সন্ধ্যার নরম আলো যখন ধুলো–মাখা গ্রামের পথে ছড়িয়ে পড়ে, দূর থেকে ভেসে আসে ভুঙ্গলের দীর্ঘ ধ্বনিমনে হয় যেন শতাব্দী প্রাচীন কোনো গল্প আবার জেগে উঠছে মানুষের কণ্ঠে, মানুষের মঞ্চে।
নেই কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা, নেই আধুনিক প্রযুক্তির ঝলকানি। তবুও কোথাও যেন মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ ফিরে পায় এক প্রচীন শিল্পধারা ভাওয়াই। যা শুধু লোকনাট্য নয় বরং গুজরাটের মানুষের হাসি–ক্রন্দন,প্রতিবাদ, প্রেম, বিশ্বাস ও জীবনের এক বহমান গল্প।
ভাওয়াইয়ের ইতিহাস প্রায় সাতশ বছরেরও বেশি পুরোনো। ধারণা করা হয়, চতুর্দশ শতকে আসাইতা ঠাকর নামক এক কবি ও নাট্যকার এই শিল্পরীতির সূচনা করেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা বলার জন্য তিনি ভাওয়াইকে এক বিশেষ মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সেই থেকে ভাওয়াই হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর।
গুজরাটের গ্রামীণ সমাজে এই নাট্যধারা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিল্পীরা গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ভাওয়াই পরিবেশন করতে থাকেন। আজও গুজরাটের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ভাওয়াই বেঁচে আছে।
ভাওয়াইয়ের মূল শক্তি এর গল্পে। এখানে উঠে আসে সমাজের নানা অসঙ্গতি, ধর্মীয় কুসংস্কার, শ্রেণিবৈষম্য, নারীর অবস্থান, প্রেম, মানবতা এবং নৈতিকতার প্রশ্ন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ভাওয়াই দর্শকদের হাসায়, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে থাকে তীব্র সামাজিক বার্তা। ব্যঙ্গ–বিদ্রুপের মাধ্যমে শিল্পীরা সমাজের ভুলগুলোকে সামনে নিয়ে আসেন। ফলে দর্শক শুধু বিনোদনই পান না, চিন্তারও খোরাক পান বটে।
একজন কৃষক, একজন দরিদ্র শ্রমিক, একজন গৃহবধূ কিংবা গ্রামের সাধারণ মানুষ সবাই যেন নিজেদের গল্প খুঁজে পান ভাওয়াইয়ের চরিত্রগুলোর মধ্যে।
ভাওয়াইয়ের পরিবেশনা শুরু হয় দেবী আম্বার বন্দনার মাধ্যমে। এরপর শুরু হয় নাটকের মূল অংশ। ঢোল, নগারা, ভুঙ্গল এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ।
ভাওয়াইয়ের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর সংলাপ। তাৎক্ষণিক বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথন, হাস্যরস এবং অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে। শিল্পীরা প্রায়ই দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন, যা এই নাট্যধারাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
মূলত নারী চরিত্রগুলোতে পুরুষ শিল্পীরাই অভিনয় করেন। তাঁদের অভিনয় দক্ষতা এতটাই চমৎকার যে দর্শক সহজেই চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
ভাওয়াইয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বাদ্যযন্ত্রটির নাম জড়িয়ে আছে, তা হলো ভুঙ্গল। প্রায় চার–পাঁচ ফুট লম্বা এই তামার বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি দূর–দূরান্ত পর্যন্ত শোনা যায়। গ্রামের মানুষ যখন ভুঙ্গলের আওয়াজ শুনতেন, তখনই বুঝে যেতেন আজ রাতে ভাওয়াই হবে। সেই ধ্বনি শুধু নাটকের আহ্বান ছিল না ছিল এক সাংস্কৃতিক উৎসবের ডাক। ভাওয়াইয়ের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সামাজিক সচেতনতা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই লোকনাট্য সমাজের নানা সমস্যার বিরুদ্ধে কথা বলেছে। বর্ণবৈষম্য, নারীর প্রতি অবিচার, ধর্মীয় ভন্ডামি কিংবা ক্ষমতাবানদের অত্যাচার সবকিছুর বিরুদ্ধেই ভাওয়াই তার শিল্পভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাই ভাওয়াইকে অনেকেই “লোকসমাজের আয়না” বলে অভিহিত করেন।
বর্তমান সময়ে টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে লোকশিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ কিছুটা কমেছে। ভাওয়াইও এর ব্যতিক্রম নয়।
তবুও গুজরাটের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং লোকশিল্পীরা এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও ভাওয়াইকে আধুনিক দর্শকের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
ভাওয়াই কেবল একটি নাট্যরীতি নয়।গুজরাটের মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অংশ।
যখন ভাওয়াইয়ের শিল্পী মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংলাপ উচ্চারণ করেন, তখন মনে হয় তিনি শুধু অভিনয় করছেন না তিনি যেন শতাব্দী পেরিয়ে আসা এক ঐতিহ্যের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন।
আধুনিকতার ঝড়ে অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাওয়াই আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তার লোকসংস্কৃতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আর সেই পরিচয়ের উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে গুজরাটের মাটিতে আজও বেঁচে আছে ভাওয়াই, মানুষের হৃদয়ে, মানুষের কণ্ঠে, মানুষের গল্পে।
শিক্ষার্থী, গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত (আইসিসিআর বৃত্তিপ্রাপ্ত)











