প্রবাহ

হজ পর্যালোচনা

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ২২ জুলাই, ২০২৬ at ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ

এ বছরের পবিত্র হজ শেষে হজযাত্রীরা বিশ্বব্যাপী যার যার দেশে ফিরে গেছেন। একইভাবে বাংলাদেশের ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রী হজ পালন করে দেশে ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ৭২ হাজার ৩৪৪ জন।

মুসলমানদের ওপর হজ তিন শর্তে ফরজ:-

. যাতায়াত অনুকূল থাকা

. শারীরিক সক্ষমতা থাকা

. আর্থিক সক্ষমতা থাকা

যাতায়াত এবং শারীরিক সক্ষমতা থাকলেও আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে বাংলাদেশের কোটার একটি বড় অংশ খালি থেকে যাচ্ছে। চলতি বছর সর্বসাকুল্যে ১৭ লাখ ৭ হাজার ৩০১ জন হজ করেছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৬ জন হাজি ছিলেন সৌদি আরবের অভ্যন্তর থেকে আসা সৌদি নাগরিক ও বৈধ প্রবাসী। বাকি ১৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৫ জন এসেছেন বহির্বিশ্ব থেকে। আকাশপথে হজ করতে এসেছেন ১৪ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৯ জন। স্থলপথে বিদেশ থেকে এসেছেন ৫৪ হাজার ৪২৯ জন, যাদের মধ্যে ইয়েমেন, উপসাগরীয় আরব দেশসমূহসহ জর্ডান, সিরিয়া, মিশর ও ইরাকের নাগরিকরা রয়েছেন।

এছাড়া সমুদ্রপথে হজ করতে এসেছেন ৬ হাজার ৪৯৭ জন, যাদের মধ্যে সৌদি আরবের পার্শ্ববর্তী সুদান ও মিশর অন্যতম।

হজ একটি ফরজ ইবাদত। মহান আল্লাহ তাআলার এই বাৎসরিক আয়োজন ৮ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত মোট ৬ দিনব্যাপী। আজকাল ৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী হজ পালিত হচ্ছে।

২০২০ ও ২০২১ সালের করোনা মহামারীর পর থেকে সৌদি সরকার হজ ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে সাজিয়েছে। হাজার বছরের পুরোনো মোয়াল্লেম প্রথা’ বিলুপ্ত করে বিভিন্ন কোম্পানিকে হজযাত্রীদের কল্যাণে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে হজের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হজযাত্রীর সংখ্যাও কমে যায়।

১৯৯০এর দশকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ বা তার চেয়েও বেশি নরনারী হজ করতেন। তখন পবিত্র মক্কা জুড়ে মানুষের ঢল নামত। বিশেষ করে প্রবাসীরা হজ করতে পবিত্র মক্কায় চলে আসতেন। মিনার ৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটাচলার শেডগুলোতে হজ পালনকালে প্রায় ৫৬ লাখ প্রবাসী অবস্থান নিতেন।

২০১০ সালের দিক থেকে ধীরে ধীরে সৌদি সরকার হজযাত্রী নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। পরবর্তীতে করোনা মহামারীর পর থেকে সৌদি সরকার হজকে অকল্পনীয়, অসাধারণভাবে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো মুসলমান এখন আর হজ করতে পারেন না। পবিত্র মক্কার চারদিকে কড়া চেকপোস্ট বসানো হয়, যাতে বৈধ হজযাত্রী ছাড়া কোনো সৌদি নাগরিক বা প্রবাসী সেখানে প্রবেশ করতে না পারেন। প্রায় ৩ বছর ধরে প্রত্যেক হজযাত্রীকে একটি করে আইডি কার্ড দেয়া হচ্ছে, যাকে নুসুক কার্ডবলা হয়। এই কার্ডে হজযাত্রীর নাম, ছবি ও দেশের নাম লেখা থাকে। নুসুক কার্ড স্ক্যান করলেই হজযাত্রীর যাবতীয় তথ্য চলে আসে। গত হজে মসজিদুল হারমে নামাজ পড়তে যেতেও এই আইডি কার্ড সাথে রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। বর্তমান সময়ে হজযাত্রীদের জন্য এই আইডি কার্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ৩ বছর ধরে এই প্রথা চালু হলেও ২০২৫ সালের হজে কড়াকড়ি কিছুটা কম ছিল, কিন্তু এবারের হজে এই আইডি কার্ডের কড়াকড়ি আরও অনেক বেড়ে গেছে।

হজ নিয়ে সৌদি সরকার মনে হয় অত্যন্ত সতর্ক ছিল। হয়তো ইরানের সাথে আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে। তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে হজের সময় কোনো অঘটন ঘটেনি।

এই ১৭ লাখ হজযাত্রীকে মসজিদুল হারমসহ পবিত্র মক্কা নগরীতে নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে প্রশাসন অত্যন্ত তৎপর ছিল। হজ ও ওমরার স্পেশাল ফোর্সের পাশাপাশি মাথায় লাল টুপি পরা সৌদি রাজকীয় ল্যান্ড ফোর্সও নিয়োজিত ছিল। উভয় বাহিনীই হজযাত্রীদের শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে কঠোর পরিশ্রম করেছে। আগে মসজিদুল হারমের চারদিকের চত্বরের বাইরে কিছুটা দূরত্বে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যারিকেড দিত। কিন্তু গত হজে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় মুসল্লিদের মসজিদুল হারমে প্রবেশকালীন ব্যারিকেডের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

অর্থাৎ, হজযাত্রীদের নামাজ পড়ার সময় সুশৃঙ্খলা রাখতে গিয়েই এই ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল। মসজিদুল হারামে সাধারণত লাখ লাখ মুসল্লি নামাজ পড়েন। সবার প্রথম আকর্ষণ থাকে নিচতলা এবং এরপরের আকর্ষণ থাকে বেইজমেন্ট বা ভূগর্ভস্থ তলা। এরপরেই আসে মসজিদুল হারামের ছাদ। হাজিরা সাধারণত নিচতলা বা প্রথম তলায় অথবা বেইজমেন্টে নামাজ পড়তে চান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নিচতলা ও দ্বিতীয় তলা পূর্ণ হওয়ার পর নামাজিদের বাধ্য করে এস্কেলেটরের মাধ্যমে সরাসরি ছাদে পাঠিয়ে দিতে। অথচ তখনও নিচের বেইজমেন্ট খুলে দেওয়া হয়নি। পবিত্র মক্কার আবহাওয়া অত্যন্ত গরম। মাগরিব ও এশার নামাজের সময়ও ছাদে বেশ গরম অনুভূত হয়। তা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ বেইজমেন্ট খুলতে চাচ্ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী যে আগে আসবে, সে তার সুবিধামতো জায়গা পাবে। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ চাচ্ছিল প্রথমে নিচতলা, দ্বিতীয় তলা তারপর ছাদ এবং সবশেষে বেইজমেন্ট পূর্ণ করতে। কর্তৃপক্ষ যে নামাজি ও তাওয়াফকারীদের কল্যাণেই এটি করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে এই সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি যথাযথ ছিল না বলে মনে হয়।

গত হজের আরেকটি স্মরণীয় প্রতিকূলতা ছিল মিনায় টয়লেট ব্যবহার নিয়ে। সাধারণত জোহরের পর, এশার পর কিংবা নামাজের সময় ছাড়া অন্য সময়ে মিনায় টয়লেটের চাপ কিছুটা কম থাকে এবং লাইনে দাঁড়াতে হয় না। কিন্তু কেন জানি গত হজে মিনায় ২৪ ঘণ্টাই টয়লেটের প্রতিটি দরজায় ৩৪ জন কিংবা ৫৭ জন, এমনকি কোথাও কোথাও ৮১০ জনের লাইন ছিল। এর ফলে অসংখ্য হাজি, বিশেষ করে বয়স্ক হাজিরা ক্যাম্প এরিয়ার ভেতরের যাতায়াতের রাস্তার পাশেই প্রস্রাব করতে বাধ্য হয়েছেন, যা ছিল খুবই অমানবিক।

করোনা মহামারীর আগে মোয়াল্লেম প্রথাথাকায় কাফেলা এজেন্সিগুলো মোয়াল্লেমের সাথে সমন্বয় করে আমাদের দেশের হাজিদের জন্য রুচিশীল খাবারের ব্যবস্থা করতে পারত। কিন্তু এখন ভিন্ন দেশের ঠিকাদারদের সরবরাহ করা খাবার আমাদের দেশীয় হাজিদের কাছে তেমন একটা রুচিশীল মনে হয়নি।

অবশ্য করোনা মহামারীর পর থেকে পুরোনো বাসগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন সব নতুন তকতকে চকচকে বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

১০ ও ১১ জিলহজ মিনায় নিরাপত্তা বাহিনী যে ব্যারিকেড দেয়, তা নিয়েও সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাবা উচিত। মিনায় শয়তানকে পাথর মারতে যেতে, পাথর মেরে ফিরে আসতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এই ব্যারিকেড দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশের বয়োবৃদ্ধ ও দুর্বল হাজিদের জন্য এই দীর্ঘ পথ ঘুরে আসা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও অমানবিক হয়ে দাঁড়ায়।

মে মাসের ২৬ তারিখ ছিল আরাফাত দিবস। হজ পর্যায়ক্রমে প্রচণ্ড গরমের সময় থেকে অপেক্ষাকৃত কম গরমের সময়ের দিকে এগিয়ে আসছে। পবিত্র মক্কায় মাঝে মাঝে গরম অনুভূত হলেও একে প্রচণ্ড গরম বলা যায় না। সৌদি আরবে মূলত জুনের শেষ থেকে জুলাই ও আগস্টের দিকে অত্যধিক গরম হয়।

হজ মূলত একটি কষ্টসাধ্য ইবাদত। হজ মুখে পড়ার বিষয় নয়, এটি সরাসরি শারীরিকভাবে পালন করার বিষয়। তাই বলে মুখে বলার বিষয় বাদ যাবে না। বাংলাদেশি হজযাত্রীরা সবসময় মসজিদুল হারমের কাছাকাছি অবস্থান করতে চান। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের হজযাত্রীদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার পরও তারা কিছুটা দূরে অবস্থান করেন। আমাদের দেশের অধিকাংশ হজযাত্রীই মসজিদুল হারমের ১ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করেন বলা যায়। তবে দুঃখের বিষয় হলো, মসজিদুল হারমে ৫ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে কত শতাংশ বাংলাদেশি হাজিকে পাওয়া যাবে, তা ভাববার বিষয়। কেন জানি পবিত্র মক্কায় অবস্থান করার পরও মসজিদুল হারমে গিয়ে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার আগ্রহ অনেকে হারিয়ে ফেলছেন। টাচ মোবাইল বা স্মার্ট ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার হজের ধর্মীয় আবেগকে অনেকাংশে ম্লান করে দিচ্ছে।

সর্বোপরি, সৌদি কর্তৃপক্ষ যা কিছু করেছে, তা হজযাত্রীদের কল্যাণ, আরাম এবং শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই করেছে। এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধবন্যাদুর্গতদের পাশে রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ফাউন্ডেশন