ড. মঈনুল ইসলামের কলাম

চীন, ভিয়েতনাম ও কেরালা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষণীয়

| বৃহস্পতিবার , ১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ

এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে পারেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৪৯ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হলেও মার্কিনীরা ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চীনের ঐ রাষ্ট্রকে স্বীকার করে নেয়নি। (১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন চীনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিপক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে)। ১৯৫০৫৩ এর কোরিয়া যুদ্ধের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৫৪ সালে ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের হাতে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে ফ্রান্সকে, কিন্তু ১৯৫৫ সালে আবার মার্কিন পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দক্ষিণ ভিয়েতনামে জেঁকে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে, কুড়ি বছর ধরে ভিয়েতনামে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম উত্তর ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মহারক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। প্রায় কুড়ি লাখ ভিয়েতনামীর মৃত্যুর বিনিময়ে ঐ যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছিল ভিয়েতনাম, লজ্জাজনক পরাজয় মেনে নিয়ে দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে ১৯৭৫ সালে পালাতে হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। ঐ সময় কাম্পুচিয়া এবং লাওসেও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কিনীদের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা সত্ত্বেও। আশির দশকে পোলান্ডে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন সফল হওয়ায় পূর্ব ইউরোপের সকল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের সংগ্রামের মাধ্যমে ডমিনো স্টাইলে ভেঙে পড়ে সমাজতন্ত্র। সবশেষে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপ ঘোষণা করে রাশিয়া। এসব পরিবর্তনের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালোহাত প্রতিটি ক্ষেত্রেই সক্রিয় ছিল। এই ঐতিহাসিক প্রতিবিপ্লবের ধারার কারণে মনে করা হয়েছিল, সমাজতন্ত্র ক্রমশ বিশ্ব থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে সমাজতান্ত্রিক মডেলগুলোর পতন শুরু হওয়ার আগেই অথবা সমসাময়িক কালে চীন ১৯৭৮ সালে ও ভিয়েতনাম ১৯৮৬ সালে তাদের সমাজতান্ত্রিক মডেলগুলোয় যুগোপযোগী পরিবর্তন সাধন করে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত ও টেকসই করায় চমকপ্রদ সফলতা অর্জন করতে সমর্থ হয় । একইসাথে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের কেরালা রাজ্যে সমাজতন্ত্রের এক সফল মডেল টিকে রয়েছে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে।

সোভিয়েত স্টাইলের সমাজতান্ত্রিক মডেল যে একসময় স্থবিরতায় আক্রান্ত হবে সে বাস্তবতা উপলব্ধি করে চীনে ১৯৭৮ সালে অভূতপূর্ব বিপ্লবীসংস্কার কার্যক্রম গৃহীত হয়, যেখানে কৃষিখাতে আবার ‘ফ্যামিলি রেসপন্সিবিলিটি সিস্টেম’ চালু করে সম্পত্তির ওপর জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে আনা হয়, অন্যদিকে সারা দেশের শহর ও গ্রামগুলোতে ‘টাউনশিপ এন্ড ভিলেজ এন্টারপ্রাইজ’ (টিভিই) চালুর মাধ্যমে সীমিত পরিসরে প্রাইভেট এন্টারপ্রিনিয়রশিপ ও সমবায় কার্যক্রম অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হয়। চীনে কয়েক লক্ষ টিভিই গড়ে উঠেছে গত চল্লিশ বছরে। একইসাথে, চীন প্রবল ও সুদূরপ্রসারী প্রণোদনা দিয়ে বৈদেশিক শিল্পপুঁজি, বহুজাতিক কর্পোরেশন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চীনে আমন্ত্রণ জানায়। সারা বিশ্ব থেকে অভূতপূর্ব দ্রুততায় চীনে ছুটে আসে বহুজাতিক পুঁজিবাদী বিনিয়োগ। চীন গ্রহণ করে রফতানিমুখী শিল্পায়নের একটি চমকপ্রদ মডেল, যেখানে রাষ্ট্র সুপরিকল্পিতভাবে রফতানি খাতে প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশের পথের সকল বাধাবিঘ্ন দূর করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। গত তিন দশক ধরে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। বলা হয়, প্রায় সকল শিল্পের ক্ষেত্রে চীন এখন ‘বিশ্বের ফ্যাক্টরি”। অথচ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাখাতে চীন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বহাল রেখে দিয়ে বৈষম্য বৃদ্ধিকে রুখে দাঁড়ায়। পাশাপাশি, অত্যন্ত সুচতুর পরিকল্পনার মাধ্যমে চীনের রাষ্ট্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রণোদনা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে দ্রুত উন্নতি সাধনের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে চীন। এর ফলে, অর্থনীতির ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ ২০২৫ সালেও বহাল রয়ে গেছে রাষ্ট্রের মালিকানায়, বাকি ৫০ শতাংশের ওপর প্রাইভেট সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কোন রকমের বাধা খাড়া করেনি রাষ্ট্র। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই নতুন মডেলের বাস্তবায়নে চীন রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণকে এতটুকুও শিথিল করেনি, অর্থনীতির ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণও পুরোপুরি অটুট রয়ে গেছে। তারা এই মডেলকে নাম দিয়েছে ‘চীনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাজতন্ত্র’। ২০০৮ সালের মধ্যেই চীন দেশ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে শতভাগ সফলতা অর্জন করে। আইএমএফ ঘোষণা করেছে, ক্রয়ক্ষমতা সাম্যের নিক্তিতে ২০১৪ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে চীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ২০৩০/৩১ সাল নাগাদ চীন নমিনাল ডলারেও বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে।

অন্যদিকে, ভিয়েতনাম প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে ১৯৭৫ সালে। বিশ্বের জনগণের কাছে ভিয়েতনাম হলো সবচেয়ে বেশি রক্তঝরানো স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ী দেশ। সমাজতন্ত্রী ভিয়েতনাম বিশ্বের একমাত্র দেশ যে দেশটি বিশ্বের দু’দুটো সুপারপাওয়ার ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করে নিজেদের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে, ফ্রান্স পরাজয় বরণ করেছে ১৯৫৪ সালে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৫ সালে। ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম যখন স্বাধীন দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল তখন ভিয়েতনাম ছিল বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। এতদ্‌সত্ত্বেও ভিয়েতনাম কখনোই কোন দেশের কাছে মাথা নত করেনি, ভিক্ষার জন্যে হাত পাতেনি। এমনকি, অনুদান ও ‘সফট লোনের’ আশায় জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত হতেও আবেদন করেনি। অথচ, কী দারুণ কষ্টকর ছিল ১৯৭৫পরবর্তী বছরগুলোতে ভিয়েতনামের জনগণের জীবন! ভিয়েতনামের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি ১৯৭৪ সালে ছিল মাত্র ৬৫ ডলার, ১৯৮৫ সালে ছিল ২৮৫ ডলার। অথচ, ২০২৫ সালে আইএমএফ এর প্রাক্কলন মোতাবেক ভিয়েতনামের মোট জিডিপি ৪৯০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের মাথাপিছু নমিনাল জিডিপি ৪৮০৬ ডলারে পৌঁছে গেছে, যেটাকে ‘মিরাকল’ বলা হচ্ছে। ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে ভিয়েতনামের মাথাপিছু জিডিপি ২০২৪ সালে পৌঁছে গেছে ১৭,৪৮৪ পিপিপি ডলারে। ভিয়েতনামের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ৮.৫ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের মাত্র ২ শতাংশ জনগণ দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করছিল। ১৯৮৬ সালে ভিয়েতনামও ‘দোই মোই’ বা রিনোভেশন নাম দিয়ে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করে। ১৯৮৬ সালে ‘দোই মোই’ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার ৩৯ বছর পর এখন পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নচিন্তকরা ভিয়েতনামের অর্থনীতিকে ‘সোশালিস্টওরিয়েন্টেড মার্কেট ইকনমি’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ‘দোই মোই’ কর্মসূচিতে ‘কালেকটিভ ফার্মিং’ নিষিদ্ধ হয়েছে, জমির ওপর জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ উভয়কে উৎসাহিত করা হয়েছে। ‘দোই মোই’ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রধান তিনটি ডাইমেনশান হলো: ) অত্যন্ত শক্তহাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উদারীকরণ, ) অত্যন্ত দ্রুত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিনিয়ন্ত্রণ এবং সরকারী হস্তক্ষেপ হ্রাসের মাধ্যমে ব্যবসা করার খরচ ও বাধাবিঘ্ন কমিয়ে ফেলা এবং ৩) রাষ্ট্রীয় খাতের বিনিয়োগ প্রবলভাবে জোরদার করার মাধ্যমে মানব উন্নয়ন (শিক্ষা) ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নকে প্রথম অগ্রাধিকারে পরিণত করা। বিশেষত, প্রাইমারী শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক (ভোকেশনাল) শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে ভিয়েতনাম ২০০০ সালের মধ্যেই তার পুরো জনসংখ্যাকে শতভাগ শিক্ষিত করে তুলেছে এবং জনগণের বিশাল একটি অংশকে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে সফল করে তুলেছে। একইভাবে উল্লেখযোগ্য যে ভিয়েতনাম তার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বৈষম্য তেমন একটা বাড়তে দেয়নি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফলকে কয়েকটি নগরে কেন্দ্রীভূত না করে ভিয়েতনাম গ্রামীণ জনগণের মাঝে উন্নয়নের সকল ডাইমেনশানকে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। বৈদেশিক বিনিয়োগকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করে চলেছে ভিয়েতনাম। স্যামসাং, এল জি, অলিম্পাস, পাইওনিয়ারএসব কোম্পানির দক্ষিণপূর্ব এশীয় হাব এখন ভিয়েতনামে। এখন ভিয়েতনামে প্রতি বছর বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ দাঁড়াচ্ছে ২০২৫ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনামের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন চমকপ্রদ। বন্দর, মহাসড়ক ও সুলভ গণপরিবহনের ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম দ্রুত আধুনিকায়নে সফল একটি দেশ। তৈরী পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম এখন বাংলাদেশকে হটিয়ে মাঝে মাঝে গণচীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানটি দখল করে নিচ্ছে। ইলেকট্রনিকস পণ্য রপ্তানিতে এখন সিঙ্গাপুরের পর ভিয়েতনাম দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। চাল রপ্তানিতে থাইল্যান্ডকে হটিয়ে ভিয়েতনাম ভারতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। ব্রাজিলের পর কফি রপ্তানিতে ভিয়েতনাম বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। সাড়ে নয় কোটি জনসংখ্যার দেশ ভিয়েতনামের মোট রপ্তানি আয় বাংলাদেশের চাইতে কয়েকগুণ বেশি। ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় ছিল ৪০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সোভিয়েত স্টাইলের সমাজতন্ত্রকে যে যুগোপযোগী সংস্কার করতেই হবে, এটা বুঝে নিয়েই ভিয়েতনাম ‘দোই মোই’ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছে। ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতির’ অহিফেনের মৌতাতে বুঁদ না হয়ে ‘একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের’ মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক ‘মিরাকল’ ঘটানো সম্ভব, সেটারই অকাট্য প্রমাণ ভিয়েতনাম।

কেরালার সমাজতান্ত্রিক মডেলটি ভারতের মত একটি গণতান্ত্রিক দেশে মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে। মাথাপিছু জিডিপি বেশি না হলেও যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতের মত একটি নিম্নআয়ের দেশেও ঈর্ষণীয় জীবনযাপন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়কেরালার জনগণ তৃতীয় বিশ্বে তার সফলতম নজির সৃষ্টি করেছেন। আয় ও সম্পদবৈষম্যকে নিয়ন্ত্রণে রেখে জনগণের মাথাপিছু জিডিপি’র প্রবৃদ্ধিকে দ্রুত বাড়িয়ে চলেছে রাজ্যটি। ১৯৬৯ সালে কেরালার কম্যুনিস্টনেতৃত্বাধীন সরকার ‘লাঙল যার জমি তার’ নীতির ভিত্তিতে ভূমি মালিকানার ব্যাপক পুনর্বণ্টনের লক্ষ্যাভিমুখী কৃষি সংস্কার আইন পাস করে, যার প্রধান পাঁচটি বৈশিষ্ট্য ছিল: ) কোন পরিবারকে আট হেক্টরের বেশি জমির মালিকানা রাখতে না দেওয়া, ) ভাগচাষি (tenant farmer) ও বর্গাদার কৃষকদেরকে তাদের চাষকৃত জমির কার্যকর মালিকে (virtual owners) পরিণত করা, ) মধ্যস্বত্বভোগীদেরকে উৎখাত, ) কৃষিজোতের একত্রিকরণ, এবং ৫) তৃণমূল জনগণের সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের কৃষি সংস্কারের কর্মসূচিতে সম্পৃক্তকরণের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ (mass mobilization)। কেরালার কৃষি সংস্কারমালা খেতমজুরদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নে এবং গ্রামীণ শ্রমজীবী জনগণের সংগঠন জোরদারকরণে অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পেরেছে, যার ফলে তৃণমূল গণতন্ত্র ও ‘কল্যাণ অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠায় কেরালা মডেল অনেক বেশি সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১০ সালে লন্ডনের খ্যাতিমান প্রকাশনা সংস্থা পিয়ারসন থেকে প্রকাশিত আমার ও নিতাই নাগের রচিত গবেষণাগ্রন্থ ইকনমিক ইন্টিগ্রেশন ইন সাউথ এশিয়া: ইস্যুজ এন্ড পাথওয়েজে আমি নিচের পরিবর্তনগুলোকে কেরালা মডেলের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে প্রশংসা করেছি: ) কার্যকর ও কম দুর্নীতিপূর্ণ রেশন ব্যবস্থা ও ফিডিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে ভর্তুকিদামে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে চালবিতরণ. ) খেতমজুরদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাবিধান এবং নিম্নতম মজুরি আইন বাস্তবায়ন, ) অবসরপ্রাপ্ত ও বর্ষীয়ান কৃষিশ্রমিকদের জন্যে পেনশন চালু, ) দলিতশ্রেণীর জনগোষ্ঠিসমূহের জন্যে বর্ধিত সরকারী চাকুরি, ) বর্গাদারদের ভূমিস্বত্বের নিরাপত্তা (security of tenure) জোরদারকরণ এবং জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদের আশংকা নিরসন, ) গ্রামীণ ভিটেমাটিতে বসবাসরতদেরকে দখলিস্বত্ব প্রদান, ) ভূমিহীন পরিবারগুলোকে বসতবাটি নির্মাণের জন্যে প্লট প্রদান, ) কৃষিশ্রমিকদের দৈনিক সর্বোচ্চ কর্মঘন্টা নির্ধারণ এবং তাদের জন্যে সামাজিক নিরাপত্তা স্কিম চালু, ) গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসুবিধা বৃদ্ধির জন্যে সরকারী ক্লিনিক ও হাসপাতাল নেটওয়ার্কের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং ১০) অনুপস্থিত ভূমি মালিকানা উৎসাদন। কেরালার কৃষি সংস্কার, শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের অংশগ্রহণমূলক সংগঠন ও রাজনৈতিক সচেতনতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং প্রগতিশীল ও পরমতসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রফেসর অমর্ত্য সেনের বিচারে উন্নয়নের সবচেয়ে অনুকরণীয় মডেল উপহার দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। এই স্বীকৃতিকে কি মর্যাদা দেবে না বাংলাদেশের নীতিপ্রণেতারা?

লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন বছরের বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা
পরবর্তী নিবন্ধহাসনাতের বার্ষিক আয় সাড়ে ১২ লাখ, সম্পদ ৫০ লাখ টাকার