৮ বছরেও আসেনি গ্যাস, বিনিয়োগ ব্যাহত

মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল । অনেক বিনিয়োগকারী উৎপাদনে যেতে পারছেন না, বাড়ছে উদ্বেগ ঘাট, ওয়াকওয়ে ও খাল উন্নয়নে ১০৯ কোটি টাকার প্রকল্প

হাসান আকবর | বুধবার , ১০ জুন, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

মীরসরাইয়ে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাসের অভাবে বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। দেশিবিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানাভাবে চেষ্টা করা হলেও গত ৮ বছরে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হলেও এখানে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। গ্যাস, পানি ও অন্যান্য শিল্প ইউটিলিটি সংকটের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। এই পরিস্থিতির মধ্যে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঘাট, ওয়াকওয়ে ও খাল উন্নয়ন কাজে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে ঘাট ও ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ খাল উন্নয়ন ও লাইনিং কাজের জন্য ১০৮ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ২৯ টাকার একটি প্রস্তাব সম্প্রতি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৪ দশমিক ৯০ কিলোমিটার খালের উভয় পাশে মোট ৯ দশমিক ৮০ কিলোমিটার স্লোপ প্রটেকশন, পাড়ঘেঁষা চলাচলের রাস্তা এবং দুটি ঘাট নির্মাণ করা হবে। ইজিপি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের পর তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কারিগরিভাবে সবগুলো প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হওয়ার পর সর্বনিম্ন দরদাতা ঢাকার আদাবরভিত্তিক মনিকো লিমিটেডকে কাজটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন এগিয়ে চললেও শিল্প উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস সংযোগের অভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনেক বিনিয়োগকারী এখনো উৎপাদনে যেতে পারছেন না। ২০১৮ সালে অনুমোদনের পর প্রায় ৮ বছর অতিক্রম হলেও অঞ্চলটিতে এখনো নিজস্ব গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন করা হয়নি।

একাধিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কারখানার অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করেছে। পণ্য উৎপাদনের সব আয়োজনও সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে যেতে পারছে না।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাস সংযোগের সময়সূচি সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাস সংযোগ পাওয়া গেলে এসব কারখানা উৎপাদন শুরু করতে পারবে বলেও সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পানির সংকটও বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তার মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, সরবরাহকৃত পানিতে লবণাক্ততা ও দুর্গন্ধ রয়েছে। ফলে অধিক পানি প্রয়োজন হয় এমন শিল্পের পরিবর্তে তুলনামূলক কম পানি ব্যবহারকারী ড্রাই ইন্ডাস্ট্রি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।

কয়েকজন দেশীয় বিনিয়োগকারী বলেছেন, কারখানা স্থাপনের জন্য বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে ২৮ ধরনের অনুমোদন নিতে হয়, যা ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জটিলতা সৃষ্টি করছে।

মীরসরাইস্থ কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির স্টেশন থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ৫ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ একটি নিজস্ব গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। বেপজার উদ্যোগে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের কথা থাকলেও প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতি পাবে না। সাময়িকভাবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে এলপিজি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরো ৮ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ প্রয়োজন হবে।

তবে নানা চ্যালেঞ্জের মাঝেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমে বাড়ছে বলে জানিয়েছে বেপজা। চট্টগ্রামের দুই ইপিজেডে খালি প্লট না থাকা এবং মীরসরাই থেকে সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তুলনামূলক নিকটবর্তী অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অঞ্চলটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বেপজার তথ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে মোট ৫৩৯টি শিল্প প্লট ও দুটি ছয়তলা কারখানা ভবনের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৫৪টি প্লট এবং একটি কারখানা ভবন ৬১টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করে রপ্তানি করছে। আরো তিনটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া ৩২টি শিল্প ইউনিট বর্তমানে নির্মাণাধীন।

চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ অঞ্চলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০ কোটি ৭৯ লাখ ডলার এবং রপ্তানির পরিমাণ ৪ কোটি ৫১ লাখ ডলার। এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চীনের বিনিয়োগকারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করছে।

বেপজা সূত্র জানায়, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এখানে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হবে এবং প্রায় ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বর্তমানে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বাকি কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে গ্যাস, পানি ও অন্যান্য মৌলিক ইউটিলিটি সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রত্যাশিত শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগ অর্জন কঠিন হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ
পরবর্তী নিবন্ধঋতুপর্ণার বাড়ি নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান