দুর্লভ ঐতিহ্যের ধারক রাজশাহীর ‘বরেন্দ্র জাদুঘর’

আজিজুল কদির | সোমবার , ২০ জুলাই, ২০২৬ at ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ

ইতিহাসঐতিহ্য আর স্থাপত্যশিল্পকে ধারণ করে টিকে থাকে একটি জাতি। বাঙালিও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। বাঙালির এই ঘরানার শিল্পের সবচেয়ে বড় সম্ভার বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার জন্য বাইরের দুনিয়ায়ও স্বীকৃতি রয়েছে এর। দেশের একমাত্র এই গবেষণা জাদুঘর রয়ে গেছে অনেকটা অগোচরে।

শতবর্ষ ছুঁয়ে যাওয়া এই জাদুঘরের মূল ফটকে প্রবেশ করেই দেখা যাবে তীরচিহ্ন সাইনবোর্ডে লেখা ‘জাদুঘর ও লাইব্রেরির প্রবেশপথ’। ওই পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনা কেন্দ্র থেকে পাঁচ টাকা দিয়ে একটি টিকেট কাটতে হবে। শুরু সেখান থেকেই।

১৩টি গ্যালারিতে থাকা হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহ্য দেখার সুযোগ মিলবে। জাদুঘরে প্রস্তর, ধাতব, পোড়ামাটির ভাস্কর্য, শিলালিপি, তাম্রলিপি, স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা, তৈজসপত্র এবং পুরোনো দলিলের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৯০০। এর মধ্যে আধুনিক পদ্ধতির আলোকসম্পাত দিয়ে পুরাকীর্তিগুলোর নান্দনিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

বরেন্দ্র ভূমি, সিল্কের শহর, দেশের একমাত্র পরিচ্ছন্ন নগরী হিসাবে রাজশাহী শহরকে বিশেষায়িত করা যায়। রাজশাহীতে কী আছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে সবার প্রথমে থাকে ‘বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর’। যদিও পূর্বে এর নাম শুধু ‘বরেন্দ্র জাদুঘর’ ছিল। বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা এই বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। যা এখনো প্রাচীন এবং দূর্লভদুষ্প্রাপ্য ঐতিহ্য বহন করে যুগের পর যুগ দাঁড়িয়ে আছে।

হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে রাজশাহী নগরীর প্রাণকেন্দ্র হেতমখাঁয় দাঁড়িয়ে আছে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। এখানে নিয়মিত প্রচুর দর্শনার্থী প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন দেখতে ঘুরতে আসেন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে। দেশিবিদেশি গবেষকরাও তাদের গবেষণা কাজে ছুটে আসেন এখানে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, নাটোরের দিঘাপতিয়ার রাজপরিবারের বিদ্যোৎসাহী জমিদার কুমার শরৎকুমার রায়, খ্যাতনামা আইনজীবী ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক রমাপ্রসাদ চন্দ্রের প্রচেষ্টায় ১৯১০ সালে এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের অস্তিত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানারকম সংকট দেখা দেয়। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬১ সাল পযর্ন্ত বরেন্দ্র জাদুঘরের অর্ধেক অংশ মেডিকেল স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৬৪ সালে পুনরায় জাদুঘর বন্ধ হবার উপক্রম হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরটি অধিগ্রহণ করে। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ছাড়াও বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন।

বরেন্দ্র জাদুঘরে প্রায় ৯ হাজারেরও অধিক নিদর্শন রয়েছে। জাদুঘরের সংগ্রহশালায় রয়েছে সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন, মহেনজোদারো সভ্যতার প্রত্নতত্ত, পাথরের মূর্তি, একাদশ শতকে নির্মিত বুদ্ধ মূর্তি, ভৈরবের মাথা, গঙ্গা মূর্তি, মোঘল আমলের রৌপ্র মুদ্রা, গুপ্ত সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের গোলাকার স্বর্ণমুদ্রা, সম্রাট শাহজাহানের গোলাকার রৌপ্য মুদ্রা ইত্যাদি।

জাদুঘর সূত্র জানায়, সংগ্রহশালাটিতে প্রায় ৬ হাজার হাতে লেখা বাংলা ও সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি, সাড়ে ৬ হাজারের বেশি প্রাচীন মুদ্রা, ১ হাজার ৩০০ পোড়ামাটির নিদর্শন, ১ হাজারের বেশি ধাতব প্রত্নবস্তু এবং পালসেন আমলের ২ হাজারের বেশি ভাস্কর্য রয়েছে। কিন্তু ১৭ হাজারের বেশি এ বিশাল ভাণ্ডারের বিপরীতে গ্যালারি কক্ষ মাত্র ১১টি। ফলে মাত্র এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০টি নিদর্শন দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি বিপুল পরিমাণ প্রত্নসম্পদ বছরের পর বছর ধরে গুদামে পড়ে আছে।

এছাড়া সেখানে প্রাচীন আমলের আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত, বাংলা লেখচিত্র এবং পাল যুগ, সুলতানি যুগ, মোগল যুগের শিলালিপি ছাড়াও শেরশাহর দু’টি কামান ও মেহরাব প্রদর্শিত হচ্ছে। চার নম্বর ইসলামী গ্যালারিতে হাতে লেখা কোরআন শরীফ, মোগল আমলের ফার্সি দলিল, পোশাক মুদ্রা ইত্যাদি দিয়ে এ গ্যালারি প্রাচীন ঐতিহ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।

বর্তমানে পাঁচ নম্বর আবহমান বাংলা গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হচ্ছে বাঙালি জাতির ব্যবহার্য জিনিসপত্র, প্রাচীন গহনা, দেশি বাদ্যযন্ত্র, আনুষ্ঠানিক মৃৎপাত্র, উপজাতিদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র। কিশলয় বেষ্টিত নদীমাতৃক বাংলার নৌকার মডেল, অস্ত্রের সূর্য নরম সোনালি রোদ ছড়িয়ে জন্মভূমিকে করেছে অপরূপ সৌন্দর্য। এখানে সেই চিত্র ফুটে ওঠে।

জাদুঘরটি সরেজমিনে ঘুরতে গিয়ে দারোয়ানকে বলতে শোনা যায়, ‘বন্ধের দিন মানুষ বেশি আসে।’ তাই কেউ যেন জাদুঘরটি দেখতে গিয়ে ঘুরে না আসে, সে জন্য পরিদর্শনের সময়সূচি জানা থাকা দরকার। দর্শনার্থীরা শনি থেকে বুধবার পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা, শুক্রবার ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দেখতে পারবে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষিত ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘরটি বন্ধ থাকে৷

পূর্ববর্তী নিবন্ধমরিটা দোজি : বিষাদই যার সুর, নিস্তব্ধতাই যার উপমা
পরবর্তী নিবন্ধমাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক কমিটি সূর্যগিরি আশ্রম শাখার সভা