গড়তে হবে গ্রেট গ্রিন ওয়াল

ফজলুর রহমান | বুধবার , ২২ জুলাই, ২০২৬ at ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ

সেদিন ছায়ায় এসো; হানো যদি কঠিন কুঠারে/তবুও তোমায় আমি হাতছানি দেব বারে বারে;/ ফল দেব, ফুল দেব, দেব আমি পাখিরও কূজন/ একই মাটিতে পুষ্ট তোমাদের আপনার জন।।’কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আগামী’ কবিতায় স্পষ্ট ফুটে ওঠে প্রাণিকুলে ভারসাম্য বজায় রাখতে বৃক্ষের নিঃস্বার্থ অবদানের কথা। মানবসভ্যতার শুভ উন্মেষ ঘটেছিল অরণ্যের শ্যামল ছায়া শোভিত স্নিগ্ধ রমণীয়তায়, বৃক্ষলতা আচ্ছাদিত মোহময়ী নীড়ে।

তবে বনজ সম্পদ ধ্বংস করে, গাছপালা নষ্ট করে মানুষ আজ পৃথিবীতে সৌন্দর্যহীনতা, শুষ্কতা, অনুর্বরতা, বন্যা, খরার শিকার হচ্ছে। যেখানে একজন মানুষের খাদ্য ছাড়া ২১ দিন এবং পানি ছাড়া ৩ দিন বাঁচার সম্ভাবনা থাকে (স্বাস্থ্যভেদে ভিন্ন), সেখানে অক্সিজেন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে মাত্র কয়েক মিনিট। আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক অক্সিজেনের সবচেয়ে বড় উৎস বৃক্ষ নিধন করতে আমরা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত বোধ করি না। তথ্য অনুযায়ী, একজন মানুষের বার্ষিক যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন হয়, সে পরিমাণ অক্সিজেন সাত থেকে আটটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বাতাসে ছাড়তে পারে। যে কোনো দেশের জন্য মূল ভূখণ্ডের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু সে তুলনায় বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের ১৭ ভাগ। প্রাকৃতিক বন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সামাজিক ও গৃহস্থালি বনায়নের প্রতি আরো জোর দিতে পারলে বনভূমির পরিমাণ ২৫ শতাংশে আনা অসম্ভব নয়। কোন কোন দেশ এরইমধ্যে বন ফিরিয়ে আনার কাজে জোরেশোরে নেমে পড়েছে।

শুরুতে চীন দেশের কথা বলি। প্রাচীনকালে চীনের রাজারা হাজার হাজার মাইল দৈর্ঘ্যের মহাপ্রাচীর তৈরি করেছিলেন। এই প্রশস্ত দেয়াল নির্মাণের মূল কারণ ছিল তাদের সাম্রাজ্যকে বাইরের শত্রুদের হাত থেকে নিরাপদ রাখা। বর্তমানের চীনা সরকার প্রায় একইরকমের একটি দেয়াল (দ্য গ্রেট গ্রিন ওয়াল) নির্মাণ করছে, যে দেয়াল তাদের মরুভূমির হাত থেকে রক্ষা করবে। যাকে ডাকা হচ্ছে ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’। চীনের পূর্বাঞ্চলের মোট আয়তনের একটি বড় অংশ মরুময় এলাকা। গোবি মরুভূমির এই অংশে চাষাবাদ অত্যন্ত কঠিন। পানির তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে স্বাভাবিক জীবন ধারণও প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। আরও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হচ্ছে, প্রতিবছর এই মরুভূমির পরিমাণ বাড়ছে। ফলে একসময় ক্রমশ এই অঞ্চলের পুরোটাই মরুভূমি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গোবি মরুভূমির প্রসার রোধ করতে চীনা সরকারের যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেটি রীতিমতো বিস্ময়কর। ‘দ্য থ্রি নর্থ শেল্টার ফরেস্ট প্রোগ্রাম’ নামের এই প্রকল্পের মেয়াদ মোট ৭২ বছর। ১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া এই ‘সেফটি বেল্ট নির্মাণ’ প্রকল্প চলবে ২০৫০ সাল পর্যন্ত। এই প্রকল্পের মূল কাজ হচ্ছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার জায়গা জুড়ে গাছ রোপণ করা। এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় দশ হাজার কোটি গাছের বীজ রোপণ করা হবে। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি গাছের বীজ রোপণ করা হয়ে গিয়েছে। গোবি মরুভূমির পনের শতাংশের আয়তন পুরো পশ্চিম ইউরোপের সমান। অর্থাৎ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পুরো পশ্চিম ইউরোপের সমান বনভূমি লাভ করবে চীনা সরকার। এই প্রকল্পের অধীনে মরুভূমির প্রসার রোধ করতে প্রথমে ঘাস ও সাধারণ গাছ লাগানো হয়। এরপর লাগানো হয় বিভিন্ন ধরনের গুল্ম, যেগুলো শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সক্ষম। গাছের বীজ রোপণ করা হয় দুভাবে। যেসব জায়গায় যাতায়াত করা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর, সেসব জায়গায় বিমান থেকে বীজ ফেলে দেয়া হয়। এর পাশাপাশি যেসব জায়গায় জনবসতি আছে, সেসব জায়গায় মানুষকে গাছ লাগানোর জন্য অর্থ ও বীজ প্রদান করা হয়। এছাড়া বেশ ক’জন ধনী ব্যক্তি নিজ উদ্যোগেও বনায়ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে এগিয়ে এসেছেন। এই প্রকল্পের সুফল পাওয়া যাচ্ছে এখনই। সবজি চাষাবাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতি লাভ করেছে। এছাড়াও অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ অঞ্চলে ধুলিঝড়ের মাত্রা কমে এসেছে।

এশিয়া থেকে এবার আফ্রিকায় যাওয়া যাক। সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্ত বা সাহেল অঞ্চলে ২০২৬ সালে এক অভাবনীয় সবুজ বিপ্লব দৃশ্যমান হচ্ছে। আফ্রিকার ১১টি দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৮০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ প্রজেক্টটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার ২৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে পূরণ করেছে। এটি কেবল গাছের একটি দেয়াল নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানবজাতির লড়াইয়ের এক জীবন্ত প্রতীক। ২০২৬ সালে এসে এই প্রকল্প প্রমাণ করেছে যে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রকৃতিকেও মানুষের চেষ্টায় পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ২০২৫ সাল থেকে এই প্রকল্পে জাপানি বিজ্ঞানী আকিরা মিয়াকওয়াকির উদ্ভাবিত ‘মিয়াকওয়াকি পদ্ধতি’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে সাধারণ বনের চেয়ে ১০ গুণ দ্রুত গাছ বড় হয় এবং ৩০ গুণ বেশি কার্বন শোষণ করে। এছাড়া দুর্গম মরু অঞ্চলে ড্রোন ব্যবহার করে কোটি কোটি বীজ ছিটানো হয়েছে, যা ২০২৬ সালের বর্ষায় কচি সবুজ পাতায় ঢেকে গেছে। এই বনগুলো এখন মরুভূমির উত্তপ্ত বালু ঝড়কে আটকে দিচ্ছে এবং স্থানীয় জলবায়ুর তাপমাত্রা ২৩ ডিগ্রি কমিয়ে এনেছে। ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে গ্রেট গ্রিন ওয়াল এখন বড়সড় একটা ‘প্রাকৃতিক কার্বন সিঙ্ক’। জাতিসংঘ এই মডেলকে এখন আমাজন এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বন রক্ষায় ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। এটি কেবল আফ্রিকার জয় নয়, এটি পুরো পৃথিবীর বেঁচে থাকার এক নতুন আশার আলো।

বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরাও একটা গ্রেট গ্রিন ওয়াল রচনা করতে পারি। বিশেষ করে, বৈশ্বিক উষ্ণতাজনিত বিপদে সংকটাপন্ন উপকূলে। সেখানে বৃক্ষরোপণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে ‘বৈশ্বিক উষ্ণতা’। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়েই চলেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে প্রকৃতিতে। একটি সত্য ঘটনা দিয়ে শেষ করি। করোনাযুদ্ধে জয়ী ৭০ বছর বয়সি নিউজিল্যাল্ডের এক বৃদ্ধ নারীর হাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৫০ ডলারের একটি বিল ধরিয়ে দিলে, নারী কান্না শুরু করে দেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, কাঁদছেন কেন? এটা তো এক দিনের অক্সিজেন সরবরাহের বিল। অর্থ না থাকলে আপনাকে বিল দিতে হবে না। বয়স্ক নারী বললেন, বিলের জন্য কাঁদছি না। কাঁদছি এজন্য যে, কৃত্রিমভাবে এক দিন অক্সিজেন নেওয়ার জন্য আমাকে ৫০ ডলার বিল দিতে হচ্ছে। আর আমার ৭০ বছরের এই জীবনে প্রকৃতি থেকে কত অক্সিজেন গ্রহণ করেছি, সেটার বিল তো পরিশোধ করিনি। প্রকৃতির কাছে একটু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিনি। একটিবারও প্রকৃতিকে ধন্যবাদ জানাইনি। এতেই বোঝা যায়, প্রকৃতি ও বৃক্ষ মানবজীবনের জন্য কত উপকারী!

লেখক: উপপরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুশিক্ষার আলোয় মানবকল্যাণ
পরবর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে