাবো। কিন্তু হংকং ইমিগ্রেশন বিভাগ সদয় হয়ে আমাকে ডাবল এন্ট্রি ভিসা দিয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসের মধ্যে চাইলে আমি আরো একবার হংকং ঘুরতে যেতে পারবো। তারিখ খেয়াল করে দেখলাম, ভিসা এসেছে আরো দুইদিন আগে। আমি মেইল চেক না করায় ভিসা আসার ব্যাপারটি জানতে পারিনি।
আমার শরীর এবং মনে উত্তেজনা বেড়ে গেলো। আমাকে বিমানের টিকেট পাল্টাতে হবে। আমার ফ্লাইট সিডনি থেকে হংকং হয়ে ঢাকা। এখন আমাকে সিডনি হংকং টিকেটটি রেখে হংকং থেকে ঢাকার টিকেট নতুন তারিখে শিফট করাতে হবে। আমি ফোন করলাম, আমাদের ট্যুর অপারেটরকে। যিনি আমাদের সাথেই রয়েছেন। ওনাকে সমস্যাটি বলার পর তিনি আশ্বস্ত করলেন যে, কোন সমস্যা নেই। আপনি কত তারিখ ঢাকায় যাবেন জানান, আমি শিফট করে দিচ্ছি। কিছু ফি আসবে, দেশে গিয়ে ব্যাংকে দিয়ে দিলে হবে।
বুকের উপর থেকে যেনো পাথর নেমে গেলো। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে নিজেকে অনেক বেশি সুখী একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। আধা ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে আমাদের ট্যুর অপারেটর আমার নতুন টিকেট করে পাঠিয়ে দিলেন। যাতে সিডনি থেকে সকলের সাথে আমি হংকং পর্যন্ত যাবো, কিন্তু পরের ফ্লাইটে না ওঠে আমি হংকং থেকে যাবো। একসপ্তাহ হংকং থেকে পরে আমি অন্য ফ্লাইটে দেশে ফিরবো।
হাতে টিকেট আসার পর ফোন করলাম হংকংয়ে। আমার বন্ধু ইউছুপ আলীর স্ত্রীকে ফোন করে আমার ফ্লাইট ডিটেইলস দিয়ে দিলাম। আমার অপর বন্ধু হংকং প্রবাসী স্বপনকেও ডিটেইলস পাঠিয়ে দিয়ে এয়ারপোর্টে থাকার অনুরোধ করলাম। স্বপন আমাকে আশ্বস্ত করলো যে, সে বিমানবন্দরেই আমাকে রিসিভ করবে।
আমার নতুন ফ্লাইট সিডিউল এবং হংকং থেকে যাওয়ার কথা শুনে লায়ন ফজলে করিম ভাই এবং বিজয় শেখর দা মন খারাপ করে ফেললেন। একইসাথে এতোদিন ধরে ঘুরছি, সেই চীন থেকে অস্ট্রেলিয়ার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত! অথচ দেশে ফেরার সময় তাদেরকে বাদ দিয়ে আমি হংকং থেকে যাচ্ছি। অবশ্য, বন্ধুর কবর জেয়ারতের আবেগের বিষয়টি জানার পর তারা আর বিশেষ কিছু বললেন না।
রুমে ফিরে লাগেজ গুছিয়ে নিলাম। শেষমুহূর্তের প্রস্তুতি হিসেবে রুমের কোথাও কিছু রেখে যাচ্ছি কিনা তাও দেখে নিলাম। রুমের জানালার পর্দা সরিয়ে শেষবারের মতো শহরটির দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছিল, কয়েক দিনের পরিচয়েও এই নগরী যেন আপন হয়ে গেছে। দূরে কাচের দেয়ালে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে, পরিচ্ছন্ন সড়ক ধরে একের পর এক গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, কোথাও কোনো অস্থিরতা নেই। প্রচুর ব্যস্ততা আছে, কিন্তু সেই ব্যস্ততাও যেন অমোঘ নিয়ম মেনে চলছে।
হোটেলের লবিতে নেমে লাগেজগুলো গুছিয়ে নিলাম। আমাদের জন্য আস্ত একটি বাস আসবে। এর আগে রিসেপশনের কর্মীদের কাছে রুমের চাবি জমা দিয়ে আমি ক্লিয়ারেন্স চাইলাম। তারা আমাদের ফ্লোরে ফোন করলো। রুমের ফ্রিজে থাকা নানা ধরনের জিনিসপত্রের কিছু ব্যবহার করেছি কিনা বা রুমের কোন জিনিস নষ্ট করেছি কিনা তা জেনে নিয়ে আমাকে ক্লিয়ারেন্স পেপার দিয়ে দিল। সুন্দরী মেয়েটি আমার হাতে কাগজটি দিতে দিতে আবারো সিডনিতে বেড়াতে যাওয়ার আহ্বান জানালেন। তিনি আমার জার্ণি যাতে সুখের হয় সেই উইশও করলেন। আমাদের বাস চলে এসেছে। বাসের বয়স্ক ড্রাইভার লাগেজস্পেসের তালা খুলে একটি একটি ব্যাগ ভিতরে তুলছিলেন। আমরা কয়েকজন গিয়ে তাড়াতাড়ি হাত লাগালাম। অল্পক্ষণের মধ্যে আমাদের সবার লাগেজ তোলা হয়ে গেলো। চালক গিয়ে বসলেন তার আসনে, আমরাও সিটে সিটে বসে গেলাম।
আমাদের বাস চলতে শুরু করেছে। গন্তব্য বিমানবন্দর। প্রশস্ত মোটরওয়েতে গাড়ি উঠতেই চোখের সামনে একের পর এক মনোরম দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল। কোথাও সুউচ্চ আবাসিক ভবন, কোথাও সবুজ ঘেরা উপশহর। সারি সারি ইউক্যালিপটাস গাছ, পরিচ্ছন্ন পার্ক, সাইকেল লেন, নির্দিষ্ট গতিতে চলা যানবাহন। কোথাও হুড়োহুড়ি নেই। একটি গাড়িও হর্ণ বাজাচ্ছে না। সবকিছুতেই এক অন্যরকম শৃঙ্খলা। রাস্তার দুই পাশে বিলবোর্ড খুব কম, অপ্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপনের ভিড় নেই। পুরো পরিবেশেই এক ধরনের নান্দনিকতা।
রেললাইন ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো চমৎকার একটি ট্রেন। বাসে বসে ট্রেনটির চলে যাওয়া দেখলাম। কিন্তু ট্রেনের জন্য আমাদের থামতে হয়, সমান্তরাল সড়ক। কোথাও ছোট্ট একটি নদী, কোথাও সবুজ মাঠ। শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে পিছনে ফেলে আমরা কিছুটা গ্রামীণ এলাকায় চলে এসেছি বলে মনে হচ্ছিলো। বুঝতে পারছিলাম যে, বিমানবন্দর এলাকায় চলে এসেছি।
সিডনি কিংসফোর্ড স্মিথ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি পৌঁছাতেই আকাশে একের পর এক উড়োজাহাজের ওঠানামা চোখে পড়ল। যেন কয়েক মিনিট পরপরই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিমান এসে নামছে, আবার নতুন গন্তব্যে উড়ে যাচ্ছে। বিমানবন্দরের চারপাশে বিস্তীর্ণ অবকাঠামো, মালবাহী টার্মিনাল, রানওয়ে এবং বিমান সংরক্ষণের বিশাল এলাকা দেখে বোঝা যায়, সিডনির এই বিমানবন্দর শুধু অস্ট্রেলিয়ারই নয়, এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর।
টার্মিনালে প্রবেশ করতেই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার আরেকটি দৃষ্টান্ত চোখে পড়ল। স্বয়ংক্রিয় চেক–ইন কিয়স্কে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করা গেল। লাগেজ জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও অনেকটাই স্বয়ংক্রিয়। নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ করে ইমিগ্রেশনে পৌঁছালে কর্মকর্তারা অত্যন্ত বিনয়ী আচরণে দ্রুত কাজ শেষ করলেন। কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষা নেই, অযথা প্রশ্নের বন্যাও নেই। পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই সুশৃঙ্খল যে আমাদের বিদায়বেলাটি অনেক সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে।
ডিপারচার লাউঞ্জ যেন একটি ছোট্ট আন্তর্জাতিক নগরী। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ, নানা ভাষার শব্দ, বিভিন্ন সংস্কৃতির পোশাক–সব মিলিয়ে এক অনন্য পরিবেশ। কত দেশের কত জাতের মানুষ! শিশুদের হাসি, কফির সুবাস, ডিউটি–ফ্রি দোকানের আলো আর ব্যস্ত পদচারণায় বিমানবন্দরের আবহ অন্যরকম মনে হচ্ছিলো।
আমাদের গন্তব্য হংকং। বোর্ডিং ঘোষণা হতেই নির্ধারিত গেটের সামনে যাত্রীদের সারি তৈরি হলো। সবাই ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন। কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই, উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার নেই। নির্ধারিত সময়েই বোর্ডিং শুরু হলো।
বিমানে নিজের আসনে বসে জানালার পাশে চোখ রাখলাম। বিশাল ডানার নিচে ব্যস্ত রানওয়ে। কিছুক্ষণ পর বিমানটি ধীরে ধীরে ট্যাক্সিওয়ে ধরে এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ ইঞ্জিনের গর্জন বেড়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গতি বাড়িয়ে রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উড়ে গেল।
ধীরে ধীরে নিচে ছোট হয়ে এলো সিডনি শহর। দূরে নীল সমুদ্র, উপসাগরের বাঁক, সাদা পালতোলা নৌকা, বিখ্যাত হারবার ব্রিজ এবং অপেরা হাউস একসময় ক্ষুদ্র খেলনার মতো মনে হতে লাগল। আমাদের বিমানটি ক্রমান্বয়ে উপরে উঠছিল, আর নিচের সবকিছু ক্রমেই মেঘের আড়ালে চলে গেলো। একসময় নীল আকাশজুড়ে সাদা মেঘের ভেলা, কোন মেঘ হাতির মতো, কোনটি ঘোড়ার মতো, কোনটি পঙ্গীরাজের মতো হয়ে ভেসে যাচ্ছিলো। আমাদের বিমানটি যেনো রকমারি সেই ভেলার উপরই স্থির হয়ে ভাসছিল! (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












