কাপড়ের দাগ উঠানোর কেমিক্যাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন। অপর একজনকে দেখা গেল, তেলাপোকা–ইঁদুর মারার ওষুধ নিয়ে বসে আছেন। নগরীর ব্যস্ততম কোর্টহিলের নিয়মিত চিত্র এটি। এলাকাটির ফুটপাত বিহীন সরু রাস্তা দখলে নিয়ে অদৃশ্য একটি মহলের ছত্রছায়ায় হকাররা দিব্বি নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করে চলেছেন। ফলে সৃষ্টি হয়েছে যানজট সমস্যার। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা সময় চিঠি চালাচালি হলেও দীর্ঘদিনের এ সমস্যাটি আজও সমস্যা হিসেবেই থেকে গেছে। হকাররা কাপড়ের দাগ তোলা থেকে ককরোচ–ইঁদুর সমস্যার সমাধান দিলেও যানজট সমস্যা সৃষ্টি করে কোর্ট হিল এলাকায় বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরী করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন আইনজীবীরা।
সাধারণ আইনজীবীরা জানিয়েছেন, গাড়ি নিয়ে দূরে থাক, ধাক্কাধাক্কি করা ছাড়া হেঁটেও কোর্টহিলে প্রবেশ করা যায় না। হকারদের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকায় সার্বক্ষণিক মানুষ ও যানবাহনের বিশাল জটলা লেগেই থাকে। এতে বিচারপ্রার্থীসহ সাধারণের চলাচলে যেমন ব্যাঘাত ঘটছে, তেমনি আদালতে আসামি আনা নেওয়ার প্রিজনভ্যানও প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। আইনজীবীদের অভিযোগ, যানজট তীব্র আকার ধারণ করলেও হকাররা কখনো রাস্তা থেকে তাদের পণ্য সরিয়ে নেয় না।
নেপথ্যে শক্তিশালী কোনো চক্র না থাকলে এমনটা করার সাহস হকারদের কখনো হতো না বলে জানিয়েছেন আইনজীবী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান। গত ২৩ জুলাই তিনি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি বরাবর একটি চিঠি দিয়েছেন। এতে তিনি অপরিকল্পিত গাড়ি পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে বিচারপ্রার্থী জনগণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সমতির পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে কোর্টহিলের যানজট সমস্যার সমাধানের অনুরোধ জানিয়ে পৃথক চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন উল্লেখ করেন, কোর্টহিল এলাকায় বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মহানগর দায়রা জজ আদালত, জেলা প্রশাসক কার্যালয়, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতসহ চট্টগ্রামের অন্যান্য সকল আদালত, আইনজীবী সমিতি কার্যালয়, চেম্বার ভবনসমূহ, জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়সহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর রয়েছে। প্রতিদিন বিচারপ্রার্থী জনগণসহ হাজার হাজার লোক দাপ্তরিক কাজে আদালত ভবন এলাকায় আসেন। যার ফলে সারাদিন অনেক গাড়ির আসা যাওয়া হয়। আদালতে আসামি আনার ভ্যানসহ অনেক সময় বড় ট্রাকও এই রোডে চলাচল করে। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, রাস্তার উপর হকার বসা এবং অত্যধিক গাড়ির চাপে সকাল ও বিকাল বেলা উক্ত এলাকায় যানজট লেগে থাকে। বিশেষ করে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময়ে গাড়ির চাপ বেশি থাকে। এমতাবস্থায় কোর্টহিল এলাকার প্রবেশ মুখে অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরাতন ভবনের গেইটের সামনে ১ জন, সমিতির দোয়েল ভবনের সামনে ২ জন, শাপলা ভবনের সামনে ১ জন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ১ জন, বাহির মুখে অর্থাৎ হকার মার্কেটের সামনে ১ জনসহ মোট ৬/৭ জন ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলে যানজট থাকবে না। একই সাথে অবৈধ পার্কিং রোধকল্পে জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ১ জন ট্রাফিক সার্জেন্ট নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
গত বৃহস্পতিবার সরেজিমন দেখা যায়, হকাররা মূল রাস্তার ধারে নানা পণ্য নিয়ে ব্যবসা করছেন। তাদের কারণে স্বাভাবিকভাবে কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারছিল না। বিশেষ করে এ সমস্যাটি আইনজীবীদের দোয়েল ভবন লাগোয়া চার রাস্তার মোড়ে জটিল হয়ে উঠে। কোনোভাবেই কোন গাড়ি সেখান টার্ন নিতে পারে না। সেখানে বসে পড়া শুটকি ব্যবসায়ীদের কারণে প্রতিদিন যানবাহন চালকদের এ সমস্যায় পড়তে হয়। দেখা যায়, কোর্ট হিলের শুরু যেখান থেকে অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমানা দেয়াল থেকে শুরু করে মূল আইনজীবী ভবনের পর পর্যন্ত হকারদের এ দৌরাত্ম্য। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট অনেকের গাড়ি প্রতিদিন এ রাস্তা দিয়ে কোর্ট হিলে উঠানামা করে। এ সময় পুরো সড়কজুড়ে জ্যামের সৃষ্টি হয়। এ জ্যামের মূল নেপথ্যে রয়েছে হকাররাই। সাবলীলভাবে যানবাহন, মানুষ চলাচল করার জন্য এবং জ্যাম থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য যত্রতত্র পার্কি ও হকারদের উচ্ছেদ জরুরি বলে জানিয়েছেন আইনজীবী আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেন, কোর্ট হিলে জ্যামের পেছনে হকারদের পাশাপাশি যানবাহনেরও দায় রয়েছে। মূল রাস্তাতেই পার্ক করে রাখা হয় গাড়ি। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্য। যেখানে সেখানে মোটরসাইকেল পার্ক করে রাখে কোর্ট হিলে আসা লোকজন। হকারদের উচ্ছেদ করা গেলে এবং যেখানে সেখানে গাড়ি পার্ক করা বন্ধ করতে পারলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এ বক্তব্য আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও।
তারা বলছেন, কোর্ট হিলের রাস্তাগুলো খুবই সরু। এ শুরু রাস্তায় হকারদের দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই এ অবস্থা চলে আসছে। জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থা না থাকায় এবং হকারদের দৌরাত্ম্যের কারণেই মূলত আদালত পাড়ায় যানজট লেগে থাকে। আমরা বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নিয়েছি। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিয়েছি। আশা করছি, এ সমস্যা থেকে আমাদের রেহাই মিলবে। হকারদের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।











