১৯৫৩ সালের ১৫ জানুয়ারি। যুদ্ধোত্তর টোকিও শহরের এক কোণে জন্ম নিল এক ফুটফুটে কন্যাশিশু, যার নাম রাখা হলো মিনোবু নাকানিশি। মিনোবুর শৈশব কেটেছিল সুর ও অভিনয়ের এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে। তাঁর ঠাকুরমা ছিলেন ঐতিহ্যবাহী জাপানি তারযন্ত্র ‘শামিসেন’–এর প্রাজ্ঞ বাদক, আর দাদু–দিদারা ছিলেন ‘কাবুকি’ থিয়েটারের অন্ধ ভক্ত। আপাতদৃষ্টিতে শিল্পঘেরা এই পরিবারে মিনোবুর শৈশব আনন্দময় হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তাঁর জীবনের আকাশটি জন্ম থেকেই এক অমোঘ কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তাঁর পিতা শোইচি নাকানিশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সাম্রাজ্যবাদী নৌবাহিনীর একজন লড়াকু পাইলট ছিলেন। মার্কিন বোমারু বিমানের বিরুদ্ধে একাধিক মরণপণ আকাশযুদ্ধ থেকে শোইচি অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর ভেতরের শান্ত, স্বাভাবিক মানুষটি সেই যুদ্ধক্ষেত্রেই চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আর সহযোদ্ধাদের পুড়তে দেখার ক্ষত তাঁর মনে জন্ম দিয়েছিল তীব্র ট্রমা। যুদ্ধোত্তর জাপানে ফিরে শোইচি আর কখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। জুয়া, ঋণের অতল গহ্বর এবং একের পর এক ব্যবসায়ে দেউলিয়া হয়ে তিনি পুরো নাকানিশি পরিবারকে এক সীমাহীন নরকের দিকে ঠেলে দিলেন।
পিতার এই ধ্বংসাত্মক আচরণের কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মিনোবু তাঁর ছোট চাচা রেই নাকানিশির টোকিওর নাকানোর বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। রেই নাকানিশি ছিলেন জাপানের অত্যন্ত সফল ও নামী মূলধারার গীতিকার। চাচার স্নেহচ্ছায়ায় মিনোবু তাঁর ভাঙা জীবনকে কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে রেই নাকানিশি যখন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আয়ুমি ইশিদার ছোট বোন ইউরি ইশিদাকে বিয়ে করলেন, তখন মিনোবুর বাবার পরিবারের অবাঞ্ছিত উপস্থিতি রেই–এর নবদাম্পত্যে চরম অশান্তি ডেকে আনল। এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে রেই নাকানিশি তাঁর বড় ভাই শোইচি এবং মিনোবুসহ পুরো পরিবারকে আক্ষরিক অর্থেই বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। চাচার এই নির্মম প্রত্যাখ্যান কিশোরী মিনোবুর মনে এক গভীর ট্রমার জন্ম দেয়।
এর ঠিক পর পরই নেমে আসে আরেকটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। রেই ও শোইচি নাকানিশি মিলে ট্যালেন্ট এজেন্সি ‘আদো প্রমোশন’ খোলেন, যার সভাপতি করা হয় শোইচির বন্ধু চিত্রশিল্পী আদো মায়েদাকে। কিন্তু ১৯৭৪ সালে এজেন্সির তারকা জুন ফুবুকি কম বেতনের অভিযোগে চলে যেতে চাইলে শোইচি, রেই এবং আদো মায়েদা মাফিয়াদের সহায়তায় জুন ফুবুকিকে অপহরণ ও বন্দি করে রাখেন। এই চরম পারিবারিক অপরাধ আর অন্ধকার কেলেঙ্কারি মিনোবুকে মানসিকভাবে রক্তাক্ত করে দেয়।
পারিবারিক লাঞ্ছনার সমান্তরালে মিনোবুর চারপাশে তখন জ্বলছিল আরও এক বিধ্বংসী আগুন। ১৯৭০ সালে টোকিওর রাজপথ তখন উত্তাল ‘জেঙ্কিওতো’ ছাত্র আন্দোলনে। পুঁজিবাদের করাল গ্রাসের বিরুদ্ধে জাপানি তরুণ ও শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের আগুনে মিনোবুও শামিল হয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু এই পধসঢ়ঁং আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে তিনি স্কুল ছেড়ে দেন। এর ঠিক দু’বছর পর, ১৯৭২ সালের দিকে মাত্র ২০ বছর বয়সে তাঁর আরও এক অতি প্রিয় বন্ধুর হঠাৎ করুণ মৃত্যু ঘটে। এই দুই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি মিনোবুর মনে চরম একাকীত্ব ও বিষণ্নতার পাহাড় চাপিয়ে দেয়। তিনি তাঁর ভেতরের এই অবরুদ্ধ কান্নাকে প্রকাশ করতে নিজে নিজেই গিটার এবং সেলো বাজানো শিখলেন। এভাবেই এক গভীর শোকগাঁথা থেকে জন্ম নিল জাপানি সঙ্গীতের অন্যতম রহস্যময় চরিত্র মরিটা দোজি।
মরিটা দোজি ছিলেন মূলত ‘সাইকেডেলিক ফোক’ এবং ‘চেম্বার ফোক’ ধারার এক অনন্য রূপকার। তাঁর গানগুলো সাধারণ প্রেমের চটুল সুর ছিল না, বরং তা ছিল হারিয়ে যাওয়া যৌবন, রাজনৈতিক ব্যর্থতা, আদর্শিক শূন্যতা এবং নিঃসঙ্গতার এক করুণ এপিটাফ।
দোজির গানের সুরের ঢঙটি ছিল অদ্ভুত রকমের নীরব ও বেদনাদায়ক। তাঁর কণ্ঠে ছিল চড়া অথচ অত্যন্ত মৃদু ও কাঁপা–কাঁপা এক অদ্ভুত টান, যাকে সঙ্গীতে ‘পোর্টেমেন্টো’ কৌশল বলা হয়। গান গাওয়ার সময় তাঁর সুরটি যেন কখনো ফিসফিসানি হয়ে আসত, আবার কখনো তা কান্নার মৃদু তরঙ্গে রূপ নিত, যা শ্রোতাদের বুকের ভেতরের অবদমিত ক্ষতকে নিমিষেই জাগিয়ে তুলত। তাঁর গানের তাল ও লয় ছিল অত্যন্ত ধীর। তিনি তাঁর গানে কোনো জটিল বা ভারী বাদ্যযন্ত্রের কোলাহল ব্যবহার করতেন না। ধীর লয়ের গিটার এবং সেলোর করুণ ক্রন্দন সুরের ওপর ভিত্তি করে তাঁর কাঁপা–কাঁপা কণ্ঠটি ভেসে বেড়াত, যেন মনে হতো কোনো শূন্য উপত্যকায় দাঁড়িয়ে এক নিঃসঙ্গ আত্মা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
তিনি মূলধারার চাকচিক্যময় কনসার্ট হল এড়িয়ে চলতেন। শ্রোতাদের সাথে তাঁর আত্মিক সংযোগ স্থাপনের জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন টোকিওর সেন্ট মেরি ক্যাথেড্রালের মতো শান্ত ও প্রতিধ্বনিময় স্থান। গিটারের টুংটাং আর মৃদু দীর্ঘশ্বাসের সেই শব্দগুলো ক্যাথেড্রালের পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে শ্রোতাদের মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক হাহাকার তৈরি করত। মঞ্চে পারফর্ম করার সময় তিনি সবসময় প্রকাণ্ড কালো সানগ্লাস এবং ঘন কোঁকড়ানো পরচুলা দিয়ে সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ঢেকে রাখতেন। চাচার বিশাল স্টারডম থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে এবং নিজের ট্র্যাজিক পারিবারিক পরিচয় লুকাতে মরিটা দোজি হয়ে উঠেছিলেন এক কুয়াশাচ্ছন্ন ছায়ামূর্তি।
১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে তিনি তাঁর ডেবিউ সিঙ্গেল ‘সাযয়োনারা বোকু নো তোমোদাচি’ (বিদায় আমার বন্ধু) প্রকাশ করে সঙ্গীত জগতে প্রথম আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তাঁর সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে তিনি ‘গুড বাই’ (১৯৭৫), ‘মাদার স্কাই’ (১৯৭৬), ‘দ্য লাস্ট ওয়াল্টজ’ (১৯৮০) এবং ‘ওল্ফ বয়’ (১৯৮৩) এর মতো মাত্র কয়েকটি কালজয়ী অ্যালবাম উপহার দেন। কিন্তু ১৯৮৩ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর টোকিওর শিনজুকু লফটে জীবনের শেষ লাইভ কনসার্টটি করার পর, তিনি আকস্মিকভাবে সুরের জগতকে চিরতরে বিদায় জানান। তিনি তাঁর পিতা শোইচির বন্ধু এবং নিজের ম্যানেজার আদো মায়েদাকে বিয়ে করে এক সাধারণ গৃহিণীর সাধারণ, শব্দহীন জীবন বেছে নেন। লাইট–ক্যামেরা আর কোলাহলের জগত থেকে তিনি হেঁটে গেলেন নিভৃত গৃহকোণের পরম শান্তিতে।
কিন্তু নিয়তি দোজির সুরকে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যেতে দেয়নি। দীর্ঘ এক দশক পর, ১৯৯৩ সালে যখন জাপানি টেলিভিশন ড্রামা ‘কৌ কৌ কিউশি’ (হাই স্কুল শিক্ষক)-তে তাঁর গান ‘বোকুতাচি নো শিপ্পাই’ (আমাদের ব্যর্থতা) থিম সং হিসেবে বাজতে শুরু করল, তখন পুরো জাপানি সঙ্গীতজগতে এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটল। এক শিক্ষক ও ছাত্রীর ট্র্যাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জটিল প্রেমের গল্পের সাথে দোজির কণ্ঠের হাহাকার এমন নিখুঁতভাবে মিশে গিয়েছিল যে, গানটি ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে ওরিকন সিঙ্গেল চার্টের ৫ নম্বরে উঠে আসে এবং ক্যাসেট–সিডির সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দেয়। নতুন প্রজন্মের লাখো মানুষ হন্যে হয়ে মরিটা দোজির সন্ধান করতে লাগল।
২০০৩ সালে নাটকটির যখন রিমেক তৈরি হয়, তখন মরিটা দোজির নাম পুনরায় জাপানের বুকে ফিরে আসে। কিন্তু তিনি আর মঞ্চে ফিরতে রাজি হননি। তবে, ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি খুব গোপনে একবার স্টুডিওতে পা রেখেছিলেন। তাঁর অতি প্রিয় গান ‘উমি গা শিন্দেমো আইয়ো ত্তে নাইতেইরু (সমুদ্র মরে গেলেও আমি ভালোবেসে কাঁদছি)-এর লিরিক্সে কিছুটা পরিবর্তন এনে তিনি রেকর্ড করেন তাঁর জীবনের শেষ অফিশিয়াল অডিও ‘হিতোরি আসোবি’ (একা খেলা)। এরপর তিনি চিরতরে স্টুডিওর আলো নিভিয়ে দেন।
দোজির গানের এই অনন্ত হাহাকারের রহস্য চিরকালই ভক্তদের মনে এক কুয়াশা তৈরি করে রাখত, যদি না ২০২০ সালে তাঁর চাচা রেই নাকানিশি মারা যেতেন। রেই নাকানিশির মৃত্যুর পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় তাঁর অপ্রকাশিত উপন্যাস ‘চি নো উতা’ (রক্তের গান)। এই উপন্যাসে রেই নির্দ্বিধায় উন্মোচন করেন মরিটা দোজির জীবনের সবচেয়ে করুণ ট্র্যাজেডি। তিনি জানান যে, দোজির গানের সেই অন্তহীন একাকীত্ব কোনো কৃত্রিম শৈল্পিক বিলাসিতা ছিল না। তা ছিল তাঁর পিতা শোইচির যুদ্ধজনিত মানসিক ক্ষত এবং নিজের শৈশবে স্বজনদের দ্বারা লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত হওয়ার এক বংশানুক্রমিক বা রক্তের উত্তরাধিকার। রক্তের সম্পর্কের এই বিষাদই মরিটা দোজির গানের মধ্য দিয়ে চিরন্তন মেলানকলিয়া হয়ে ঝরে পড়েছিল।
সংসার জীবনের একমাত্র অবলম্বন স্বামী আদো মায়েদা যখন ২০১০ সালে হঠাৎ মারা যান, তখন মরিটা দোজির চারপাশের শেষ আলোটুকুও নিভে গেল। তিনি তীব্র মানসিক অবসাদ ও একাকীত্বের শিকার হয়ে দীর্ঘ আট বছর ধরে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি অবস্থায় কাটান।
২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল, টোকিওর এক নিঃশব্দ ফ্ল্যাটে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ৬৫ বছর বয়সে চিরবিদায় নেন এই কাল্ট আইকন। কিন্তু ট্র্যাজেডি এখানেও তাঁর ছায়া ছাড়েনি। মৃত্যুর পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তাঁর নিথর দেহটি অলক্ষিত অবস্থায় সেই শূন্য ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল। অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে যখন তাঁর প্রয়াণের খবরটি প্রকাশ করা হলো, তখন পুরো জাপানি সংগীতপ্রেমী সমাজ কান্নায় ভেঙে পড়ল।
মরিটা দোজি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর চশমার অন্তরালে থাকা অশ্রু আর তাঁর গানের কাঁপা–কাঁপা ধীর সুর জাপানের একটি ঐতিহাসিক কালখণ্ডের বোবা কান্না হয়ে আজীবন আমাদের বুকে নাড়া দিয়ে যাবে।










